জিজ্ঞাসু : এই যে বলা হয় ‘গুরুদেব’, এই ‘দেব’ কথাটা দেবতাদেরও বলা হয়—এটার তাৎপর্য কি ?
গুরুমহারাজ : যিনি দেন তাঁকেই দেবতা বলা হয়। হিন্দিতে বলে, ‘যো দেতা হ্যায়, ওহি দেবতা হ্যায়’। কে দেন ? – পিতা শরীর দেন, মাতা জন্ম দেন—পালন করেন, গুরু বা আচার্য শিক্ষা দেন, তাই না ! এইজন্য বলা হয়–1 আচার্যদেবো ভব। –পিতৃদেবো ভব, মাতৃদেবো ভব,
এছাড়া সূর্য, অগ্নি, বরুণ ইত্যাদিকে দেবতা বলা হয়েছে। কারণ, এঁরা দেন, তাই দেবতা। এইভাবে আমাদের দেহের দশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ ভূত, পঞ্চ দেবতা এবং মন, বুদ্ধি ও চিত্ত এই নিয়ে তেত্রিশ দেবতা। পরে এটাই তেত্রিশ কোটি হয়েছে। বুঝতে পারলে ব্যাপারটা ! এঁদের দেবতা বলে উপাসনা করে ভারতীয়রা—এটা আর্য পরম্পরা। কিন্তু এই নিয়ে বহু মনীষী ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে গেছেন। কেউ বেদকে বলেছেন, ‘চাষাদের গান’, কেউ বলেছেন, প্রকৃতির যে সমস্ত শক্তিকে মানুষ বুঝতে পারেনি তাদের ভয়ে পূজা করেছে—ইত্যাদি নানা মুনির নানা মত।
কিন্তু আমি তোমাদের প্রকৃত রহস্য বলছি–ঋষিরা, যাঁরা ঋকাদি বা বেদ মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন তাঁরা অশিক্ষিত বা চাষা ছিলেন না। তাঁরা প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করে মূল সুরটি ধরতে পেরেছিলেন আর তারজন্যই সমাজে যাঁর কাছ থেকে কিছু পাওয়া যায় অর্থাৎ নিঃস্বার্থভাবে যদি কেউ কিছু দেন, তাঁকে ‘দেব’ বা ‘দেবতা’ বলা হয়।
মানুষের মধ্যেও দেখবে কোন মানুষ যদি শ্রদ্ধাপরায়ণ ও বিবেকবান হন, তাহলে তিনি মানুষের জন্য অনেককিছু করেন, ফলে বহু মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হন। এইভাবে কোন পুরুষ বা নারী যদি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ না ক’রে সম্পূর্ণরূপে অপরের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন অর্থাৎ নিঃস্বার্থ সেবা করতে পারেন, তাহলে আজও সবাই বলে, “উনি মানুষ নন, দেবতা” কিংবা নারী হলে বলে “উনি সাক্ষাৎ দেবী” তাই নয় কি !
এবার মহাপুরুষরা যখন শরীর ধারণ করেন, তখন তাঁদের শরীরধারণটাই তো “বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় চ”। ফলে যতদিন শরীরে থাকেন তাঁরা, শুধুই দিয়ে যান, কারও কাছে কিছুই প্রত্যাশা করেন না। প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসা দিতে দিতে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দিয়ে চলে যান তাঁরা। তাই পরবর্তীকালের মানুষ তাঁদের নামের শেষে ‘দেব’ শব্দটা জুড়ে দেয়। যেমন বুদ্ধদেব, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব আবার স্ত্রী শরীর হলে বলে— সারদামাতা অথবা সারদাদেবী এরকম আর কি।
