স্থান:—বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন। সময়:–মার্চ, ১৯৯৯!
উপস্থিত ব্যক্তিগণ:— জম্মুর কৌশলজী, মোরাদাবাদের সি এল শর্মাজী, হীরালাল, স্বামী স্বরূপানন্দ, নগেন এবং অন্যান্য ভক্তগণ।
জিজ্ঞাসু(উত্তর ভারতের এক ভক্ত):– কোনো গুরুর শিষ্য যদি তার গুরুকে-ই ভগবান ভাবে__যদিও সে জানে যে, তার গুরু আধ্যাত্মিক ভাবে যথেষ্ট উন্নত নয় বা তিনি ব্রহ্মজ্ঞ ন’ন___ তাহলে সেটা কি ঐ শিষ্যের আধ্যাত্মিক উন্নতিতে কোনো খারাপ ফল দেবে ?
গুরু মহারাজ:—দ্যাখো, individual কোনো ভাবনা, তার নিজের কাছেই রাখা ভালো। মানুষের ভাবনা, ‘ভাব’ থেকে আসে । আর যে কোনো ‘ভাব’কে আশ্রয় করেই সাধককে এগিয়ে যেতে হয় অর্থাৎ সাধনার দ্বারা ওই ভাবকে পুষ্ট করতে হয়। পুষ্ট ভাব দিয়েই ‘অধরা’-কে ধরতে পারা যায় ! এইটাই আধ্যাত্মিক জগতের উন্নতির ক্রম।
মুক্তা সৃষ্টিকারী ঝিনুক__ প্রথমে এক দানা বালিকে শরীরে গ্রহণ করে, তারপর ধীরে ধীরে ঐ বালি দানা-ই মুক্তায় রূপান্তর ঘটে থাকে । বালির দানা শরীরে ঢোকার পর ঝিনুকটির নিদারুণ যন্ত্রণা হোতে শুরু করে__ ফলে তখন থেকে তার সমস্ত concentration থাকে ওই বালিদানাটি যে স্থানে রয়েছে _সেটির উপরে। এরপর ওই যন্ত্রণাক্লিষ্ট ঝিনুকটি সমুদ্রের খুব গভীরে চলে যায় । সেখানে ওই বালির দানাটি তার শরীরের বিভিন্ন কেমিক্যাল-এর সঙ্গে বিক্রিয়া করে ধীরে ধীরে মুক্তায় রূপান্তরিত হয়। এরপরেই ঝিনুকটি মারা যায়। কালের প্রভাবে হয়তো তার দেহখোলটিও নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু পড়ে থাকে মুক্তা (যা সহস্র সহস্র বছরেও নষ্ট হয় না), তার উজ্জ্বল্য এবং উৎকর্ষতা নিয়ে!!(গুরু মহারাজ বলেছিলেন সমুদ্রকে “রত্নাকর” বলা হয় এইজন্যেই ! সমুদ্রের তলদেশে এইরকম কতো শত মনি-মুক্তা-মাণিক্য পড়ে রয়েছে_কে-ই বা তার হিসাব রাখে !) _ ব্যাপারটা তোমাকে বোঝাতে পারলাম কি ?
কিন্তু মুশকিল টা কি জানো__ সাধারণ মানুষের মনের ভাব অধিকক্ষণ স্থায়ী হয় না । মনে সবসময় নানা বিষয় সংযুক্ত হয়__ ফলে মানুষের মন সদা সর্বদা চঞ্চল হয়ে থাকে । মানুষ তো সবসময় বিষয় নিয়েই রয়েছে, তাই মনের আর দোষ কি ? আগুনের কাছে থাকবে_ অথচ তার উত্তাপ নেবে না, তাই আবার হয় নাকি ! আবার যদি বরফের পাশে থাকো তাহলে ‘হিম’ অনুভূত হবেই হবে__ তাই নয় কি !
সেইভাবেই বিষয়ের সংযোগে মন সদাই চঞ্চল হয়ে থাকে । এইজন্যেই ধ্যানে বসলেও বেশিরভাগ মানুষের মন একাগ্র হোতে চায় না । সাধারণ একটা লক্ষণের কথা তোমাদেরকে বলছি শোনো, এটা খেয়াল করলে তোমরাও নিজেরা বুঝতে পারবে_ কোনো ব্যক্তির মন একাগ্র হোতে শুরু করেছে কিনা ! যদি দ্যাখো কোনো সাধকের চক্ষু স্থির হয়েছে_ তাহলেই জানবে তার প্রাণ স্থির হোতে শুরু করেছে। আর যার প্রাণ স্থির হয়েছে, একমাত্র তারই মন একাগ্র হয়েছে_জানতে হবে। কেউ চোখ বুঁজে অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকতে পারে_ তাই বলে মনে কোরো না যে, সেই ব্যক্তিটি খুব বড় আধ্যাত্মিক ! কারণ সাধারণ অবস্থায় তার চোখের দিকে চেয়ে যদি দ্যাখো_ চোখের মধ্যে চঞ্চলতা রয়েছে, তাহলে জানবে যে_ তার ঠিক ঠিক ধ্যান কখনোই হয় না, সে ধ্যান করতে বসে ধ্যানের ভান করে মাত্র ! সাধারণ মানুষ চোখ বুঁজলেই কত রকমের vision দেখে_ তাই না ! বন্ধ চোখের সামনে অদৃশ্য পর্দায় কতো কি যে ভেসে ওঠে তার ইয়ত্তা করা যায় না। যেগুলো হয়তো তুমি এখন ভাবছো না_ সেই সব ভাবনাও চলে আসে! যা তুমি এখন দেখছো না_ সেগুলোও দেখবে চোখ বুঁজে ধ্যান করার সময় চলে আসছে ! …… [ক্রমশঃ]