শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত ও কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো ৷ আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের শ্রীহস্ত লিখিত দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র কথায় ৷ এখন আমরা উক্ত গ্রন্থের অষ্টম পরিচ্ছেদে প্রবেশ করতে চলেছি ৷ আমরা এর আগে দেখেছিলাম যে, গুরুমহারাজ বাউল সাধনার সহজ তত্ত্বের উপর দুটি শ্লোকের উল্লেখ করেছিলেন ৷ যেগুলি সান্ধ্যভাষায় লেখা অর্থাৎ যার মর্মার্থ বাউল সাধক পরম্পরার লোক ছাড়া অন্যেরা বুঝতে পারবে না ৷ এই সমস্ত সহজ তত্ত্বের শ্লোকগুলির ব্যাখ্যা বাউল পরম্পরার গুরুরা তাঁদের শিষ্যদেরকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন – তাই এইসব শ্লোকগুলির অর্থ জানতে চাইলে বাউল-গুরুদের সঙ্গ করা প্রয়োজন হয়, অন্যথায় এসব কখনোই জানা যায় না ৷ যাইহোক, আমরা এবার দেখবো এই গ্রন্থের অষ্টম পরিচ্ছেদে গুরু মহারাজ আমাদের জন্য আরো কি কি রহস্যের উন্মোচন করে রেখেছেন !
অষ্টম পরিচ্ছেদের প্রথমেই উনি নিজেই জিজ্ঞাসার অবতারণা করে স্বয়ং তার উত্তর দিয়েছেন ৷ জিজ্ঞাসাটা ছিল – বাউল সাধনায় যে তিনটি অবস্থা (প্রবর্ত্ত, সাধক ও সিদ্ধ)-র কথা বলা হয়েছিল – তাতে উল্লেখিত ‘বহিরঙ্গা মায়াশক্তি’ বলতে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে ? গুরুমহারাজ তার উত্তরে বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! আমি আলোচনা করছি তুমি শ্রবণ করো, তোমার (আমাদের সবার) নিশ্চয়ই মনে আছে শক্তি ও শক্তিমানের পার্থক্য বর্ণনার সময় বলেছিলাম – শক্তিমান হোলো নিস্তরঙ্গ (static) আর শক্তি হোলো তরঙ্গায়িত (dynamic) | এই শক্তির ক্রমসংকোচ ও ক্রমবিকাশ রূপ__ দুটি অবস্থা আছে ৷ কিন্তু শক্তিমানের স্থিতির কদাচ কোনোরূপ পরিবর্তন হয় না ৷ শক্তিমান নিত্যই সাক্ষীরূপে আপন শক্তির এই সংকোচ ও বিকাশরূপ খেলা দেখতে থাকেন ৷
স্বরূপ শক্তির সংকোচ অবস্থায় শক্তি স্বরূপে লীন হয়ে যায় এবং প্রসারণ অবস্থায় তা পুনরায় স্বরূপ শক্তি হোতে প্রসারিত হোতে থাকে ৷ অর্থাৎ ক্রমবিস্তার হোলো অবরোহ এবং ক্রমসংকোচ হোলো আরোহ ৷ এইভাবে স্বরূপ শক্তির অবরোহ ও আরোহক্রমে একটি বিবর্তন সম্পূর্ণ হয় ৷ এটাই হোলো পরমেশ্বরের বিবর্ত বিলাস বা লীলা বিলাস ৷
প্রিয় পাঠক ! এই অংশে গুরুমহারাজ ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের বিবর্ত বিলাস বা লীলা বিলাস খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ৷ ব্রহ্ম বা শক্তিমান ও তার শক্তি – এই নিয়েই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ! একেই গুরুমহারাজ static ও dynamic বলে বর্ণনা করেছেন ৷ শক্তি বা dynamic-এর দুটি রূপ রয়েছে ক্রমসংকোচ (অবরোহ) আর ক্রমবিকাশ বা ক্রমপ্রসারণ (আরোহ) ৷ শক্তি যতই তরঙ্গায়িত বা dynamic হোক না কেন – শক্তিমান অর্থাৎ ব্রহ্ম সবসময় সব অবস্থাতেই static এবং নিজে সাক্ষীস্বরূপ থেকে তাঁরই শক্তি অবরোহ ও আরোহের খেলা আস্বাদন করেন ৷
ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের স্বরূপ শক্তির সংকোচ হয়ে বা অবরোহক্রমে ব্রহ্মের ‘স্বরূপে’ লীন হয়, আবার প্রসারণের সময় আরোহক্রমে স্বরূপ শক্তি থেকেই তা হয়ে থাকে । একটি আরোহক্রম এবং একটি অবরোহক্রম নিয়েই বিবর্তন সম্পূর্ণ হয়, আর এটিকেই বলা হোচ্ছে ব্রহ্মের বিবর্তবিলাস বা লীলা বিলাস ৷
যাইহোক, আমরা এখন দেখি এরপরে গুরুমহারাজ এই বিষয়ে আরো কি কি বলেছেন ৷ এরপরে উনি বলেছেন – ” যিনি আপন শক্তি সহায়ে আপনি আপনাকে বোধে বোধ করেন বা আপনি আপনার রসমাধুর্য্য আস্বাদন করেন, তিনি রসরাজ — পরম রসিক ৷ তিনি সচ্চিদানন্দস্বরূপ, সৎ–সন্ধিনী, চিৎ–সম্বিৎ এবং আনন্দ–হ্লাদিনী ৷ তাঁর অনন্ত শক্তির মধ্যে স্বরূপ শক্তি হোলো প্রধান। স্বরূপ শক্তিই আবার অন্তরঙ্গা, বহিরঙ্গা এবং তটস্থা নামে পরিচিত ৷ এইগুলি যথাক্রমে – চিৎশক্তি, মায়াশক্তি এবং জীবশক্তি নামেও অভিহিত করা যায় ৷”
প্রিয় পাঠক ! এই অংশে গুরুমহারাজ ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের স্বরূপ শক্তির কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন ৷ উনি বলেছেন যে, ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের অনন্ত শক্তি রয়েছে – তার মধ্যে তাঁর স্বরূপশক্তিই হোলো প্রধান ৷ এই স্বরূপশক্তির-ই ক্রমসংকোচ ও ক্রমপ্রসারণ অর্থাৎ অবরোহ ও আরোহ হয়, যার ফলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংস ও সৃষ্টি হয়। এই স্বরূপ শক্তির আবার তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে অন্তরঙ্গা, বহিরঙ্গা ও তটস্থা যা যথাক্রমে চিৎশক্তি, মায়াশক্তি ও জীবশক্তি নামেও অভিহিত হয়ে থাকে ৷
গুরুমহারাজ এটাও বললেন যে, আপন স্বরূপ শক্তির সহায়ে যিনি আপনাকে বোধ করেন বা আপনার রসমাধুর্য্য আস্বাদন করেন, তিনিই রসরাজ পরমরসিক ৷ তিনি সচ্চিদানন্দস্বরূপ ৷ সচ্চিদানন্দ অর্থে সৎ-চিৎ-আনন্দ ! এটিকেও গুরুমহারাজ সহজভাবে ভেঙে বিশ্লেষণ করেছেন ৷ বলেছেন – সৎ অর্থে সন্ধিনী, চিৎ অর্থে সম্বিৎ আনন্দ অর্থে হ্লাদিনী বা মহাভাবময়ী শ্রীরাধা ৷৷
