জিজ্ঞাসু : স্বপ্নগুলো হয়তো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, এগুলোর সঠিক বিচার কি হবে ?

গুরুমহারাজ : দ্যাখো তোমরা যারা পণ্ডিত তারা এগুলো নিয়ে বিচার করো, তবে আমার জীবনে যা ঘটেছে তা তোমাদের বললাম—বিচার-বিশ্লেষণ করার ভার তোমাদের।

জিজ্ঞাসু : এই যে আশ্রম হবে, এগুলো কি ছোটবেলাতেই আপনি জানতেন বা এই লক্ষ্য নিয়েই চলতেন ?

গুরুমহারাজ : আমি তো তোমাদের আগেই বলেছি যে, আমি সদা জাগ্ৰত । আমাকে কি করতে হবে, কেন আমার আসা, সে সম্বন্ধে সব সময়ই আমি সজাগ। কিন্তু কাল বহুৎ বলবান। কালের অধীনে সবকিছুই। ফলে কাল পূর্ণ না হলে কোন কিছুরই প্রকাশ হয় না। যে ব্যক্তি ভাবে, ‘আমি এখনই এটা করবো’, বা ‘ওটা করবো’ —সে মূর্খ। জ্ঞানীরা ঐজন্য প্রথমেই কালের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীকে প্রসন্ন করে জেনে নেন কালের গহ্বরে কি সত্য নিহিত আছে। কাল প্রসব করেন কালী, তাই কালীকে ‘মা’ বলা হয়। কালী সবার মা, মাকে প্রসন্ন করলে মা জানিয়ে দেন কালের গর্ভে কি কি ঘটনা ঘটতে চলেছে আর সেখানে তোমার ভূমিকাটা কি।

সেই কারণে কোন লক্ষ্য নিয়ে চলা বা কোন plan করে চলার সুযোগই ঘটেনি জীবনে—হ্যাঁ লক্ষ্য একটাই ছিল সেটা হচ্ছে সত্যলাভ। মায়ের এই জগতের অন্তর্নিহিত সত্যটি কি তা জানার জন্যই আমি ছোটবেলা থেকে ছুটে বেড়িয়েছি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। পরিভ্রমণ করেছি মাঠ, ঘাট, পাহাড়-পর্বত, জঙ্গল, পার হয়েছি মরুভূমি।

এই জগৎ-সংসার থেকে কি গ্রহণ করতে হবে আর কি ত্যাগ করতে হবে তা আমি জেনেছি। জেনেছি যা মানবতাবিরোধী তা পরিত্যজ্য আর যা জীবনমুখী তাই গ্রহণীয়। ঐ জন্যই আমি বলি আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে Art of Life এবং Art of Living। আমি তোমাদের এমন কথাও বলছি—যদি বেদ-বেদান্ত বা কোন মহাপুরুষের বাণী বা শিক্ষায় জীবনবিরোধী কিছু থাকে তা পরিত্যজ্য। যদিও সেগুলিতে জীবনবিরোধী শিক্ষা থাকতে পারে না কারণ জ্ঞানের ও প্রেমের চরমভূমি থেকে ঐগুলি উদ্‌গীত হয়। তবু প্ৰক্ষিপ্ত অনেক শিক্ষা পরবর্তীকালে ঢুকে পড়ে ওর সাথে জায়গা করে নেয় আর সেগুলি এইভাবেই ধরা পড়ে। কারণ জীবনমুখী ব্যক্তির জীবনধারা বা জীবনবোধের সঙ্গে ওগুলি মেলেনা। কিন্তু মানুষ এমনই, বর্তমান মহাপুরুষদের এই সংশোধন তারা মানতে চায় না, বলে, ‘ভুল থাকলেও আগেরটাই ঠিক, কারণ ওটা আমাদের মহান Heritage।’ আর এই নিয়েই বিবাদ হয়, হয়তো বর্তমানের মহাপুরুষরা গোঁড়াদের হাতে নিগৃহীত হন অথবা মারা পড়েন। এটাই ইতিহাস, যার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে আর চলবেও কতকাল কে জানে!

কৈলাস আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী বিদ্যানন্দ গিরি আমার সন্ন্যাস সংস্কার করেছিলেন। উনি আমাকে সংস্কার করার পর বিভিন্ন বিধি- নিষেধের কথা এবং ‘পরম্পরা রক্ষার জন্য এসব মানারও প্রয়োজন আছে ‘—এসব কথা বলেছিলেন। আমি ওনাকে বলেছিলাম, ‘ম্যায় পরম্পরাকা গুলাম নেহী হুঁ’, এই বলে চলে এসেছিলাম। এটা একটা সাংঘাতিক কথা। কিন্তু আমার একথা বলতে অসুবিধা হয়নি। কারণ আমি কোন লৌকিক পরম্পরার গুরু নই, আমি লোকোত্তর পরম্পরার।
স্বামী বিবেকানন্দও দক্ষিণ-ভারত ঘোরার সময় আচার্য শংকরের নানান বিধি-নিষেধ, নানান মতবিরোধ এসব শুনে বলেছিলেন –সত্যিই যদি আচার্য শংকর এসব বলে থাকেন তাহলে তিনি একটা দক্ষিণী ভট্টচার্য ছাড়া আর কিছু নন। দ্যাখো কেমন বীর বাণী ! শংকরাচার্যেরই প্রতিষ্ঠিত দশনামী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেও প্রতিষ্ঠাতার কোন জীবনবিরোধী মতকে কিভাবে আঘাত করেছেন স্বামীজী !

ভ্রমণকালে আমি দেখেছি – বিভিন্ন মঠ-মিশনে শুধু বিধিনিষেধ, আর নিয়মের নিগড়। মূল লক্ষ্য ছিল ঈশ্বরলাভ বা আত্মসাক্ষাৎকার, সেসব ধুয়ে-মুছে গিয়ে শুধুই নিয়ম-পালন ঠিকমতো হচ্ছে কিনা —এটার উপরেই সব জোরটা দেওয়া হয়। হরিদ্বারের এক আশ্রমের মহারাজ আমাকে বলেছিলেন যদি এখানে থাকতে চাও, তাহলে ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠতে হবে, চারটেয় স্নান করতে হবে, ছটা পর্যন্ত ধ্যান করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বললাম, “আপনার অতসব নিয়ম আমি মানতে পারবো না। আমার ক্লান্তি এলে আমি বিশ্রাম করি, ক্লান্তি কেটে গেলে উঠে পড়ি, তারপর স্নানাদি সারি। অকারণ বিশ্রাম বা আলস্যে শুয়ে থাকা—এগুলো আমার অভ্যাস নেই।’ তিনি আমার কথা বুঝতেই পারলেন না। তখন আমি তাঁকে আমার বাউণ্ডুলে জীবনের কথা বলতে লাগলাম –কোথায় কখন রাত্রি কাটে তার ঠিক নেই, সারারাত বর্ষণ হচ্ছে—গাছতলায় দাঁড়িয়ে কেটে যাচ্ছে রাত্রি, বর্ষণশেষে ঐ গাছতলাতেই একটু বিশ্রাম। কয়েকদিন ক্রমাগত অনাহার তারপর হয়তো কোনদিন একটু আহার জুটল। চরম ক্ষুধায় অনেক সময় ফেলে দেওয়া কলার খোসা, শসার খোসা খেয়েও কাটাতে হয়েছে। তাহলে এই যার জীবন, সে জীবনে নিয়ম বা শৃঙ্খলা কি করে আসবে ? শুনে সাধুটি চুপ করে গেলেন। এবার আমিই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা নিয়মে কি হয় ?’ উনি বললেন, ‘নিয়ম- পালন মানে অভ্যাসযোগ, এতে ইন্দ্রিয় সংযম হয়’ আমি বললাম, ‘আমি অসংযমী নই, এসব না মেনেও তো আমার কোন অসুবিধা কখনও হয়নি, তাহলে আমি এসব মানতে যাব কেন ? অভ্যাসযোগ বা যোগাভ্যাস সবই ভাল, এগুলো অনেক বন্ধন কাটাতে সাহায্য করে কিন্তু পরে অভ্যাসটাই একটা নতুন বন্ধন সৃষ্টি করে তাহলে আমি আবার আট্‌কাতে যাবো কেন ? এমনিতেই আমি মুক্ত আছি—সেটাই ভাল নয়কি ?’ সাধুজী আর কিছু না বলে চুপচাপ উঠে গেলেন।

এখানে এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, সাধারণত মানুষ যেভাবে ভবিষ্যৎ ভাবনা করে – আমি সে ভাবে কখনও ভাবি নি। আমার কাজ করাকালীন কিছু সহকর্মী বন্ধু ছিল, যারা আমাকে প্রায় বলতো ‘রবীনদা কিছু টাকা সঞ্চয় করো—ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। Fixed Deposit Scheme-এ টাকা রাখো, তাহলে পাঁচ বছরে Double, দশ বছরে চারগুণ হবে’ ইত্যাদি। আমি ওদের একজনকে বললাম, ‘তুমি রাখো আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। পরবর্তীকালে ছেলেটি ধান-চালের ব্যবসা করতে লাগলো। একদিন দেখা হতেই একথা-ওকথায় জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার ব্যবসা করতে কত টাকা খরচা হলো ?’ ও কয়েক লক্ষ টাকার হিসাব দিল। আমি বললাম, ‘তোমার তো সঞ্চয় ছিল কয়েক হাজার টাকা Fixed Deposit- এ, ওটা তো কাজে লাগলো।’ ও বললো ‘ঐ টাকাতে আর কি হবে, কয়েক কাটা জায়গার দামও হবে না, এখন জান তো জায়গার যা দাম !’ আমি ওকে বললাম, ‘তাহলে দ্যাখো, তুমি একসময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছিলে এবং কিছু সঞ্চয়ও করেছিলে কিন্তু আজ যখন সেই ভবিষ্যৎ বর্তমান হয়েছে তখন আর তোমার কোন হিসেব সেখানে কার্যকর হচ্ছে না’ ।
এমনই হয় জান তো, তবু মানুষ বর্তমান থেকে আবার ভবিষ্যতের ভাবনা ভাববে – সঞ্চয়ও করবে, কিছু কাজ করে যাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু আর হয়ে ওঠে না। ফলে মানুষকে বারবার কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে ফিরে আসতে হচ্ছে।

আমি এসব রহস্য ছোট থেকেই জ্ঞাত ছিলাম। আমার .ভবিষ্যতকে তাই সবসময়ই মায়ের হাতে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে সদা- সর্বদাই আমি নিত্য বর্তমানে থাকি। যেখানে অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই—শুধুই বর্তমান আর বর্তমান। তবে ছোটবেলায় আমার নানারকম ভাব হত, সে সময় আমি ভাবের ঘোরে অনেক কথা বলতাম । এখানকার কথা, আশ্রম জীবনের কথা, তৃষাণ, সম্বিত, দেবেন্দ্রনাথ, বনগ্রাম—এসব নাম বেরোতো আমার মুখ দিয়ে। পরে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘হ্যাঁরে তুই যেসব নাম বলছিলি, তারা সব কারা ?’ আমি বলতাম—তোমার সাথে এদের সবার দেখা হবে— দেখা হয়েছিলোও।