শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত ও কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো৷ আমরা গুরুমহারাজের স্বহস্ত লিখিত দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা -র সপ্তম পরিচ্ছেদের কথায় ছিলাম ৷ বাউল সাধনার বিভিন্ন অঙ্গ নিয়ে উনি আলোচনা করছিলেন ৷ আমরা এখন চলে যাবো এই পরিচ্ছেদের‌ই পরবর্তী আলোচনায় ৷ দেখা যাক, সেখানে গুরুমহারাজ আরো কি কি কথা বলেছেন !
এর আগের আলোচনায় আমরা দেখেছি গুরুমহারাজ বাউল সাধকদের তিনটি অবস্থার কথা বলেছিলেন – প্রবর্ত্ত, সাধক ও সিদ্ধ অবস্থা ৷ এরমধ্যে আমরা আগের দিন ‘প্রবর্ত্ত’ অবস্থা সম্বন্ধে গুরুজীর আলোচনা শুনেছি, আজ বাকি দুটো সম্বন্ধে আলোচনা হবে ৷ এরপরে গুরু মহারাজ সাধক অবস্থা নিয়ে বলেছেন – ” সাধক অবস্থা :- রাগ ও মঞ্জরীভাব ৷ দুইটি আশ্রয় – রাগানুগা ভাব এবং প্রকৃতি ৷
এই অবস্থায় সাধকের আপন প্রকৃতিগত স্বভাব জাগ্রত হয় এবং সেই স্বভাবানুসারে রাগানুগা ভাবের আশ্রয় নিতে হয় এবং বৈরাগ্য অবলম্বন করে প্রাকৃত কামকে জয় করতে হয় ৷ প্রাকৃত কাম বৈরাগ্য দ্বারা সংযম হোলে গুরুকৃপায় সাধকের ‘কাম’ জয় হয় ৷ তখন প্রকৃতি(নারী)-র প্রয়োজন হয় ৷ কারণ প্রকৃতি ছাড়া পুরুষ একা সাধনা করতে পারে না ৷ রতিকে স্থির অবিচলিত রাখাই এই সাধনার উদ্দেশ্য – এই হোলো ‘মঞ্জরীভাব’ ৷ কিন্তু যতদিন প্রাকৃত কাম-বিজয় না হোচ্ছে (অর্থাৎ প্রাকৃত কাম বিজয় না হওয়া পর্যন্ত), ততদিন প্রকৃতি সঙ্গ করা নিষিদ্ধ ৷ ক্রমে মাধুর্য্যময় নিকুঞ্জ লীলার সূত্রপাত হয়, তখন সাধক সিদ্ধ অবস্থায় উপনীত হ’ন ৷
সিদ্ধ অবস্থা :- প্রেম, সহজভাব বা মহাভাব এবং দুটি আশ্রয় – শ্রীরাধারানীর চরণযুগল ও প্রেমরাগ ৷ এই অবস্থায় প্রাকৃত ভাব বিবর্জিত অপ্রকৃত চিন্ময় সহজাবস্থার শৃঙ্গারাত্মক রসমাধুর্য্যের উন্মেষ হয় ৷”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! গুরুমহারাজ এখানে যে কথাগুলি তুলে ধরেছেন সেগুলি একান্ত সাধনলব্ধ ও বোধের বিষয় ৷ তবে আমরা শুধু ওই কথাগুলির ধ্যান করে একটু আধটু ধারণা করতে পারি – এইমাত্র ! তাছাড়া চিরকালই বাউলেরা তাদের সাধনাকে আমাদের মতো সাধারন মানুষের অগোচরে রেখে এবং তাদের নিজস্বতা বজায় রেখে লালিত হয়েছে – পরিপুষ্ট হয়েছে ৷ সেইজন্য যেসব শব্দ বা term এখানে ব্যবহৃত হয়েছে – সেগুলি আমাদের কাছে ভীষণভাবে অপরিচিত ৷ তবে এইটা বুঝতে পারছি যে, যেহেতু এই বাউল সাধনা প্রকৃতি নিয়ে সাধনা – তাই প্রথমাবস্থা বা ‘প্রবর্ত্ত অবস্থা’ যেন কঠোর ব্রহ্মচর্য্য পালনের অবস্থা ! আর প্রাকৃত কাম জয় না করতে পারলে প্রকৃতি নিয়ে সাধনায় প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ ৷ একমাত্র সিদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত হোলেই সাধক প্রকৃতি-সঙ্গজনিত অপ্রাকৃত চিন্ময় সহজাবস্থার শৃঙ্গারাত্মক রসমাধুর্য্য আস্বাদন করতে পারেন ৷৷ যাই হোক, এখন আমরা দেখবো ওই তিন অবস্থা নিয়ে গুরুমহারাজ আরো কি কি বলেছেন ৷ এরপরে উনি বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্‌ ! ‘প্রবর্ত্ত অবস্থা’-র পরিণতি সাধক অবস্থা এবং ‘সাধক অবস্থা’-র পরিণতি ‘সিদ্ধ অবস্থা’ ৷ ‘প্রবর্ত্ত’ না হয়ে ‘সাধক’ হোলে পতন অবশ্যম্ভাবী ৷ আর সাধকের পূর্ণ পরিণতিই ‘সিদ্ধ’ অবস্থা ৷
‘প্রবর্ত্ত’ অবস্থায় মন্ত্রসিদ্ধ হলে বহিরঙ্গা মায়াশক্তি অপসারিত হয় এবং ভ্রমনিবৃত্তি হয় ৷ এরপর সাধক অবস্থায় সাধনা দ্বারা রতি স্থায়ী বা অটুট হয় ৷ তখন সিদ্ধ অবস্থা উপস্থিত হয়ে থাকে৷
বিন্দু রতিরই নামান্তর৷ এই বিন্দু বা রতি যখন নিষ্কম্প বা স্থির হয়, তখনই অটুট অবস্থা বা ‘সিদ্ধ অবস্থা’ ৷ এই সিদ্ধদেহে প্রেম ও রসের অভিব্যক্তি হয় ৷
প্রিয় আত্মন্‌ ! ‘প্রবর্ত্ত’ অবস্থায় প্রকৃতি গ্রহণ নরকের দ্বারস্বরূপ ৷ কারণ ওই অবস্থাতে প্রকৃতি-সঙ্গ হোলে জীবের পতন হয়ে থাকে ৷ সেইহেতু প্রয়োজন – দাস্যভাব এবং সৎগুরুর চরণযুগল আশ্রয় এবং শ্রদ্ধা রাগ ৷ এটা অভাব স্থিতি – জীবভাব, ক্ষীরোদ সাগরে স্থিত সামান্য মানুষ বা যোনিজ মানুষ ৷৷
দ্বিতীয় অবস্থায় প্রকৃতি মাতৃদ্বারস্বরূপ জননী ৷ তাই প্রকৃতি মুক্তির দ্বারস্বরূপ ৷ সেইহেতু প্রয়োজন মঞ্জরীভাব এবং সখীর চরণযুগল আশ্রয় ও রাগানুগা ভাব ৷ এই অবস্থার নাম স্বভাব – এটাই মুক্তস্থিতি ৷ বৈকুণ্ঠস্থিত অযোনিজ মানুষ ৷
তৃতীয় অর্থাৎ সিদ্ধ অবস্থায় সাধকের দেহ পরিণত হয় সিদ্ধ দেহে এবং এই অবস্থায় প্রেম ও রসের পূর্ণ অভিব্যক্তি হয় ৷ এটা রসিক অবস্থা বা সহজস্থিতি ৷ সেইহেতু এটা মহাভাব এবং আশ্রয় শ্রীরাধারাণীর চরণযুগল ও প্রেমরাগ ৷ এটাই সহজস্থিতি – মহাভাব বা নববৃন্দাবনে স্থিত সহজ মানুষ ৷৷
প্রিয় আত্মন্‌ – এখন বুঝলে তো যে, প্রবর্ত্ত অবস্থায় প্রয়োজন নামাশ্রয় ও মন্ত্রাশ্রয়, সাধক অবস্থায় রাগাশ্রয় ও প্রকৃতি আশ্রয় আর সিদ্ধ অবস্থায় হয় রসের পূর্ণতা, তাই রসিক ৷৷”
প্রিয় পাঠক ! গুরুমহারাজ এই অংশে বাউল সাধনার তিন প্রকার অবস্থার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন এবং আগে আগে যে সমস্ত আলোচনা করেছিলেন, সেগুলির মধ্যে একটা সামঞ্জস্য বিধান করেছেন ৷ বাউলমতে যেমন বলা হয়েছে – ‘প্রবর্ত্ত না হয়ে সাধক হোলে পতন অবশ্যম্ভাবী’, ঠিক তেমনি সাধারণভাবে আমরা জানি যে, ব্রহ্মচর্য্য পালন (কমপক্ষে ১২ বছর) না করে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেও পতনের ভয় থাকে ৷ সুতরাং সব মতেরই সারকথা প্রথমাবস্থায় সাধকের প্রয়োজন সংযম পালন, সাধনা, সদ্গুরুর কৃপালাভ – এইগুলি খুবই দরকার ৷ তারপরে এক একটা চরম পরিণতিতেই সাধক পরবর্তী অবস্থায় পৌঁছায় এবং নিরন্তর সাধনার দ্বারা সাধক ধীরে ধীরে উপনীত হয় চূড়ান্ত অবস্থায় – যা বাউলমতে সহজস্থিতি বা মহাভাব অবস্থা ৷৷