শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের নিজের লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র সপ্তম পরিচ্ছেদের আলোচনায় – যেখানে উনি তিন প্রকার রতির কথা বলেছেন এবং আমরা দেখেছিলাম যে, সমর্থা রতিই শ্রেষ্ঠ – যা ব্রজগোপীগণের প্রেম-রতি। এরপরে আমরা দেখবো – গুরুমহারাজ এই প্রসঙ্গে আরো কি কি বলেছেন।
এরপরে উনি বলেছেন – “এই নৈসর্গিক প্রীতি (অর্থাৎ যে প্রীতিতে কিঞ্চিৎ মাত্রও সম্ভােগেচ্ছা থাকে না – শুধুই কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা থাকে৷)-যুক্ত সমর্থা রতিই হোলো ভগবৎ-প্রেম, যা সম্পূর্ণরূপে স্বাভিমানশূন্য – নিজ সম্ভোগ-সুখেচ্ছা বর্জিত, ‘কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি’ যুক্ত !
এই সমর্থা রতি উত্তরোতর বর্ধিত হয়ে যথাক্রমে প্রেম, স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ, ভাব ও মহাভাবে পরিণতি লাভ করে। আর এই মহাভাবই হ্লাদিনী-স্বরূপিণী শ্রীমতি রাধা। বাউলদের মতে এটাই হোলো রাধাতত্ত্ব – এটাই হোলো মধুরভাবের চূড়ান্ত পরিণতি বা বিকাশ।”
প্রিয় পাঠক ! এই অংশে গুরুমহারাজ সমর্থা রতির পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা এবং বাউলমত অনুযায়ী ‘রাধাতত্ত্বে’-র বিশ্লেষণ করেছেন। উনি যা বললেন তার সারমর্ম হোলো এই যে_ সম্পূর্ণরূপে স্বাভিমানশূন্য, সম্ভোগসুখেচ্ছাবর্জিত, কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতিযুক্ত ভগবৎ প্রেম‌ই হোলো সমর্থা রতি ! ক্রমাগত সাধনার দ্বারা সমর্থা রতি আবার ক্রমবিকাশ প্রাপ্ত হয়, আর এই ক্রমগুলি হোলো – প্রেম, স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ, ভাব ও মহাভাব। এই মহাভাব অবস্থাই চূড়ান্ত অবস্থা – যা শ্রীরাধার অবস্থা। এইজন্যেই ভাগবতশাস্ত্রে হ্লাদিনী-স্বরূপিণী শ্রীরাধাকে মহাভাবময়ী বলা হয়েছে। বাউলদের মতে মধুরভাবের এই চূড়ান্ত বিকাশ বা পরিণতিই হোলো রাধাতত্ত্ব।৷
গুরুমহারাজ এরপরে বলেছেন – ” শ্রীরাধা হোলেন শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপশক্তির পূর্ণ অভিব্যক্তি। যাঁর ভিতর দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই নিজেকে বোধে-বোধ করছেন। এই রাধাতত্ত্ব আশ্রয় করেই রসরাজ শ্রীকৃষ্ণ ‘রাস’ রচনা করেন, রস আস্বাদন করেন ও করান। এই রাধাতত্ত্ব আশ্রয় না করলে কৃষ্ণতত্ত্ব কস্মিনকালেও জানা সম্ভব নয়। কারণ সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণই শ্রীরাধাকে আশ্রয় করে নিজেকে আস্বাদন করেন এবং জানেন। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণকে জানতে হোলে রাধারাণীর কৃপা ব্যতিরেকে হবার নয় – বাউলদের এটাই বিশ্বাস।”
আমরা সমাজে দেখতে পাই, বাউল-বৈষ্ণবদের মধ্যে একটা কথা খুবই প্রচলিত রয়েছে যে, ‘রাধারানীর কৃপা না হোলে কৃষ্ণ কৃপা হয় না !’ আলোচ্য অংশে গুরুমহারাজ এই ব্যাপারটাই ভালো করে বুঝিয়ে বললেন। উনি যা বললেন তার সারার্থ হোলো এই যে, শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপশক্তির পূর্ণ অভিব্যক্তি হোলেন শ্রীরাধা। শ্রীকৃষ্ণ এই স্বরূপশক্তি স্বরূপিণী শ্রীরাধার ভিতর দিয়ে নিজেই নিজেকে বোধ করেন। রাধাতত্ত্ব আশ্রয় করেই তিনি রাস রচনা করেন, রস আস্বাদন করেন এবং রাসমঞ্চে উপস্থিত জনেদের সেই রস আস্বাদন করান। সেইজন্যই বলা হয়েছে রাধাতত্ত্ব না জানলে কৃষ্ণতত্ত্ব জানা যায় না, অথবা বলা হয়ে থাকে – রাধারানীর কৃপা না হোলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপালাভ সম্ভব হয় না।
যাইহোক, এবার দ্যাখা যাক্ গুরুজী এরপরে আরো কি কি বলেছেন ! এরপরে উনি বলেছেন – ” অতএব সাধারণী রতির সাধকগণ সহজপ্রীতিবশতঃ অধম অধিকারী। এদের নিজ সুখাসক্তিই প্রধান – কৃষ্ণদর্শন হেতুমাত্র। আত্মসুখের চাহিদা প্রবল, এইজন্য এটা ‘জীবভাব’। এই রতিতে জাগতিক স্থিতিলাভ হয়। এটাই যোনিজ মানুষের স্থিতি। এঁরা ক্ষীরোদ সাগরে অবস্থান করেন, সংসারচক্রে যাতায়াত করেন এবং জাগতিক-প্রাকৃতিক সুখ-দুঃখ ভোগ করেন। পূর্বেই বলা হয়েছে, বাউলমতে এটাই ‘যোনিজ মানুষ’।
সমঞ্জসা রতির সাধকগণ গুণজ প্রীতিবশতঃ মধ্যম অধিকারী। এটা ‘মুক্তভাব’। এই রতিতে মুক্তিলাভ হয়। এটা ‘অযোনিজ মানুষ’-এর স্থিতি। ভগবানের অনন্ত গুণ-ঐশ্বর্য্যের প্রভাবে এঁরা মুগ্ধ। এঁদের ধর্মের প্রাধান্য থাকলেও নিজ সুখস্পৃহাও রয়েছে। এই অবস্থায় বৈকুন্ঠস্থিতি লাভ হয়, যেখানে মুক্তিকামী মুক্তাত্মাগণ অযোনিজ দেহপ্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করেন। যেখানে অনন্ত বাসুদেব চতুর্ভুজ নারায়ণ লক্ষ্মী সহকারে অনন্ত ঐশ্বর্য্যে অনন্ত গুণমন্ডিত হয়ে বিরাজমান। মুক্তাত্মাগণ তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্য্য ও অনন্ত গুণ দর্শন করে ভগবৎ ঐশ্বর্য্যের আনন্দে এবং মুক্তানন্দে মগ্ন থাকেন। বলাবাহুল্য বাউলমতে এঁরাই ‘অযোনিজ মানুষ’।
সমর্থা রতির সাধকগণ নৈসর্গিক প্রীতিবশতঃ উত্তম অধিকারী। এটা ‘সহজভাব’। এঁদের কৃষ্ণ-সুখেই সুখ – নিজ সুখস্পৃহা বর্জন করেন। শ্রী শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতে আছে :– ” আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা – তারে বলি কাম।/ কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা – ধরে প্রেম নাম।৷”– এই সমর্থা রতিতেই ব্রজে স্থিতি লাভ হয়, যা বাউলের ভাষায় সহজপুর। এটাই নৃত্যবৃন্দাবন বা গোলক।৷ এই রতিতেই রাসমঞ্চে প্রবেশাধিকার ঘটে যেখানে দ্বিভূজ ব্রজনন্দন শ্রীকৃষ্ণ বিরাজিত। তিনি নিরন্তর মুরলীধ্বনি সহকারে গোপীগণকে আকর্ষণ করছেন। সমর্থা রতির সাধকগণ এই পরমস্থিতি লাভ করেন এবং পরমানন্দে নিমগ্ন হ’ন। আর বাউলমতে এঁরাই ‘সহজ মানুষ’।
প্রিয় আত্মন – সহজিয়া বাউলমতে এই হলো মানুষ তত্ত্ব।৷”
পাঠকবৃন্দ ! গুরুমহারাজ যত সহজ, সরল এবং বিস্তারিতভাবে তিনপ্রকার ‘রতি’-র ব্যাখ্যা করলেন, আশা করি এমন প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা আপনারা আগে কোথাও পাননি ! আর পাবেনই বা কেমন করে – এ যে সাক্ষাৎ ভগবানের মুখের কথা ! এইগুলিই তো এযুগের ‘গীতা’, কারণ যুগপুরুষ ভগবান স্বামী পরমানন্দ নিজের মুখে এই কথাগুলি বলেছেন !