জিজ্ঞাসু : আপনার শরীরধারণ জীবকল্যাণের জন্য, কিন্তু জীবনধারণ মানেই তো কষ্ট?
গুরুমহারাজ : কষ্ট কি গো ! প্রেমে বেদনা রয়েছে, বিরহ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো তো লীলা’ বা বিলাস, বলতে পারো বেদনা- বিলাস বা বিরহ-বিলাস। তাই শারীরিক দুঃখ, কষ্ট ইত্যাদি বলা শোভা পায় না। মা সন্তানের জন্য কত কষ্ট করে কিন্তু শিশুর হাসিমুখ দেখতে পেলেই সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যায়। তাও তো ঐ উদাহরণ মায়া বা মোহের জগতে। অধ্যাত্মজগতের লীলায় যে সব অবতরণ হয় তা নির্ধারণ করেন মহাবিশ্বপ্রকৃতি বা মা জগদম্বা। সেখানে ঐ বুদ্ধি খাটিয়ে জিজ্ঞাসার বা উত্তরদানের আলাদা অস্তিত্ব আছে কি ? সেখানে সবই লীলা আর আমরা সবাই সেই লীলার অংশীদার মাত্র। মা জিজ্ঞাসু : আপনার শরীরধারণ সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি কিন্তু আপনি নিজে যদি বলেন তাহলে খুবই কৃতার্থ হই। হাতিয়াতে চাচাঃ গুরুমহারাজ : দ্যাখো, এসব কথা বলা আমার প্রকৃতিতে নেই কিন্তু তোমরা আমার প্রিয়জন তাই তোমাদের অনুরোধ উপেক্ষাও করতে পারি না। যাইহোক শোন।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ-স্বামীজীর পর পৃথিবীগ্রহের আধ্যাত্মিক ভাররাশির যে সঞ্চিত ভাণ্ডার, তা খুবই কম হয়ে গিয়েছিল। আমার কথাটা হয়তো ঠিক ধরতে পারছো না। স্বামী বিবেকানন্দ এক জায়গায় বলেছিলেন—ভারতবর্ষ অধিক সংখ্যক মহাপুরুষের জন্ম দিতে গিয়েই এখানকার সাধারণ মানুষগুলো শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। এখানে ব্যাপারটা কি হয় জানো তো, এক-একজন মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করার পর যখনই আধ্যাত্মিক শক্তিলাভ করেন, তখন তাঁরা সাধারণ মানুষের কষ্ট, অজ্ঞানতা এসব দেখে প্রেমে কাতর হয়ে পড়েন। আর তখন বহুজন হিতায় নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন। ফলে তাঁরা সঞ্চিত যোগলব্ধ বা যে কোন প্রকারে লব্ধ আধ্যাত্মিক সম্পদ অকাতরে সাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে চলে যান। এই ভাবেই পৃথিবীর আধ্যাত্মিক শক্তির সঞ্চিত ভাণ্ডার কমে যায়।
আবার অনেক সাধক সাধনার গভীরে ডুব দিয়ে আধ্যাত্মিক ভাণ্ডারকে বাড়িয়ে তোলেন—পরবর্তী যোগ্য উত্তরসূরিদের জন্য, যারা সঠিকভাবে সেটাকে কাজে লাগাবে। এই কারণে যে সমস্ত সাধক নিভৃতে সাধনা করে চলেছেন—তাঁরা কেউ কম নন। এঁরা সবাই এক- একজন দধীচি। মানুষ জানতেও পারে না এঁরা সমাজের জন্য— মানুষের জন্য—নিজেদের জীবনকে কিভাবে উৎসর্গ করে চলেছেন।
যাইহোক, যা বলছিলাম, আমার শরীর গ্রহণের সময় পৃথিবীগ্রহে সঞ্চিত যে আধ্যাত্মিক ভাবরাশি ছিল তাতে (আমার) যা Project তা সিদ্ধ হত না। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শরীরধারণের পর পৃথিবীগ্রহের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ হয়েছে, স্বামী বিবেকানন্দের প্রচেষ্টা ও প্রার্থনায় মানবের ত্রিবিধ মঙ্গল সাধিত হয়েছে। সুতরাং এ অবস্থায় মনুষ্যসমাজে কাজ করার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, তাই মা আমাকে ‘শতভিষা’ নক্ষত্রের আধ্যাত্মিক ভাবরাশি গ্রহণ করতে বললেন। শতভিষা নক্ষত্র এই সৌরমণ্ডলেরই মতো। পৃথিবী থেকে দেখা যায়। জ্যোতিষশাস্ত্র একে পঁচিশতম নক্ষত্র হিসাবে চিহ্নিত করেছে। ওখানকার চেতনা, চিন্তা, জীবন এবং কাল অত্যন্ত দ্রুত। এখানে যেমন যে কোন একটা ব্যাপার বোঝাতে আমার তিন ঘণ্টা সময় লাগছে—বিভিন্ন উদাহরণ টানতে হচ্ছে, ওখানে গুরুরা শুধু চোখের ঈঙ্গিতে বুঝিয়ে দেবে, শিষ্যরাও তা বুঝে যাবে। এখানে হয়তো ডাক্তারী পড়তে একটা ছাত্রের ৫/৭ বছর লেগে যাচ্ছে,ওখানে অতি অল্প সময়ে শিখে যাবে। ফলে ওখানকার অধিবাসীদের ১০০ ভাগেরই প্রাথমিক ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি যে কোন বিষয়ের জ্ঞান রয়েছে। আর মোটামুটি মেধাবী যারা, তারা সবাই এখানকার আইনষ্টাইনের মতো উর্বর মস্তিষ্কসম্পন্ন। লিপিকাক এইভাবে ওখানকার আধ্যাত্মিক ভাবরাশি গ্রহণ করে যখন আমি পৃথিবীগ্রহের দিকে যাত্রা শুরু করলাম তখন সূর্যকে একটা উজ্জ্বল বিন্দু বলে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীগ্রহ নজরেই আসছিল না। এরপর ধীরে ধীরে পৃথিবীগ্রহ পরিদৃশ্যমান হল। কিন্তু নামব কোথায় ? তখন হিমালয় দৃষ্টিগোচর হল। দেখি গঙ্গার উৎসমুখে ৭ জন ঋষি ঊর্ধ্ববাহু হয়ে আবাহন করছেন আমাকে। এঁরাই পৃথিবীগ্রহের ভালো-মন্দের ভারপ্রাপ্ত নিয়ন্তা। মহাপুরুষের আগমন যেমন মহাপ্রকৃতির ইচ্ছায় হয়, ঠিক তেমনি এঁদের আহ্বানে ও হয়। আমার যে স্থূল শরীরটা তোমরা দেখছ পৃথিবীগ্রহে, এটা প্রথম প্রকট হয়েছিল ওখানে, কারণ তাঁদের চিন্তায় এরকমই শরীরের প্রার্থনা ছিল। আমিও এই শরীরটাকে ওখানেই প্রথম দেখলাম। এরপর তাঁদের সাথে কিছু কথাবার্তা হল। তাঁরা চলে গেলেন। আমিও গঙ্গার ধারা বেয়ে চলতে লাগলাম। উপযুক্ত আধার ছাড়া তো শরীর নেওয়া যাবে না । খুঁজতে খুঁজতে বর্ধমান জেলার অম্বিকা কালনার সন্নিকটস্থ কৃষ্ণদেবপুরে দেখি একটা জ্যোতির ধারা মাটি থেকে যেন আকাশ স্পর্শ করছে। বুঝলাম ওখানেই আমার গর্ভধারিণী জননী রয়েছেন। সেই জ্যোতির ধারাকে অবলম্বন করে মাকে দেখলাম। আর তাঁকে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে নাসিকা দিয়ে ক্রমে মাতৃগর্ভে প্রবেশ করলাম।
