[এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ]
…. এরপর ক্রিয়াশীলতা হারায় পদ বা পা, আর এর সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের যাবতীয় ক্রিয়াশীলতা হারিয়ে যায় এবং ওই মুমূর্ষু ব্যক্তিটির শরীর স্পর্শ তন্মাত্রার বোধ হারিয়ে ফেলে । তখন ওই ব্যক্তিকে চিমটি কাটলেও তার ব্যাথা অনুভূত হয় না।
এরপর ওই ব্যক্তির pinial বা সহস্রার থেকে আসা শক্তির প্রবাহ, আর পাণি বা হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে তখন দেখা যাবে, হাতের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় ! আর হাতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রিয় চক্ষুও তার ক্রিয়াশীলতা হারাতে থাকে। মরনোন্মুখ ব্যক্তিটি চোখে তখন ঝাপসা দেখতে থাকে এবং হঠাৎ করে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে বলে বোধ হয়। রূপ তন্মাত্রা চলে যাওয়ায় সে চিৎকার কোরে আলো জ্বালার কথা বলতে চায়_ কিন্তু ততক্ষণে বাগেন্দ্রিয়ের ক্ষমতা চলে যাওয়ায় শুধু একটা ‘গোঁ-গোঁ’ আওয়াজ হয়, কোনোরকম স্পষ্ট কথা আর সেই ব্যক্তি বলতে পারেনা । ওই ব্যক্তির তখন শব্দ তন্মাত্রার আর কোনোরূপ বোধ থাকে না। আর এই অবস্থা দেখে উপস্থিতজনেরা বলে থাকে যে_ ‘ ব্যক্তিটির মৃত্যু ঘটেছে’। যদিও মানুষের brain cell-গুলি আরও বেশ কিছুক্ষণ জীবিত থাকে, সেইজন্যই ডাক্তারেরা দেহের মৃত্যুর সাথে সাথেই death certificate দেয় না, একটা নির্দিষ্ট সময় পরে দেয়।
তবে, এই যে পরপর ব্যাপারগুলি বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে ঘটতে থাকে_ তখন মরণোন্মুখ যে কোনো মুমূর্ষু ব্যক্তির চারপাশে বিভিন্ন প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজনেরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনোভাবেই ঐ রোগীকে বাইরে থেকে কিছুমাত্র সাহায্য করতে পারেনা । প্রকৃত ‘মৃত্যু যন্ত্রণা’ বলতে এই মানসিক যন্ত্রণাটাকেই বলা যায় । মৃত্যুর পূর্বে অন্য যেকোনো দৈহিক যন্ত্রণা ওই ব্যক্তিকে অতোটা কাতর করতে পারে না, কারণ শরীরের অভ্যন্তরস্থ nerve-গুলি অল্প অল্প করে আগেই তাদের ক্রীয়াশীলতা হারিয়ে বসেছে । কিন্তু ওই মুমূর্ষু ব্যক্তিটি এই প্রথম বুঝতে পারে যে, সংসারে কেউই তার প্রকৃত আপন নয় ! এমনকি তার যে এতো প্রিয় তার দেহ বা শরীর__ সেই দেহও তার আপন নয় ! হাত পা ইত্যাদি অঙ্গগুলি তুলতে চাইলেও, সেগুলিকে সে নড়াতে পারে না ! কথা বলতে চাইলেও সে কথা বলতে পারে না। কাউকে ভালো করে দেখতে চাইলেও তাকে সে দেখতে পায় না ! এই ব্যাপারগুলিই নিদারুণ কষ্টের ! সারা জীবন ধরে ওই ব্যক্তি কত কথা বলেছে_ ঐ মুহূর্তে সে দু-একটা কথা বলার জন্য ছটফট করে ! নিকট জনেদের দেখার জন্য তার প্রাণটা আকুল হয় ! কিন্তু সব বৃথা হয়ে যায় ! তখন সে চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে চায়_ অভিযোগ জানাতে চায় কিন্তু পারে না ! আর কেউ কেউ আবার মৃত্যু কালে তার অতি প্রিয় ছেলে বা মেয়ে অথবা নাতি-নাতনীর জন্য আকুল হয়(কারণ দেহের মৃত্যু হোলে কি হবে_মনের ক্রিয়াশীলতা তো তখনও রয়েছে) এবং এই অবস্থায় মারা যায়। এর ফলে, পরবর্তীতে ছেলে বা মেয়ের কাছে ফিরে এসে নাতি বা নাতনি হয়ে জন্মায় অথবা নাতি বা নাতনির কাছে তাদের সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করে । মৃত্যু কালীন সময়ে তার ভাবনা যা থাকে, সেটাই তার পরবর্তী জন্মকে রূপ নিতে বাধ্য করে । তাই বলা হয় _’যো মতি, সো গতি’!
যাইহোক মৃত্যু কালীন ওই দারুন সংকটকালে সে বুঝতে পারে যে, তার প্রিয়জনেরা বা আত্মীয়-স্বজনেরা সেখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও_ সে একা, একদমই একা__এমনকি তার নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার স্ববশে নাই_ সেই সময় নিদারুণ একাকীত্ব ওই মুমূর্ষু ব্যক্তিটিকে এতো ব্যথিত করে তোলে যে, সে কথা মুখে বলা যায় না! এর ফলে তার চোখে মুখে সেই সময় শুধু ভয় ফুটে ওঠে, আর ফুটে ওঠে উৎকন্ঠা ! কারণ তখনো ওই ব্যক্তির চেতনা লুপ্ত হয়নি, তাই সে বুঝতে পারে যে সে এই জগৎ সংসারে বড়োএকা ! তাছাড়া সেই সময় তার বোধ হয় যে, সে গভীর কোনো গভীর অন্ধকারে ঢুকে যাচ্ছে, যেন কেবল ঢুকেই যাচ্ছে ! তাই সে তখন নিতান্ত অসহায়তায়, উদ্বেগে, উৎকণ্ঠায় এবং ভয়ের মধ্যে মারা যায়। এইজন্যেই মৃত্যুর আগে বেশিরভাগ মানুষেরই মুখে চোখে একটা ভয়ার্ত ভাব ফুটে উঠতে দেখা যায়।
একমাত্র যদি ওই ব্যক্তি সদ্গুরু আশ্রিত হয়, তাহলে সেই সময় অর্থাৎ ওই নিদারুণ সংকটকালে, চরম ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সদ্গুরুর সূক্ষ্ম বা কারণ শরীর ওই ব্যক্তির চেতনায় গভীর অন্ধকারের মধ্যে আলোক-জ্যোতিঃর ন্যায় এসে দাঁড়ায় এবং সেই সদগুরু তখন ঐ মুমূর্ষু ব্যক্তির চেতনায় টোকা দিয়ে বলে ওঠেন_” ভয় কি রে ! আমি তো তোর পাশেই রয়েছি!” এই আশ্বাসবানী শুনতে শুনতে, আর জ্যোতির্ময় রূপে-করুণাময় রূপে শ্রীগুরুর প্রসন্নতা মাখা মুখখানি দেখতে পেয়ে তার একটা চরম নিশ্চিন্ততা আসে এবং মুখে ফুটে উঠে স্মিত হাসি ! পরম নিশ্চিন্তে সে যেন ঘুমিয়ে পড়ে ! এর ফলে ঐরূপ ব্যক্তির মৃত্যুর পর মৃতদেহের মুখমন্ডলে একটা প্রশান্তির ভাব পরিলক্ষিত হয়।
সেইজন্যেই ভারতীয় শাশ্ত্রে বলা আছে _একমাত্র সদগুরুই প্রকৃত আত্মীয়, বন্ধু, প্রিয়জন ! কারণ তিনি যে ভবপারের কান্ডারী ! এপারের(ইহজগতের) বন্ধু, কান্ডারী অনেকে হোতে পারে কিন্তু পরকালের কান্ডারী একমাত্র সদ্গুরু ছাড়া আর কেউ হোতে পারে না। এজন্যই তো গুরুকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় _”ভবসাগর তারণ কারণ হে”।।
