[স্থান:– বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন । সময়:– ১-লা জানুয়ারি, ১৯৯২ । উপস্থিত ব্যক্তিগণ:– দিল্লির ডাক্তার সুধীর, সুরেশজী, মিরাটের রমেশ শর্মাজী, স্বরূপানন্দ মহারাজ, খোকন মহারাজ, জয়দীপ এবং আরো ভক্তগন ।

জিজ্ঞাসু:–” (ডক্টর সুধীর) শিশুর জন্ম নিয়ে আপনি আমাদের ওখানে(দিল্লিতে) একবার কিছু কথা বলেছিলেন! সেই আলোচনাটা আমি আপনার কাছে আরেকবার শুনতে চাইছিলাম। অনুগ্রহ করে যদি আপনি আর একবার বলেন_ তাহলে খুবই ভালো হয়।”

এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ]

…. যাইহোক আবার আমরা আমাদের পূর্বের আলোচনাতেই ফিরে যাই । জন্মগ্রহণ করার ঠিক অব্যবহিত পরেই কিন্তু দেহে কোনো রকম sense কাজ করে না। দেখা যায় হসপিটালের ডাক্তারেরা সদ্যোজাত শিশুটিকে উপর করে তুলে ধরছে, এদিক-ওদিক করছে, তার শরীরটা পরিষ্কার করছে _ এগুলোর কোনো feelings-ই ওই শিশুর থাকেনা ! আমার জন্মকালীন সময়কার অভিজ্ঞতা থাকায় বেশ মনে পড়ছে যে, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জাতকের প্রথম sensation আসে আজ্ঞাচক্রে ! যদি জন্মের ঠিক পরে পরেই কোনো নবজাতকের দুই ভ্রুর মধ্যিখানে(যদিও আজ্ঞাচক্র দুই ভ্রু-র মধ্যবর্তী স্থানে বলতে_ প্রকৃতপক্ষে এটি pituitary gland ! তাই এর সঠিক অবস্থান হোলো মস্তিষ্কের মধ্যিখান এবং ভ্রুদ্বয়ের মধ্যিখানের সংযোগস্থল)একটু খানি touch করা যায়, তাহলে দেখা যায়_ জাতকের শরীরে প্রতিক্রিয়া হোচ্ছে ! যাই হোক, এরপর আজ্ঞাচক্র থেকে জাতকের sensation নিচের দিকে নামতে থাকে ! ওখান থেকে অনুভূতি প্রথমে চোখ দুটিতে নামে, সেই জন্যই দেখবে জন্মের কিছুক্ষণ পরেই শিশুর বোজা চোখ খুলে যায় এবং চোখ দুটি পিটপিট করছে বলে মনে হয়। এরপর অনুভূতি আসে tip of the tongue-এ ! এই পয়েন্টের সাথে যোগাযোগ রয়েছে perinium-এর ! শিশুর জন্মের পরই যখন থেকে জিহ্বায় sensation আসে, তখনই ‘টোঁয়া’-‘টোঁয়া’- করে কান্নার আওয়াজ বেরোয় ! আর দেখা যায় ঐ শব্দের সাথে সাথেই ওই শিশুটির প্রস্রাব হয়ে যায় ! বহুকাল থেকেই ভারতীয় সমাজে একটা প্রথা চালু ছিল যে, নবজাতকের মুখে দু এক ফোঁটা মধু দিয়ে দেওয়া । এর একটা অন্যতম কারণ হোলো পৃথিবীর মধ্যে মধুই একমাত্র পানীয় বা খাদ্য যার পুষ্টিগুণ কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, যা অন্য কোন খাদ্য থেকে পাওয়া সম্ভব হয় না । এর ফলে প্রসবের সময়কালীন কষ্টের পর(আগেকার দিনে ধাইমায়ের সহায়তায় বাড়িতেই সাধারণভাবে (normal) প্রসব করানো হোতো। আমরা গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম,যখন গর্ভস্থ সন্তান মায়ের যোনীপথ দিয়ে বাইরে আসে _ তখন ঐ জাতকের শরীরে এতো বেশি pressure বোধ হয়, যে মনে হয় _ তক্ষুনি সে মারা যাবে।) এছাড়াও মধু ব্যবহার করার অন্য আরেকটা কারণ ও রয়েছে। সদ্যোজাত শিশুর প্রথম ‘ঢোক’ গেলাটা এতটাই কষ্টের যে তা একেবারে অসহ্য ! মনে হয় যেন প্রাণটা বেরিয়ে গেল! একমাত্র মুখে মধু দিলেই ঢোক গিলতে অতোটা কষ্ট হয় না।
যাই হোক, আগেকার দিনে বাড়িতেই প্রসূতির বাচ্চা হোতো, আর শিশুর জন্মের ঠিক পরেই ধাইমায়েরা বাচ্চার মুখে মায়ের দুধ ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করতো। এতে ওই সদ্যোজাতের মুখ নাক চাপা পড়ে যেত এবং তার প্রাণান্তকর অবস্থা হোতো। তারপর মুখে এক মুখ ঘন দুধ এসে যাওয়ায় ওই শিশু সেটা ফেলতেও পারে না_ আবার ঢোক গিলতেও পারে না ! ফলে ঐ সময়েও শিশুটির একটা অসম্ভব কষ্ট হয়। শিশুটি বারবার মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিবাদ করতে চায় কিন্তু পারে না তার ছোট্ট শরীরের অক্ষমতার জন্য । তবে একটু সুযোগ পেলেই সে মুখ থেকে দুধ ফেলে দিয়ে কেঁদে ওঠে, এতেই তার প্রাণটা তখনকার মতো বাঁচে ! তবে অতি কষ্টে-সৃষ্টে দু-এক ঢোক দুধ গেলার পর থেকে অবশ্য সবকিছু ঠিক হয়ে যায় । তখন থেকেই জন্মায় মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ ! গর্ভকালীন অবস্থায় অর্থাৎ গর্ভস্থ শিশুর থাকে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর গর্ভের বাইরে আসার পর ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতার সাথে সাথেই আসে গর্ভধারিণী জননীর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ ! শিশু অবস্থায় যে কোনো জাতকের শরীর রক্ষার জন্য ঈশ্বর ছাড়া, মায়ের মতো আর কে অতো বেশি ভূমিকা নিতে পারে বলো !!
আমার স্মৃতিতে পূর্ব পূর্ব শরীরের অভিজ্ঞতা সব কিছু রয়েছে, তাই আমি দেখেছিলাম যে, প্রতিবার শরীরধারণের সময়__গর্ভে থাকাকালীন অবস্থাতেই আমার করুণাময় ঈশ্বরের পরেই, আমার সেই শরীরের গর্ভধারিণী জননীর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ জাগ্রত হোতো ৷৷ পিতার প্রতি জাতকের কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত হয় অনেক পরে। তারপরে একে একে সূর্য,চন্দ্র, আকাশ,বাতাস,অগ্নি,জল ইত্যাদির প্রতি কৃতজ্ঞতা আসে।।
এইভাবেই গর্ভস্থ অবস্থা থেকে সদ্যোজাত শিশুর অবস্থা পার হয়ে ধীরে ধীরে শৈশব,বাল্য, কৈশোর, যৌবন হয়ে মানুষ পৌঁছে যায় বার্ধ্যক্যে(প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধ্যক্য এক‌ই অবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ মাত্র)। তারপরেই ঐ স্থুলদেহের মরণ ঘটে অর্থাৎ পঞ্চভূত ও অন্যান্য কয়েকটি উপাদান দিয়ে তৈরি দেহটি আবার পঞ্চভূতেই মিশে যায়।।