জিজ্ঞাসু : ৬৪ কলা সিদ্ধি বলতে ঠিক ব্যাপারটি কি বোঝায় মহারাজ ?

গুরুমহারাজ : কলা জানোনা – Art। যেমন গীত, বাদ্য, নৃত্য, চিত্র ইত্যাদি এক-একটি Art বা কলা। বহু সাধক আছেন এইরূপ এক-একটি কলাসিদ্ধ, কেউ কেউ আবার একাধিক কলায় সিদ্ধ, ওঁকারনাথ ছিলেন সঙ্গীত সিদ্ধ, তোমাদের রবিশঙ্কর সেতারবাদনে সিদ্ধ। এইরকম এক-একটা কলায় বা এক-একটা ক্ষেত্রে কারও Perfection এসে গেলেই সেই ব্যক্তি সেই ক্ষেত্রে সিদ্ধ হন। কিন্তু শিব এবং বিষ্ণু অর্থাৎ নটরাজ এবং নটবর একসাথে ৬৪ কলাতেই সিদ্ধ ছিলেন।

নৃত্যকলায় সিদ্ধ তোমরা হয়তো দেখনি কিন্তু হিমালয়ে একটা পরম্পরা রয়েছেন, যাঁরা নৃত্যে সিদ্ধ এবং তাঁদের সাধনা, আরাধনা, নিবেদন, বক্তব্য—সবই চলে নৃত্যের ভঙ্গিমায় এবং মুদ্রার মাধ্যমে। বৈখরীতে কোন কথা তাঁরা বলেন না। আমি সন্ন্যাস নেবার পর কিছুদিন হৃষীকেশে কৈলাস আশ্রমে ছিলাম। ওখানে প্রচুর সন্ন্যাসী- ব্রহ্মচারী, তার মধ্যে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মচারী নামে একজনের সাথে আমার খুবই বন্ধুত্ব ছিল। কোন একদিন নেপালের মহারাণীর দেওয়া ভাণ্ডারায় সমস্ত আশ্ৰম নিমন্ত্রিত হয়েছে, আর কৈলাস আশ্রমের তো কথায় নেই—যেন তার উপরই সমস্ত ভার ! যাইহোক আমরা সকল নবীন সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীরা গেছি ভাণ্ডারায় যোগ দিতে। Senior সন্ন্যাসীরা আমাদের গাইড করে নিয়ে গেছেন।

ওখানে শুধু খাওয়া-দাওয়া নয়—ধর্ম আলোচনার জন্য Stage হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন আশ্রমের মণ্ডলেশ্বররা আধ্যাত্মিক তত্ত্বের উপর নানা বক্তব্য রাখছিলেন। আমরা নীচে বসে বসে শুনছিলাম। হাজার হাজার শ্রোতা আর বড় স্টেজে মণ্ডলেশ্বরেরা বা Senior সন্ন্যাসীরা বসে রয়েছেন। কৈলাস আশ্রমের মহারাজরাও স্টেজে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ বক্তব্য রাখছিলেন। হঠাৎ একজন উলঙ্গ সন্ন্যাসী ডমরু বাজাতে বাজাতে সেখানে হাজির হলেন। দীর্ঘদেহ, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া জটা আর হাতে ডমরু, যেন মনে হচ্ছে স্বয়ং শিব । তিনি কি করলেন জানো—একলাফে Stage-এ উঠেই ডমরুর তালে তালে নৃত্য শুরু করে দিলেন। কি অপূর্ব নৃত্য-যেমন ছন্দ, তেমনি তাল, তেমনি মুদ্রা এবং ভঙ্গিমা। তাঁর সমস্ত অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের অভিব্যক্তি যেন স্পষ্ট কথা বলে দিচ্ছে। বক্তাগণ যাঁরা স্টেজে ছিলেন, তাঁরাও বিহ্বল হয়ে সেই অদ্ভুত নাচ দেখছেন। যে ব্যক্তি মাইকে কিছু বলছিলেন, তিনি তো মাইক ছেড়ে দূরে দাঁড়িয়ে এই অপূর্ব দৃশ্য দেখছিলেন। নেপালের মহারাণীর ব্যাপার, বিরাট স্টেজ কিন্তু সেই শিবকল্প সন্ন্যাসীর পা নৃত্যের ছন্দে ছন্দে এত দ্রুত- লয়ে সমস্ত স্টেজ-ব্যেপে বিচরণ করছিল যেন মনে হচ্ছিল মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের চমক।

আমি তাঁর নৃত্যের ভঙ্গিমায় বলে দেওয়া সমস্ত কথা বুঝতে পারছিলাম, আরও অনেকেই হয়তো বুঝেছিলেন তবে সকলের পক্ষে বোঝা সম্ভব হচ্ছিল না। আমি সচ্চিদানন্দ মহারাজকে আস্তে আস্তে উনি কি বলতে চাইছেন তা বলছিলাম। সচ্চিদানন্দও মাঝে মাঝে বিভিন্ন জিজ্ঞাসা করে আমার কাছে জেনে নিচ্ছিলেন, এতে পাশের সাধুরা বিরক্ত হচ্ছিলেন। একজন তো বলেই বসলেন, ‘এই বাচ্ছা চুপ করো, তুমি খুব বোঝ, আজেবাজে যা তা বলে চালিয়ে দিচ্ছ।’ একথা শুনে একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী তাঁদেরকে ধমকে দিয়ে বললেন —বাচ্ছা ঠিকই বলছে—নৃত্যের মাধ্যমে ঐ সন্ন্যাসী ঐ কথাগুলিই বলছেন। ঐ যে একটু আগে বলছিলাম আড়াই হাজার বছর বয়সী সাধুবাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত বিদ্যার কথা, ঐটি থাকায় আমার তো বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না। কিন্তু যাঁরা জানেন না তাঁদের বোঝাই কি করে !