জিজ্ঞাসু—আপনি বলেন ভালো-মন্দ নিয়ে মায়ের জগৎ, এখানে তো “শুধু ভালোও” হতে পারতো ?

গুরুমহারাজ—না তা হবে কেন ? শাস্ত্রে একে “বৈষ্ণবী মায়া” বলা হয়েছে। মা-ই সব হয়েছেন, তবু মা এই বিশেষ শক্তির সাহায্যে জগতের বা জগৎ-সংসারের পরিপূরণ, পরিপোষণ ও প্রতিপালন করে চলেছেন। যেখানে ভালো বা মন্দের কোন বাছ- বিচার নেই। নিজের সৃষ্টিতেই যেন তিনি বিভোর হয়ে রয়েছেন। এই ব্যাপারটা individual জীবের ক্ষেত্রেও হয়—নিজের সৃষ্টিতেই মানুষ সবচেয়ে বেশী আনন্দ পেতে বা মশগুল হয়ে থাকতে চায়। কবি তার সৃষ্ট কবিতায়, শিল্পী তার অঙ্কনে বা মূর্তি তৈরিতে, সঙ্গীতজ্ঞ তার সঙ্গীতে আপনাকে উজাড় করে দিতে চায়, বিভোর হয়ে থাকতে চায়। এমনকি সাধারণ কৃষক তার লাগানো ফসলের ক্ষেতকে ঘিরেই নিত্যনতুন সৃষ্টির ও বিকাশের আনন্দে জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়ে দেয়। এই যে individual-এর সৃষ্টিতে আনন্দ পাওয়া বা বিভোর থাকা, এইটা হয় বলেই কিন্তু সে অপরকে আনন্দ দিতে চায় বা বুঝতে পারে যে, তার সৃষ্টিকে অন্যের সামনে exibit করলে সেও আনন্দ পাবে। পুরাণে রয়েছে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার কন্যা সন্ধ্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার প্রেমে পড়ে গেল। এখানে সন্ধ্যাকে নারী কল্পনা না করে ঘটনার সত্যতা বিচার করো—বুঝতে পারবে ব্যাপারটা। গ্রীক সাহিত্যে রয়েছে পিগম্যালিয়ন নামক একজন শিল্পীর গল্প, যে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী এক নারীমূর্তির ভাস্কর্য তৈরি করতে চেয়েছিল। সে তার গবেষণাগারে একটা করে মূর্তি পাথর কেটে কেটে একটু একটু করে রূপ দিতো। দীর্ঘদিন ধরে এটি করার পর মূর্তি যখন সম্পূর্ণ হত তখন তাকে সে তার মনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা মূর্তির সাথে মিলিয়ে দেখতো সেই প্রকৃত সুন্দরীটি কিনা, না হলে সেটি ভেঙে ফেলে আবার একটা নতুন মূর্তি বানাত। অবশেষে প্রায় বৃদ্ধ বয়সে সে নিখুঁত এক সুন্দরী মূর্তি বানিয়ে ফেলল। সে মূর্তি এতই অপূর্ব ছিল যে, পিগম্যালিয়ন তাকে ভালোবেসে ফেলল। এবার সে চাইল ঐ পাথরের মূর্তিতে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়।

যাইহোক গ্রীক পুরাণের এই গল্প আর ভারতীয় পুরাণের ব্রহ্মার গল্পের মধ্যে একটা মিল রয়েছে। এছাড়া গ্রীক মিথোলজির অনেক কিছুই ভারতীয় মিথের সঙ্গে মেলে। এ থেকে ধরা যায় যে, ভারতীয় প্রাচীন সভ্যতার প্রভাব প্রাচীন গ্রীস দেশে পড়েছিল। পিগম্যালিয়নের গল্প বা ব্রহ্মার গল্প থেকে এটা বোঝা যায় যে, নিজের সৃষ্টির সৌন্দর্যে সৃষ্টিকারী নিজেই নিমগ্ন, মুগ্ধ ও বিভোর হয়ে থাকতে চায়। এটা কোন স্থূল নর-নারীর জৈবিক চাহিদা নয়, সে যেন নিজেই নিজের মধ্যে বা নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে উপভোগ করতে চাইছে। প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার কর্মরহস্য individual দিয়ে—গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পুরাণগুলিতে।

দেখবে, যৌবনকালে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীরে যখন লাবণ্য ঢলঢল করে, তখন ছেলেটি বা মেয়েটি দীর্ঘক্ষণ আয়নার সামনে কাটায়। সে নিজেই নিজেকে দেখে, অনেকক্ষণ ধরে দেখে, এতে সে একপ্রকার সুখ পায়। ভালো পোশাক পরতে চায়, ভালো প্রসাধনী মাখতে চায়, ভালো করে গাজতে চায়। নিজেকে নিজের কাছেই আরও সুন্দর করে উপস্থাপিত করতে চায়। এটাই বলতে চাইছিলাম যে, বিশ্ব- বিরাটের রহস্য ছোট আকারে, ক্ষুদ্র আকারেও সূত্রাকারে রয়েছে যা উদাহরণ হিসাবে পেশ করা যায়। Individual-কে বাদ দিয়ে তো Universal নয়। বিন্দু বিন্দু করতে করতেই সিন্ধু হয়। এককণা জলকে বিশ্লেষণ করেই জলতত্ত্বের জ্ঞান হয়। তেমনি ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিজেকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না, নিজের মধ্যেই জগৎ দেখা যায়। নিজে পূর্ণ হলেই পূর্ণজ্ঞান, আর না হলে সবকিছুই অপূর্ণ, ভাসা- ভাসা। ঋগ্বেদের দশমমণ্ডলে পুরুষক্তে রয়েছে যে, রূপ স্বরূপে মিশে আত্মহারা হয়ে গেছে। একটা গ্রীক myth আছে যেখানে নার্শিসাস নামে একজন গ্রীক দেবতা একদিন একটি স্বচ্ছ সরোবরে জলপান করতে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব জলে দেখে ভাবতে থাকল যে, সে নিজে এত সুন্দর ! সে নিজেতেই নিজে মুগ্ধ হয়ে এমন বিভোর হয়ে গেল যে, তার অঞ্জলিভরা জল অঞ্জলি খুলে আপনা আপনিই পড়ে গেল—জলপান আর হল না। শুধু নিজের প্রতিবিম্বের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েই রইল। নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হ’ল, এখনও নিজের ego নিয়ে যারা চলে তাদের এরূপ মানসিকতাকে নার্শিসাস কমপ্লেক্স বলে। নার্সিসিজম কথাটিও চালু রয়েছে সমাজে। এই যে কথাগুলো বললাম বা বিভিন্ন ঘটনার উপস্থাপনা করলাম এটা থেকে কি বোঝা গেল, সৃষ্টির আনন্দে, সৃষ্টিকে দেখে বা তাকে বিকশিত হতে দেখে সৃষ্টিকর্তার আনন্দ হয় আর এতটাই আনন্দ হয় যে, সে নিজেও বিভোর হয়ে যায়। তখন আর কোনটা সুন্দর কোনটা অসুন্দর, কে ভালো –কে মন্দ এই বাছবিচার থাকে না।

মা তার ভালো বা ফর্সা ছেলেটিকেও যেভাবে যত্ন করেন, খেতে দেন অপেক্ষাকৃত দুরন্ত বা বদটিকেও তেমন যত্ন করেন ও খেতে দেন, এখানে কোন বাছবিচার চলে না। এটাকেই শাস্ত্রে ‘বৈষ্ণবী মায়া’ বলেছে। হাসি-কান্না, শোক-আনন্দ, ভালো-মন্দ এসবকিছু নিয়েই মায়ের ‘বৈষ্ণবী মায়া’ শক্তির খেলা। মানুষ তো জানে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, কি করা উচিত আর কি করা উচিত নয়— তাহলে সে অন্যায় করে কেন ? জগতে সবাই সৎ হয়ে উঠছে না কেন ? এটাই ‘বৈষ্ণবী মায়া’। এই জন্যই বলা হয় তব মায়া দুরত্যয়া। একমাত্র মা যদি কৃপা করে পথ ছেড়ে দেন, তবেই জীব মায়ামুক্ত হতে পারে। তাই তোমরা মা-কে আশ্রয় করো, মায়াকে পরিত্যাগ করো। শরণাগত হয়ে নিরন্তর পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনা করলে মা প্রসন্ন হন, আর মা প্রসন্ন হলে তবেই জীবের মুক্তি ঘটে। এই মুক্তি বলতে আবার মনে করো না এই জগৎ থেকে অন্য কোন জগতে যাওয়া, মুক্তি বলতে জীবত্ব অবস্থা থেকে মুক্তি। জীবত্বে থেকে শিবত্বে উত্তরণ। ‘মায়া’-কে অবলম্বন করে শিব জীব হয়েছিলেন, এখন ‘মা’-কে প্রসন্ন করে আবার ‘জীবে’-র ‘শিব’ হয়ে ওঠা। এটাই মায়ের লীলা—আর এই জগৎ যেন তাঁর লীলাক্ষেত্র।

জিজ্ঞাসু—আপনি ইউরোপের বিভিন্ন শহর ঘুরলেন তার তুলনায় আমাদের কোলকাতা শহর কোন দিক থেকে পিছিয়ে ?

গুরুমহারাজ—দ্যাখো, যদি বাইরের উন্নয়ন বা বাইরের get দিয়ে বিচার করো তাহলে প্রথম বিশ্বের যে কোন শহরের সঙ্গেই up কোলকাতার কোন তুলনা হবে না। ওদের শহরগুলো তো বেশীরভাগ planned city আর কোলকাতা unplanned city । জনসংখ্যা, বাড়িঘর বাড়তে বাড়তে এইরকম হয়ে গেছে। আর ওদের দেশগুলোতে লোকসংখ্যা এত কম যে, সবকিছুই ফাঁকা ফাঁকা, বাড়িঘর, অফিস- কাছারি সবকিছুই যেন একটু দূরে দূরে অবস্থিত। আর রাস্তাঘাট, বাড়ি এত পরিষ্কার ঝকঝকে, যে মনে হবে সবকিছুই বোধহয় নতুন অথবা সবে রঙ করেছে। ওদের প্রতিটি ব্যবস্থা এত উন্নত যে, বলার নয়। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং নাগরিকদের discipline এ ব্যাপারে আরও সাহায্য করেছে। তবে অন্য দিকে বহির্বিশ্বে কোলকাতার কিন্তু একটা ইজ্জত রয়েছে। বিশ্বের তাবড় তাবড় গুণীজনরা কোলকাতাকে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখে দেখবে বিশ্ববিখ্যাত মনীষীরা বিশেষত artist, সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ এরা আন্তর্জাতিকভাবে বা নিজের দেশে যে কোন সম্মানই পাক না কেন —এরা পৃথিবীর দুটি শহরে নিজেদের কলা প্রদর্শন না করলে বা কোন programme না করলে যেন ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারে না। সেই শহরদুটির একটি লণ্ডন ও অপরটি কোলকাতা। ব্যাপারটা হচ্ছে এই দুটি শহরে এক বিশেষ শ্রেণীর রসজ্ঞ মানুষ আছে, যারা যথার্থ গুণের কদর করতে পারে। আর যথার্থ গুণীজনেরা এটাই চায় যে, বেনাবনে মুক্তো না ছড়িয়ে যথার্থ সমঝদারের সামনে তার Perfor- mance পেশ করতে বা তাদের কাছ থেকে বাহবা পেতে।

তবে দুটো শহরের শ্রোতাদের quality ভিন্ন। কোলকাতায় যদি কোন আন্তর্জাতিক মানের গুণীজনের Programme হয় তাহলে কিন্তু বিশেষ ধরণের রসজ্ঞ শ্রোতা বা দার্শনিকরা সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়, আপামর জনগণ যাবে না। রসজ্ঞদের কাছে রস পরিবেশনের মজাই আলাদা, ফলে অনুষ্ঠান খুবই জমে ওঠে। বহু বিদেশী গুণীজনের ভারতবর্ষ সম্বন্ধে ধারণা বদলে গেছে কোলকাতায় Programme করার পর। যাইহোক লণ্ডনে কিন্তু এই ধরণের কোন programme হলে গুণীদের সাথে সাথে সব ধরণের Public-ই অনুষ্ঠানে যোগ দেবে। অনুষ্ঠান চলাকালীন কেউ কিন্তু কোন অভব্যতাও প্রকাশ করবে না। এমনকি অনুষ্ঠান ভালো না লাগলেও কেউ উঠে যাবে না, চুপ করে বসে বসে শুনবে। ভদ্রতা, ধৈর্য এগুলো ব্রিটিশদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু পরদিন শুরু হবে সমালোচনা। যদি ভালো হয় তো ভালো আর যদি খারাপ হয় তাহলে সমালোচনায় সমালোচনায় তোমার বারোটা বাজিয়ে দেবে। প্যাপারাৎসি-দের অত্যাচারে বেচারা যুবরাণী ডায়ানা মরেই গেল— দেখলে তো কদিন আগের ঘটনা ! Londan- এর critic (সমালোচক) গোটা বিশ্বের নাম করা ! তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব এদের সম্মুখীন হতে ভয় পায়। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখবে criticism (সমালোচনা) ব্যাপারটা কিন্তু ভালো নয়। মনোবিজ্ঞানের বিচারে criticism আসে ঈর্ষা থেকে। ঈর্ষা আবার জন্ম নেয় inferior complex থেকে। আঙুর ফল টক্ বলে একটা কথা রয়েছে—critic-দের দশা এইরকমই। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীদের সমালোচক বিজ্ঞানী নয়, ধর্মের সমালোচক ধার্মিক নয়, ধনীর সমালোচক কোন ধনী ব্যক্তি নয়- এইরূপ সবক্ষেত্রেই হয়। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেছে, যে সমস্ত মানুষরা চেষ্টা করেও জীবনে যা হতে পারেনি অন্য কেউ হয়তো সেই ব্যাপারে কৃতকার্য হয়েছে, প্রথম ধরণের ব্যক্তিরা সমালোচনা করে দ্বিতীয় ধরণের ব্যক্তিদের। এটাই human psychology.

জিজ্ঞাসু—একটু আগে আপনার কথা থেকে জানলাম যে মারণ-উচাটন-সম্মোহন এসব শক্তিলাভও খুব একটা ভালো নয় ?

গুরুমহারাজ—ভালো-মন্দ কি বুঝলি পাগল ! যে কোন শক্তিলাভ করা বা সিদ্ধাই অর্জন করা—এটা ultireate নয়। কিছু শক্তিলাভ হলেই মানুষের বেশী অহংকার সৃষ্টি হবে—আর এতে তার ভোগান্তি বাড়বে, এছাড়া আর কি হবে ? মারণ-উচাটন তো নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, এগুলো খারাপই, কিন্তু সম্মোহন বা hypno- tism-ই বা এমন কি ভালো ? আর কাউকে সম্মোহিত করার জন্য তন্ত্র-মন্ত্র সাধন করার তো প্রয়োজন নেই কিছু common sense প্রয়োগ করলেই হয়। ধর, কোন মানুষ কারও বা কোন system – এর উপর প্রচণ্ড রেগে গেছে—এই সময় তার মন কিন্তু খুবই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অতি শোকগ্রস্ত অবস্থাতেও মন খুব দুর্বল থাকে। যাইহোক ঐ ব্যক্তিটির এইরূপ অবস্থায় তুই ওর প্রতি শুধু সহানুভূতি প্রদর্শন করে ওকে দিয়ে যা খুশি করাতে পারিস। ওর তখন একটা hypnosis অবস্থা—এই অবস্থায় যার প্রতি ওর ক্রোধ তুই যদি একটু একটু করে ওকে ওর ক্রোধের বিষয়গুলোকে support করিস অর্থাৎ ওকে উকে উস্কে দিস তাহলে তার ক্রোধ আরও ভয়ঙ্কর, আরও ভীষণ আকার ধারণ করবে এবং সে যে কোন reaction করতে পিছপা হবে না। ঐ অবস্থায় ব্যক্তিটিকে যদি কোন আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করা হয় তাহলে সে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুন পর্যন্ত করতে পারে। বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো ধর্মীয় centiment-এ সুড়সুড়ি দিয়ে এই কায়দাতেই suicide squad বা আত্মঘাতীবাহিনী তৈরি করে ফেলেছে। মিলিটারী officer-রা এই একই কায়দায় যুদ্ধের সময় সেনা জওয়ানদের মনে “জোশ্” এনে দেয় যাতে জোওয়ানেরা প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে “করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে” মনোভাব নিয়ে সামনে এগিয়ে চলে। শোকগ্রস্ত ব্যক্তিকে দিয়েও কোন কাজ করানো যাবে। তাকে অনুকম্পা দেখাতে হবে আর সেটাকে continue করতে করতে ব্যক্তিটি যখন শোকে অধীর হয়ে আত্মহারা হয়ে যাবে তখন তাকে দিয়ে যা খুশি করানো যাবে। তাকে আধ্যাত্মিক পথেও নিয়ে আসা যাবে আবার খারাপ দিকেও।

তাহলে দেখা যাচ্ছে সাধারণভাবেই শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে অথবা সুযোগের অপেক্ষায় থেকে অবস্থাকে কাজে লাগাতে পারলে যে কোন মানুষকে hypnotise করে তাকে দিয়ে যে কোন কাজ করানো যায়, এরজন্য সাধন-ভজন প্রয়োজন হয় না। কোথাও যদি গণবিক্ষোভ হয়—তাহলে mass-এর মধ্যেও এটা করা যায় এবং তা করতে পারলে ব্যাপক আকারে গণ্ডগোল, খুনোখুনি, রক্তপাত ঘটানো যেতে পারে। কোনব্যক্তি যদি এরূপ কিছুদিন করতে থাকে তাহলেই সে expert হয়ে পড়ে। তখন সে অল্প চেষ্টাতেই যে কোন মানুষকে তার বশংবদ বা অনুগত করতে পারবে।

এবার আসা যাক সম্মোহনকারীর প্রসঙ্গে। এইসব শক্তি অর্জন করে তার কি ফল হ’ল ? সে তো দিন-দিন আরও বেশি করে মহামায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়তে থাকল। সমাজে কেউ যদি একবার “শক্তিমান” হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে পারে তাহলে হাজার- হাজার, লক্ষ-লক্ষ মানুষ সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাকে গুরুদেব বানিয়ে—তার ফটো পুজো করে, তার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে তার বারোটা বাজিয়ে দেবে। অর্জিতশক্তি তো অর্জিত অর্থের মতো। অকাতরে বিলি করতে থাকলে ফুরোতে ক’দিন ? এইবার ঐ ব্যক্তির কি দুর্দশা ! বহু সাধককে তুমি দেখবে—কিছুটা শক্তিলাভ হয়েছিল পরে ফতুর হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুতরাং এসব পথ— পথ নয়। কি করলে মহামায়ার বাঁধন ছিন্ন হবে সেটা খোঁজাই পথ। আমাদেরকে সেই শিক্ষাই গ্রহণ করতে হবে যা আমাদের চেতনাকে চৈতন্যমুখী করে, যা জীবনকে মহাজীবনে পরিণত করতে সাহায্য করে। এইজন্যই আমি বলি Art of life এবং Art of living-ই হ’ল আধ্যাত্মিকতা। আর একমাত্র আধ্যাত্মিকতাই মানুষকে মুক্তির পথ দেখায় ! গণতন্ত্র যদি কোথাও থাকে, স্বাধীনতা বলে যদি কোথাও কিছু থাকে, তাহলে তা আধ্যাত্মিকতায়। সমস্ত সংস্কারকে উপেক্ষা করে বিভেদবুদ্ধিরহিত আধ্যাত্মিক মানুষই জগতে মুক্ত। এমন যদি কোন পরিবার পাও যেখানে ঠাকুরঘরে ভিন্ন ভিন্ন member-দের উপাস্য ভিন্ন ভিন্ন দেবতা কিন্তু একই ঠাকুরঘরে, একই আসনে সকলে স্থান পেয়েছে—জানবে পরিবারটি আধ্যাত্মিক। মত ভিন্ন, উপাস্য ভিন্ন কিন্তু পরস্পর পরস্পরের আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এটাই ঠিক ঠিক গণতন্ত্র। বর্তমানে ভারতবর্ষে জাতি, ধর্ম, প্রাদেশিকতা নিয়ে দাঙ্গা হচ্ছে—রক্তগঙ্গা বইছে—এইটা কি গণতন্ত্র ? আর এসব হচ্ছেই বা কেন আর করছে অথবা করাচ্ছেই বা কারা ? এরা কিন্তু কেউ গণতান্ত্রিক ব্যক্তি নয়। আধ্যাত্মিক ব্যক্তি তো নয়ই। রাজনৈতিক পতাকা অথবা ধর্মের ধ্বজা হয়তো হাতে নিয়েছে কিন্তু কুসংস্কার ও গোঁড়ামিতে এরা আচ্ছন্ন, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আদর্শকে জীবনে গ্রহণ বা যোজনা করতে পারেনি। এই গোঁড়ামিযুক্ত মানুষেরাই রাজনীতি বা ধর্মের জিগির তুলে যুগে যুগে দেশে দেশে বারবার ভাইয়ের রক্তে হাত রঞ্জিত করেছে – এই তো আজ পর্যন্ত তোমাদের মানবজাতির সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস।

একমাত্র আধ্যাত্মিক ব্যক্তিই চেতনায় উন্নত হয়ে ঐ অবস্থা থেকে উন্নীত হতে পারে। চণ্ডাশোক ধর্মাশোক হয়েছিল কলিঙ্গযুদ্ধের বীভৎসতা দেখে নয়, আধ্যাত্মিক গুরু সন্ন্যাসী উপগুপ্তের কাছে দীক্ষা নেবার পর বা তাঁর কাছে অধ্যাত্মশিক্ষা গ্রহণের পর। তাই আধ্যাত্মিকতায় সকল বন্ধনের মুক্তি ঘটে। আমি চাই আগামী বিশ্বের চিন্তানায়করা, বুদ্ধিজীবীরা চিন্তা করুক ‘আধ্যাত্মিক সমাজবাদ’ নিয়ে। আধ্যাত্মিক সমাজবাদই আগামীতে সমাজব্যবস্থার মধ্যে সুস্থিতি আনতে সক্ষম হবে আর অন্য কোন বাদ শুধু বিবাদই সৃষ্টি করবে সমাজে, তার বীভৎস রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি বা ভোগ করছি। তাই welcome আধ্যাত্মিক সমাজবাদ।

জিজ্ঞাসু—কিছুদিন ধরে বাইবেল পড়ছি- -বাইবেল কি যীশুর লেখা ? বাইবেলের সাথে ভারতীয় চিন্তার মূল পার্থক্য কি ?

গুরুমহারাজ—বাইবেল পড়ো, ভালো তো, তা বাইবেল বলতে কি পড়ছ Old Testament না New Testament ? নিউ টেষ্টামেন্ট বা “নতুন নিয়ম” এসেছে যীশুখ্রীষ্টের মৃত্যুর পর থেকে। তার আগে ছিল Old Testament। যীশুখ্রীষ্টের পর থেকেই খ্রীষ্টান, তার আগে ছিল ইহুদি। মোজেস – মুসা — যীশু এই পরম্পরায় semitic চিন্তার উৎকর্ষতা এসেছে। এই একই পরম্পরায় আরও পরে এসেছে হজরত মহম্মদ। যারজন্য কোরানেও যীশু, মুসা ইত্যাদিদের নবী হিসাবে মর্যাদা দেওয়া আছে। যাইহোক তুমি যে বলছিলে, “যীশুর নিজের লেখা” বাইবেল কিন্তু এরকম কিছু নয়। যীশুর সমসাময়িক যারা অর্থাৎ তাঁর প্রিয় ১২ জন শিষ্য বা অন্যান্যরা যীশুর জীবদ্দশায় কিছু লেখেনি। তার crucification-এর অনেক পরে যোহান, মার্ক, লুক এবং ম্যাথুজ লিখল ‘নতুন নিয়ম’ বা New Testament, সেখানে যীশু যেসব উপদেশ দিয়েছেন সেগুলি লিপিবদ্ধ আছে বলেই ধরে নেওয়া হয়। সেমেটিক চিন্তাবিদদের মধ্যে মোজেস – মুসা — যীশু — আলিজা — মহম্মদ এইভাবে যদি একটা পরম্পরা ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে মূল চিন্তায় বা দর্শনে এরা সবাই প্রায় একই স্থানে রয়েছে শুধু বাহ্যিক আচার-আচরণ, অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে পার্থক্য রয়েছে মাত্র। বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি-রহস্য সম্বন্ধে New বা Old Testament এবং কোরানের ধারণা একই। ঈশ্বর নিজের আকৃতিবিশিষ্ট আদমকে সৃষ্টি করলেন এবং পরে আদমের পাঁজর থেকে হাভা বা ইভ-কে সৃষ্টি করলেন ইত্যাদি। এছাড়া তুমি পাবে যে, এক নিরাকার Supreme God-ই এদের সকলের উপাস্য। এরা সকলেই মৃতদেহ কবর দেয় কারণ এদের সবার প্রচলিত বিশ্বাস যে, মৃত্যুর পর আর মানুষের জন্ম হয় না, একেবারে মহাপ্রলয়ের সময় পুনরুত্থান হয়, আরও অনেক মিল পাবে। ইত্যাদি

ভারতবর্ষের চিন্তার উৎকর্ষতা থেকে এসেছে বেদ, আর বেদের সারভাগ বেদান্ত। বেদে যে সৃষ্টিতত্ত্ব রয়েছে তার সঙ্গে বর্তমানে বিজ্ঞানীদের সৃষ্টিতত্ত্বের হুবহু মিল রয়েছে, ফলে আর্যঋষিদের উপলব্ধ জ্ঞান যে পরিপূর্ণ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এটা প্রমাণিত হল। আর্যঋষিদের সূত্রগুলি যত প্রাচীনই হোক না যেন সর্বদা চিরনবীন, অর্থাৎ তা সেকালেও গ্রহণযোগ্য ছিল আজও বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য। কারণ বেদের সূত্রগুলি বর্তমানের জড়বিজ্ঞান বা জীবনবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। মৃত্যু এবং পুনরুত্থান নিয়ে সেমেটিক চিন্তার কি ভিত্তি তা আমি আজও খুঁজে পাইনি। প্রাচীনকালে মিশরের ফ্যারাওদের শরীর অবিকৃত রাখার জন্য ‘মমি’ বানিয়ে রেখে দেওয়া হোত প্রলয়কালে পুনরুত্থানের কথা ভেবে। সঙ্গে খাদ্য- দ্রব্যাদি, বস্ত্র, অলঙ্কার, ধনরত্ন এমনকি দাসদাসীদেরও মেরে রাজার কবরের সাথে রেখে দেওয়া হোত। তোমরা হাসছ—কিন্তু এটা ইতিহাস। শোনা যায় তুতিকরিন নামে এক ফ্যারাওর মমির পাশে কয়েকশ মমি বা কঙ্কাল পাওয়া গেছে, যেগুলি সম্ভবত রাজার হতভাগ্য চাকর-বাকরদেরই হবে।

ইউরোপে বহু জায়গায় বহু বিদগ্ধ মানুষের সঙ্গে আমার যীশুর ‘রিজারেকসন’ বা ‘পুনরুত্থান’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জন্ম- মৃত্যু ও জন্মান্তরের রহস্য সম্পর্কে বেদান্ত কি বলে তা শুনে ওরা স্তম্ভিত হয়ে গেছে। এদের অনেকে এতটাই impressed হয়েছে যে, হয় আমার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছে অথবা India-য় আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অনেকে নতুন করে indology section-এ India সম্বন্ধে পড়াশোনা করার জন্য ভর্তিও হয়ে গেছে। দ্যাখো resurrection-এর idea-টা খারাপ নয় কিন্তু সেটা সকলজীবের একই দিনে হবে এমনটা নয়। Resurrection through re-incarnation । জন্মান্তরেরমধ্যে দিয়ে জীবের চেতনা ধীরে ধীরে চৈতন্যময় হয়ে ওঠে। তাই বলা হয়েছে এক একটা জীবন যেন এক একটা সিঁড়ি বা ধাপ। অভিজ্ঞতার সোপান বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে ওঠা। মহাপ্রাকৃতিক নিয়মেই এটা ঘটে চলেছে – তুমি মানো বা না মানো এটা চিরন্তন— শাশ্বত—সত্য। এই যে ক্রম এটা through evolution হয় যেটা জীববিজ্ঞানীরা বিবর্তনবাদ হিসাবে বিশ্লেষণ করেছে, মানুষের ক্ষেত্রে অর্থাৎ মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্ব, দেবত্ব থেকে ঋষিত্ব এই যে ক্রম এটা হয় through involution বা সংবর্তনের মাধ্যমে। তবে involution বা evolution-কেও revolute করা যায় একমাত্র আধ্যাত্মিক পথের পথিক হয়ে। সদগুরুর সংস্পর্শে এসে মানুষ যদি গভীরভাবে অন্তর্মুখী হতে পারে তাহলেই তার চেতনা চৈতন্যময় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ এই গভীরতার স্পর্শ পেয়েছিলেন তাই বলতে পেরেছেন “এই জনমে ঘটালে কত জন্ম-জন্মান্তর।” এটাই Revolution. যাইহোক কথা হচ্ছিল শাশ্বত-চিরন্তন বা সত্যকে নিয়ে। যা সত্য তাতো ক্ষণস্থায়ী নয় বা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পৃথকও নয়। সুতরাং সত্যকে অস্বীকার করা বা সত্যের দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে থাকাটা আহাম্মকি। বর্তমানের শিক্ষিত আধুনিক মনস্ক মানুষেরা সত্যকে গ্রহণ করুক, জীর্ণ, মরচে-ধরা কিছু মতবাদ নিয়ে আঁকড়ে পড়ে না থেকে যুগের সঙ্গে পা মিলিয়ে চিন্তার জগতে এগিয়ে আসুক —তবেই তো তারা নতুন যুগের অগ্রদূত হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। অন্যথায় শুধু হানাহানি, মারামারি আর রক্তপাত ঘটতে থাকবে। যা হাজার হাজার বছরের মানবের অগ্রগতির ইতিহাস। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন— পৃথিবী থেকে কষাইখানা যেদিন লুপ্ত হবে সেদিনই পৃথিবীতে যুদ্ধ, রক্তপাত বন্ধ হবে। আমরা বসে আছি সেদিনটির প্রত্যাশায়।