জিজ্ঞাসু : যে কোন মানুষকেই কি সাধনা করতে হবে—অন্য কোন উপায় নেই ?

গুরুমহারাজ : দ্যাখো, ধর্মজগতের কোন Back-door নেই। এখানে যা কিছু করতে হয় সব সোজাসুজি। দু’ভাবে কার্যসিদ্ধি করতে হয়—একটা বীরভাব আর একটা ধীরভাব। একটা দৈবাশ্রিত হয়ে পুরুষকারের সহায়তায় অন্যটা শুধু শরণাগতি। তবে পুরুষকার মানে অহংকার ভেবো না। সাধারণত মানুষ যেটা পুরুষকার ভাবে ওটা কিন্তু অহংকার। পুরুষকার দিয়ে কৃতকার্য হবার উদাহরণ হচ্ছে অর্জুন। কাজ করছেন কিন্তু কৃষ্ণের নির্দেশে। অর্জুনের জীবনেই ঘটনা ঘটেছিল কৃষ্ণের অবর্তমানে, যখন আভীর দস্যুরা কৃষ্ণমহিষীদের হরণ করতে এল তখন অর্জুন গাণ্ডীব তুলতে পারেন নি। কারণ কৃষ্ণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অর্জুন এ কাজ করতে গিয়েছিলেন। এগুলি ঠিক ঠিক বুঝতে হয়।

আর শরীরধারণ করলেই তো অনেক ঋণ চেপে যায়। কথাটা বুঝতে পারলে না, বুঝিয়ে বলছি শোন। যে কোন মানুষ, নারী বা পুরুষ যখন শরীর নিচ্ছে তারজন্য যে Material লাগছে, সেগুলো যার যার কাছ থেকে আসছে তার হিসাবেই তো, শোধ দিতে হবে ! সেই শোধ হচ্ছে না বলেই তো বাসনা নিয়ে আবার ফিরে ফিরে আসা। যেমন ধরো পিতৃঋণ, মাতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ, মাতৃভূমির প্রতি ঋণ—এগুলো তো অস্বীকার করতে পারবে না তুমি। কিন্তু এসব ঋণ মেটানোর তাগিদ নেই জীবনে, ফলে ঋণের বোঝা জন্ম- জন্মান্তরে বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে। তারপর যখন—যে জীবনে ঋণ শোধ করার ভাবনা জাগ্রত হচ্ছে অর্থাৎ কোন জাগ্রত বিবেকের সংস্পর্শে জীবের বিবেক জাগছে, তখন জীবন লাভ করে কেন জীব এত ভোগান্তি ভোগ করছে, তার কারণ সে জানতে পারছে। আর যত এসব জানতে পারছে, জীবনের রহস্য তত ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে —সাধনার বেগ ততই বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ভাবে একদিন সমস্ত ঋণ শোধ করে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো বাঁধা-বাঁধনহীন নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ভোগ করছে। জানো তো— ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা ঐ অবস্থাতেই ঠিক ঠিক প্রযোজ্য। দেশ স্বাধীন, জাতি স্বাধীন—এ সব অর্থ গৌণ, কারণ তোমরা স্বাধীনদেশে বাস করেও কতটা স্বাধীন, সে তো দেখছো— কাজেই প্রকৃত স্বাধীন হয় মানুষ নির্বিকল্প সমাধির পর।

সে যাইহোক্‌, আমি দেখেছি শরীরধারণে যতগুলি ঋণ রয়েছে, মানুষ পারে সেগুলি একে একে শোধ করে দিতে, কেবল একটা ঋণ শোধ করা যায় না—সেটা হচ্ছে মাতৃঋণ। আমি ছোটবেলায় ১০ মাস একটা আড়াই কেজি ওজনের ইঁট পেটে বেঁধে ঘুরেছি মায়ের গর্ভকালীন শিশুকে বয়ে বেড়ানোর কষ্ট কতটা তা অনুভব করার জন্য। মায়ের মমতা নিয়ে কোন মুমূর্ষুকে সেবা করেছি—মমতা —কিন্তু দেখেছি মায়ের মহিমা আরও ঊর্ধ্বে । শাস্ত্র তাই বোঝার জন্য— ঐ সব বিচারে না গিয়ে বলেছে যদি কোন পুত্র নির্বিকল্প সমাধি-লাভ করে অর্থাৎ পূর্ণত্বলাভ করে তবেই মাতৃঋণ শোধ হয় কারণ তখন ঐ পুত্র ও কন্যার দ্বারা মাতা উদ্ধার হন। আর শুধু মাতা কেন মাতৃকুল এবং পিতৃকুলের ৭ পুরুষ করে মোট ১৪ পুরুষ উদ্ধার হন। বাংলায় দেখবে প্রবাদ আছে ‘চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে দেবো’–এই কথার তাৎপর্য এটাই। তাই কোন কুলে যদি এইরূপ মহাপুরুষ বা মহামানব জন্মগ্রহণ করেন, তাহলেই মাতার মাতৃজীবনের সার্থকতা—“কুলং পবিত্রং জননী কৃতার্থা।”