শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো ৷ আমরা ওনার লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ *বাউলের মর্মকথা*-র অষ্টম পরিচ্ছেদের আলোচনায় ছিলাম ৷ আমরা আগের আলোচনায় দেখেছি উনি ‘অভাব’, ‘স্বভাব’ এবং ‘মহাভাব’ – মানবের এই তিন ভাব-অবস্থার কথা আমাদেরকে বুঝিয়ে বলছিলেন ৷ সেইসব কথার রেশ ধরেই আমরা এখন দেখবো যে, উনি এই বিষয়ে আরো কি কি বলেছেন ৷

এরপর উনি বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্‌ – ঐ অণুরূপ জীবাত্মা বিভুচৈতন্য পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত না হোলে নিত্যলীলার আস্বাদন লাভ হোতে পারে না, অর্থাৎ অণুচৈতন্য বিভুচৈতন্যের সঙ্গে যোগাবস্থাতেই ঐ পূর্ণানন্দ অনুভব করে ৷ এটাই প্রকৃত ‘স্বভাব’ অবস্থা ৷
সুতরাং ‘অণু’-রূপী অংশ ‘বিভু’-রূপী অংশীর সঙ্গে মিলিত না হোলে নিত্যলীলার আস্বাদন কে গ্রহণ করবে ? এই লীলাবিলাস নিরবচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত হোচ্ছে তারই জন্য ৷
অথচ জীব, জীব থেকে অর্থাৎ জীবত্ব অবস্থায় এই লীলাভোগের অধিকারী নয় ৷ প্রয়োজন জীবত্ব বলি অর্থাৎ জীবের আত্মবলি পূর্ণ না হোলে আত্মপ্রতিষ্ঠা হয় না ৷ আর যতক্ষণ জীবত্ব, ততক্ষণ এই লীলায় প্রবেশাধিকার হয় না ৷
প্রিয় আত্মন্ ! স্বভাবের চরম পরিণতি ‘মহাভাব’-এর যে অবস্থায় অনাবিল, উল্লাসময় লীলারস মাধুর্যের আবির্ভাব হয় ৷ যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না – তা কেবল অপরোক্ষ অনুভূতি সাপেক্ষ ৷৷”

প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! গুরুমহারাজের কথা এতোদূর পর্যন্ত শোনার পরে থামতেই হোলো ! কি সাংঘাতিক সব কথা ! আমরা সাধারণ মানুষেরা কি নিয়ে পড়ে রয়েছি ! আমরা শিক্ষার, ধনের, রূপের, আভিজাত্যের, যৌবনের উচ্ছলতার – ইত্যাদি আরো অনেক কিছুর গর্ব বা অহংকার করি, ভাবি_ আমি আর পাঁচজনের চেয়ে কতোটা আলাদা – কতোটা উন্নত !! আর সবসময়ই সেইটা নিয়ে সকলকে দেখাতে অর্থাৎ নিজেকে অপরের কাছে show করতে ভালবাসি ! আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার একটু এগিয়ে গিয়ে গর্ব বা অহংকার করি – ‘ আমি কতোটা ধর্মীয় অনুভূতিসম্পন্ন বা আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত ! দ্যাখো- দ্যাখো, তোমরা সবাই আমাকে দ্যাখো ! কিন্তু গুরু মহারাজের বক্তব্য অনুযায়ী এইগুলি সবই ‘অভাব’ অবস্থা !

‘স্বভাব অবস্থা’ সম্বন্ধে গুরুমহারাজ বললেন – ” অণুচৈতন্য (ব্যক্তিসত্তার চেতনা) যখন বিভুচৈতন্য (সমষ্টিসত্তার বা ঈশ্বর চেতনা)-র সাথে যোগাবস্থায় থাকে, তখনই পূর্ণানন্দের আস্বাদন হয় – সেটাই হোলো ‘স্বভাব’ অবস্থা ৷” তাহলে ‘স্বভাব’ অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া মানেই আর সেখানে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ ছাড়া আর অন্য কোনো ‘কথা’ কোথায় ? ‘আমাকে দ্যাখো’– এই ভাব কোথায় ? সেখানে তো শুধুই আস্বাদন ! পূর্ণানন্দের আস্বাদন !! আর শুধু নিজেই নিজেকে আস্বাদন নয় – এইরূপ স্থিতিপ্রাপ্ত মানবের চারিপাশে যারা থাকে তারাও সেই আনন্দের আস্বাদ প্রাপ্ত হয় ! ঐরূপ ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে একটা আনন্দের হাট বসে যায় ! আনন্দের ‘হরির লুট’ বয়ে যায় !
আর ‘মহাভাব’ অবস্থা ? এইটি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে গুরুমহারাজ এককথাতেই বলে দিয়েছেন — ” ‘স্বভাব’-এর চরম পরিণতি ‘মহাভাব’-এ !!” এই অবস্থায় উপনীত হোলে আর শুধু আনন্দের আস্বাদনই নয়, এই অবস্থায় অনাবিল উল্লাসময় লীলরস মাধুর্যের আবির্ভাব হয় ৷ এই অবস্থা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না – তা শুধুই অপরোক্ষ অনুভূতি সাপেক্ষ ! সুতরাং এই অবস্থা অব্যক্ত—অবর্ণনীয়, শুধু পূর্ণানন্দের লীলারস মাধুর্যে পূর্ণাবস্থা !
এই ‘মহাভাব’ অবস্থার বর্ণনার পর গুরুমহারাজ এইসব বিষয়ে আরো কি কি বলেছেন, সেটাই এখন দ্যাখা যাক্। এরপরে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্‌ – অচিদাকাশ এবং চিদাকাশ অর্থাৎ বহিরঙ্গা মায়াশক্তি এবং অন্তরঙ্গা চিৎশক্তির বিস্তার বা বিলাস, আকাশদ্বয়ের মধ্যে হয়। এই উভয় আকাশের মধ্যবর্তী সাম্যরূপ এক শুদ্ধশক্তি বিরাজ করছে – তার নাম ‘বিরজা’ নদী৷ জীবকে ভগবৎধামে প্রবেশ করতে হলে অন্ড, পিণ্ড এবং ব্রহ্মাণ্ড হোতে উত্তীর্ণ হয়ে বিরজাতে স্নান করতে হবে, আর সেখানে স্থূল- সূক্ষ্ম এবং কারণরূপ তিনটি শরীরকে বিসর্জন দিয়ে বিরজা হোতে উত্থিত হোতে হবে ৷
এখন বুঝলে, ত্রিশরীর চিরতরে বিসর্জন দিয়ে সেখান হোতে বিশুদ্ধ সত্ত্বময় অপ্রাকৃত ভাগবতী তনু বা শরীর নিয়ে পুনরুত্থান এবং নিত্যলীলায় বা রাসলীলায় প্রবেশ ৷ এই হল ‘মহাভাব’ ৷

প্রাকৃত শরীর এবং ইন্দ্রিয় নিয়ে রাসলীলার প্রবেশ করা যায় না ৷ একমাত্র অপ্রাকৃত ভাগবতী শরীর নিয়েই রাসে প্রবেশ করতে পারা যায়। এটাই ‘মহাভাব’ বা ‘রাধাভাব’ ৷”
উপরের অংশে গুরুমহারাজ এমন কিছু শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন, যেগুলোর সাথে সত্যি-সত্যিই আমাদের কোনোরকমভাবেই পরিচয় ঘটেনি – তাই কথাগুলি কিছুতেই বোধগম্য হোতে চাইছে না। শুধু এটাই বোঝা গেল যে, বহিরঙ্গা বা অন্তরঙ্গা শক্তির মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে ‘বিরজা নদী’৷ আমরা আগেই দেখেছিলাম যে, গুরুমহারাজ বলেছেন যে সহস্রার বা অক্ষয় সরোবর এবং আজ্ঞাচক্র বা প্রেম সরোবরের মধ্যবর্তী স্থানে বিরজার প্রবাহ বিদ্যমান থাকে ৷ আর আমরা গুরুমহারাজের কাছে এটাও শুনেছিলাম যে, আজ্ঞাচক্রের পারে পৌঁছালেই জীব, ‘শিব’ হয় ৷ বাউলমতে এটাকেই বলা হয়েছে – বিরজায় স্নান! কিন্তু শুধুমাত্র এখানে স্নান করলেই হবে না_ সেখানে ত্রি-অভিমানিক শরীর (স্থূল, সূক্ষ্ম, কারণ) বিসর্জন দিয়ে, বিশুদ্ধ সত্ত্বময় অপ্রাকৃত ভাগবতী তনু লাভ করতে হয় এবং একমাত্র সেই শরীর নিয়েই রাসলীলায় প্রবেশ করা যায় ৷৷