জিজ্ঞাসু:–ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের যে ফোটোগুলি পাওয়া যায়, সেখানে তাঁর সমাধিস্থ অবস্থার একটি ফোটো রয়েছে_ সেখানে দেখা যায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের হাত দুটি এক বিশেষ ভঙ্গিতে রাখা রয়েছে ! ঐরূপ ভঙ্গিমার সঠিক অর্থ কি_গুরুজী ?
গুরু মহারাজ:–ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের যে দন্ডায়মান অবস্থায় ফোটোটার কথা তুমি বলতে চাইছো__ একটা হাত ঊর্ধ্বে তোলা এবং অপর একটি হাত বুকের কাছে রয়েছে এবং আঙুলগুলি বিশেষভাবে রাখা__ ওইটা তো ? ওখানে ঠাকুর যে বিশেষ মুদ্রাটি করেছেন_ ওই মুদ্রাটির নাম ‘সমর্পণ মুদ্রা’ ! ‘মুদ্রা’ ব্যাপারটা যোগবিজ্ঞানে রয়েছে, পরে ভারতীয় পরম্পরায় পূজা পদ্ধতিতে আসন-প্রাণায়াম-মুদ্রা এগুলি ঢুকেছে! দেখবে যে, যেকোনো দেবদেবীর পূজার শুরুতে পুরোহিতরা উভয় হাতের আঙুল গুলির মধ্যে মধ্যমা ও তর্জনী মুড়ে এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট ও কনিষ্ঠা বিস্তার করে__ বাম হাতের উপর দক্ষিণ হাত চাপা দিয়ে একটা বিশেষ মুদ্রা করে । এইগুলির কোনোটি ‘আবাহন মুদ্রা’, কোনোটি ‘স্থাপন মুদ্রা’ ইত্যাদি। এগুলি ছাড়াও আরো নানারকম মুদ্রা রয়েছে।
যাই হোক, তোমার কথায় আসি। ব্যাপারটা কি জানো__ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান কিন্তু ঐ শরীরে যেহেতু উনি পুরোহিত বংশে শরীর গ্রহণ করেছিলেন, তাই ছোটবেলা থেকেই পুজো পাঠ করতে করতে এই কাজে তিনি বেশ পটু হয়ে উঠেছিলেন । কাজেই বিশেষ বিশেষ মুদ্রার প্রয়োগ, ছোটোবেলা থেকেই তাঁর অভ্যাসের মধ্যে ছিল। প্রায়শঃই পূজার সময় বা ধ্যান করার সময় অভ্যাসবশতঃ আপনা আপনিই ওনার সমর্পণ মুদ্রার প্রয়োগ হয়ে যেতো।
দ্যাখো, ঐ যে বলা হোলো_ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন স্বয়ং ভগবান ! সেই অমূর্তই মূর্তি ধারণ করে এসেছিলেন ধরণীর ধুলায়। সুতরাং তাঁর মতন আর কে হোতে পারে ? এঁর জুড়ি মেলা ভার ! ফলে তিনি যখন যেটা করতেন_ সেটা হোতো নিখুঁত, perfect !
জানো তো__ প্রকৃতপক্ষে সমস্ত কিছুকে নতুন ভাবে, নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা করাটাও ভগবানের অর্থাৎ ঈশ্বরের অবতারগণের একটা অন্যতম কাজ। ‘সমস্ত কিছু’ বলতে__ তা সে যত ক্ষুদ্র বা অবহেলিত-ই হোক বা যত বৃহৎ-ই হোক ! সকল কিছুকেই মান্যতা দান করা, সব কিছুকে perfection দেওয়ার জন্যই তাঁদের অবতরণ। সকলকে সমানভাবে সম্মান দেওয়া বা মান্যতা দান করার ক্ষমতা ভগবান স্বয়ং ছাড়া আর কারই বা থাকতে পারে বলো?
যাইহোক, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় ফিরে আসি । ওই যে বলছিলাম __ছোটবেলা থেকেই পুজো করার সুবাদে বিভিন্ন মুদ্রাগুলি করার অভ্যাস ওনার ছিল । এইজন্য ধ্যানের গভীরতায় বা সবিকল্প সমাধির সময়– তখন ওনার শরীরের হুঁশ থাকতো না ঠিকই কিন্তু ঐ অবস্থায় ওনার বাম হাত বুকের কাছে আসতো _ আর ডান হাত উপরে উঠে যেতো। সেই সাথে দুই হাতের আঙুলগুলি নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় set হয়ে যেতো। ঐরূপ ভঙ্গিমা যে ওনার জীবনে একবারই অর্থাৎ ওই ফোটোটি তোলার সময়েই হয়েছিল _এমন কিন্তু নয়, অনেকবারই হয়েছে। আমাদের সৌভাগ্য যে, ঐ ফোটোটি যিনি তুলেছিলেন _ সেই সময়েও ঠাকুরের ঐ ভাব প্রকাশ পেয়েছিল এবং ঠাকুরের ঐ মুদ্রার প্রয়োগের কথা আমরা জানতে পেরেছিলাম।
এইভাবেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের তৎকালীন সময়ের ভাব সমাধিস্থ অবস্থার ঐ বিশেষ ভঙ্গিমার ছবিটি __আধুনিক কালের মানুষদের কাছে এক নতুন আর্ট হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করলো ! ভক্তদের হৃদয়মন্দিরে স্থান করে নিল—‘দন্ডায়মান অবস্থায় সমাধিস্থ ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ’।।