প্রশ্ন—এখন প্রকৃত ভক্তিতত্ত্ব কি অনুগ্রহ করে বলুন ।

উত্তর— প্রিয় আত্মন্—ভক্তি শব্দ ‘ভজ’ ধাতু হতে আগত ৷ ব্যাকরণ অনুসারে ‘ভজ সেবায়াম্ তথা ভঞ্জো অমার্দনে ভজনং ভক্তি’ — অর্থাৎ প্রেমপূর্বক ভগবানের ভজন করাই ভক্তি—ভগবান্ ভিন্ন অন্য সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করাই ভক্তি।

প্রশ্ন—আপনি অনুগ্রহ করে যদি ভক্তিতত্ত্বের রহস্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব

উত্তর—প্রিয় আত্মন্ ! ভক্তিরহস্ত সম্বন্ধে বলতে গেলে গীতার একাদশ অধ্যায়ে বিশ্বরূপদর্শনযোগে ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে সমস্ত শ্লোক দ্বারা উপদেশ দিয়েছেন, তার মধ্যে নিম্নের এই গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকটির বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় :-

“মৎকর্মকৃৎমৎ পরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ ।

নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব ৷৷”

[—’হেপাণ্ডব,যেব্যক্তিমৎকর্মকারী,মন্নিষ্ঠ,মদ্ভক্তওআত্মীয়-স্বজনাদিতেআসক্তিশূন্যএবংসর্বভূতে,এমনকিঅত্যন্তঅপকারীরপ্রতিওবৈরভাববিহীন,তিনিআমাকেপ্রাপ্তহন।’~শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা(১১।৫৫)]

—এই শ্লোকটি অনুধাবন করলে দেখা যায় এর মধ্যে পাঁচটি মহাবাক্য আছে, তন্মধ্যে তিনটি ভগবানের বিষয়ে এবং দুটি সংসার বিষয়ে । যথাক্রমে—‘মৎ কর্ম কৃৎ’, ‘মৎ-পরমঃ’ এবং ‘মৎ-ভক্ত’আর অপর দুটি হল ‘সঙ্গ-বর্জিতঃ’ এবং ‘নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু’। —এই বাক্যগুলির মধ্যে ভগবান বলেছেন কেমন করে তাঁকে লাভ করা যায় । মানবসকল সমস্ত কর্মই শরীর, মন এবং ইন্দ্রিয় সহযোগে সম্পন্ন করে থাকে। মৎ কর্ম কৃৎ—অর্থাৎ মদর্থ কর্ম কৃৎ—যিনি ভগবানের জন্য কর্ম করেন।

সংসারে দেখা যায় কর্ম সকলেই করে। এখানে বিচার্য হল- মানুষ কার জন্য কর্ম করে— পত্নীর জন্য ? পুত্রের জন্য ? ধন লাভের জন্য ? ইন্দ্রিয় সুখের জন্য ? না, লোক প্রতিষ্ঠার জন্য ? বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে লোক-সাধারণ কর্ম করে থাকে ৷ কিন্তু ভক্ত কর্ম করেন ভগবানের জন্য। তাঁর সমস্ত কর্মই ভগবানের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে । তাঁর কর্ম অভিমানমুক্ত হয় । ভক্ত কর্মফল ভগবানকে অর্পণ করে দেন, ভগবানকে ভার দেন । তিনি নিজে অর্থাৎ ভগবানের জন্য কর্ম করেন। এইজন্য কর্মেই তোমার অধিকার— কর্মফলে নয়, কর্মের ফলাফলের ভার তুমি ভগবানকে অর্পণ কর ।

দ্বিতীয়তঃ—‘মৎ পরমঃ’ অর্থাৎ ভগবানে শরণাগত হও। তুমি এই সংসারে শ্রেষ্ঠ কাকে মনে কর ? তোমার অবলম্বন বা ভরসা কার উপর ? বিশ্বাস এবং ভরসাস্থল ভগবানই হওয়া উচিত। কারণ সংসারে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হল একমাত্র ভগবান ।

এই সংসারে ধন-সম্পদ, মিত্র, পুত্র, পরিবার—সমস্ত কিছুই প্রাণসংকটকালে ছেড়ে চলে যায়। সেইজন্য মানুষের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হল ভগবান আর সেইহেতুই মানুষের প্রার্থনা হওয়া উচিত— তাঁকে লাভ করা। সুতরাং ভক্ত ভগবানকেই প্রার্থনা করেন, সংসারে ভগবানকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় মেনে তাঁকেই বিশ্বাস ও ভরসাস্থল করেন—এটাই শরণাগতি ।

তৃতীয়তঃ—‘মদ্ভক্তঃ’ভক্ত ভগবানকেই প্রেম নিবেদন করেন। কারণ সমস্ত সাংসারিক বিষয় চিরন্তন নয়—একমাত্র ভগবানই নিত্য —শাশ্বত—চিরন্তন। এই কারণে ভক্তের প্রেম ভগবানে অর্পিত হয় ৷

এখন অবশ্যই উপরোক্ত তিনটি ( ভগবৎ বিষয়ক) মহাবাক্যের তাৎপর্য বুঝতে পারলে । এবার সংসার সম্বন্ধে যে দুটি মহাবাক্য রয়েছে—তাই বলছি, মনোযোগপূর্বক শ্রবণ কর ।

‘সঙ্গ বর্জিতঃ’—অর্থাৎ সংসারে কারও প্রতি আসক্ত হয়ো না। আসক্তিই বন্ধনের কারণ । আর ‘নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু’—অর্থাৎ সমস্ত প্রাণীর প্রতি বৈরহীন বা দ্বেষ-বর্জিতভাবে থেকো। রাগ-দ্বেষ বর্জিত হৃদয়ে সমস্ত প্রাণিকুলের প্রতি ব্যবহার করবে।

বলাবাহুল্য ভক্তিযোগ রহস্য সম্বন্ধে দ্বাদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমগ্র মানবের প্রতিনিধি অর্জুনকে নানাবিধ ভক্তির উপদেশ দান করেছিলেন।

প্রশ্ন—আচ্ছা, ভগবান গীতাতে ভক্তিযোগের উপদেশ দ্বাদশ অধ্যায়ে কেন দিলেন—এর পিছনে কি রহস্য ?

উত্তর— প্রিয় আত্মন্—বৈষ্ণব ভক্তিশাস্ত্রে দ্বাদশ সংখ্যাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈষ্ণবগণ দ্বাদশীকে ‘হরিবাসর’ বলেন এবং একাদশীর ব্রতও দ্বাদশীর দিন করে থাকেন। দ্বাদশ অক্ষর মন্ত্রও তাঁদের কাছে খুবই মহত্বপূর্ণ এবং শ্রীমদ্ভাগবতও দ্বাদশ স্বন্ধে প্রকাশিত দেখা যায় । বৈষ্ণবমতে ভগবানের আদিত্যস্বরূপ দ্বাদশাত্মিকা, এই আদিত্যগণের মধ্যে দ্বাদশতম আদিত্য বামন। ভগবান প্রথম বামনরূপে অদিতির নিকট প্রকট হয়েছিলেন। পরে দৈত্যরাজ বলির নিকট ত্রিপাদ ভূমি গ্রহণ করে ত্রিবিক্রমরূপ ধারণ করেছিলেন। তারপর বলিরাজকে রসাতলে প্রেরণ করে ত্রিবিক্রমরূপ ত্যাগ করেছিলেন ।

প্রশ্ন—আপনি যে বামন ও দৈত্যরাজ বলির কথা বললেন, তার যথার্থ তাৎপর্য কি ?

উত্তর—প্রিয় আত্মন্ ! সাধকের জীবনে এর খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। সাধকের প্রকৃতিতে (অদিতিতে) প্রথমে ভগবদ্ ভার ক্ষুদ্রাকারে বিদ্যমান থাকে । তখন সে খায় না, বলে না, হাসে না, কাঁদে না, নাচেনা ও খেলে না। কিন্তু যখন সাধক প্রেম দ্বারা সেবা আরম্ভ করে, তখন সে ধীরে ধীরে খায়, হাসে, কথা বলে, নাচে ও কাঁদে। > ক্রমশঃ বামনরূপে প্রকটিত হয় অদিতির নিকট, অর্থাৎ সাধকের চিত্তে। এরপর ত্রিপাদ ভূমি গ্রহণ করে ত্রিবিক্রমরূপ ধারণ করেন । অর্থাৎ ভগবৎ ভাব ক্রমশঃ জাগ্রত, স্বপ্না ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থাকে ব্যাপ্ত করে ফেলে। তারপর বলিরাজকে রসাতলে প্রবেশ করিয়ে পুনরায় স্বরূপপ্রাপ্ত হন । এর তাৎপর্য হল স্বত্ত্ব রজঃ ও তমঃ—এই তিন প্রাকৃত গুণকে নাশ করে ত্রিবিক্রমরূপ ত্যাগ করেন—অর্থাৎ জাগ্রত, স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই তিন অবস্থার পরে তুরীয়স্বরূপে স্থিতি লাভ করেন। এটাই হল যথার্থ তাৎপর্য— নিশ্চয় বুঝতে পারলে ।

প্রশ্ন—আজ্ঞে হ্যাঁ, বুঝলাম । কিন্তু আর একটি প্রশ্ন মনে জাগছে। উপাসনা সম্পর্কে বিভিন্ন আচার্য বিভিন্ন প্রকার প্রণালীর কথা বলে- ছেন, যেমন সগুণ, নির্গুণ ইত্যাদি। আবার সগুণ উপাসকদের মধ্যেও মতভেদ দেখা যায়। এ ব্যাপারে আপনি কিছু আলোকপাত করুন।

উত্তর—প্রিয় আত্মন্, আচার্য শঙ্কর ভগবানের বিরাট রূপের অর্থাৎ বিশ্বাত্মকরূপের প্রতি ভক্তির উপাস্থ্য নিরূপণ করেছেন। আচার্য রামানুজ ভগবানের চতুভু জ নারায়ণ-রূপের প্রতি ভক্তির উপাস্থা নিরূপণ করেছেন। আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণব আচার্যগণ ভগবানের দ্বিভুজ নরাকার মূর্তিকে ভক্তির উপাস্য নিরূপণ করেছেন—এগুলি সমস্তই সাকার উপাসনা । নির্গুণ উপাসনা হল—অক্ষর তত্ত্ব অর্থাৎ প্রণবের উপাসনা ৷

এই নির্গুণ এবং সগুণ—উভয় উপাসনার ফল একই—তাতে কোন সংশয় নেই ।

যাঁরা দেহ-অভিমানমুক্ত, তাঁদের পক্ষে নির্গুণ উপাসনা শ্রেষ্ঠ ও সহজ। কিন্তু যাঁরা দেহ-অভিমানবিশিষ্ট, তাঁদের পক্ষে সগুণ উপাসনা শ্রেষ্ঠ ও সহজ। সুতরাং তুমি বুঝতে পারলে, যতক্ষণ দেহাভিমান থাকে, ততক্ষণ সগুণ উপাসনা তাঁর পক্ষে শ্রেয়ঃ । দেহাভিমানীর পক্ষে নির্গুণ উপাসনা অতীব কঠিন। ন

প্রিয় আত্মন্—সেবা, বিশ্বাস ও প্রেমের সঙ্গে সতত ভগবানে যুক্ত থাকাই ভক্তিযোগ যোগ মানে যুক্ত থাকা বা লেগে থাকা— অখণ্ডরূপে যুক্ত থাকা । যেমন গঙ্গা অখণ্ডরূপে সমুদ্রের সহিত যুক্ত থাকে, সেরূপ। ভক্তও ভগবানের সহিত অখণ্ডরূপে যুক্ত থাকেন । এই ভক্তিকে তুমি যেন মনোবৃত্তি, ভেবো না। কারণ মনোবৃত্তি সতত থাকে না। এটা পরিবর্তনশীল । এজন্য ভক্তি মনোবৃত্তি নয়। ভক্ত তো ভগৱানে সতত যুক্ত থাকেন—খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, সব অবস্থায় সব সময় ভগবানে যুক্ত থাকেন । সুতরাং ভক্তি রাগাত্মিকা সংস্কার।

প্রিয় আত্মন্ ! ভগবৎভাবে বিভোর হও। ভগবৎ প্রেমে উন্মাদ হয়ে নৃত্য কর। তোমার রোমে রোমে প্রেম-ভক্তির স্ফুরণ হতে থাকুক। তুমি অচিরেই রসরাজ পরমরসিক ভগবানকে বোধে বেধি করবে, এতে কোন সংশয় নেই। আর যদি না হয়, তার জন্য আমি দায়ী হব।

একমাত্র ভক্তই ভগবানের মহিমা বা মাধুর্যরস আস্বাদন করেন। ভক্তের কাছেই ভগবান ধরা দেন, কেননা তিনি যে ভক্তাধীন।

প্রশ্ন—আপনার বর্ণনা অনুসারে ভক্তিরহস্য বুঝলাম । এবার সংসারে কত প্রকারের ভক্ত আছেন, অনুগ্রহপূর্বক তা আমায় বলুন ।

উত্তর—প্রিয় আত্মন্‌—সংসারে অনেক প্রকারের ভক্ত আছেন, যথা ক্লিষ্টভক্ত, যুক্ততম ভক্ত, অনুগ্রাহ্য ভক্ত, ঈশ্বরায়ণ ভক্ত, পূজা পরায়ণ ভক্ত, অভ্যাসায়ণ ভক্ত, ফলত্যাগী ভক্ত, অদ্বেষ্টা ভক্ত, শান্ত ভক্ত, অনপেক্ষ ভক্ত, শামায়ণ ভক্ত, সমভক্ত, অনিকেত ভক্ত, শ্রদ্ধাবান ভক্ত, জ্ঞানাশ্রিত ভক্ত, রাগাশ্রিত ভক্ত, প্রেমাশ্রিত ভক্ত ইত্যাদি ।

প্রশ্ন—কৃপা করে আপনি এই সকল ভক্তগণের স্বভাব বা প্রকৃতি বর্ণনা করুন ।

উত্তর— প্রিয় আত্মন্‌— বলছি, তুমি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।

ক্লিষ্ট ভক্ত—এই শ্রেণীর ভক্তগণ ইন্দ্রিয় সংযমশীল, সমবুদ্ধিসম্পন্ন ও সর্বভূতহিত-পরায়ণ হয়ে নির্গুণ নিরাকার ভগবানের উপাসনা করেন ।

যুক্ততম ভক্ত—এঁরা পরম শ্রদ্ধার ভাব নিয়ে প্রযত্ন দ্বারা আপন মনকে ভগবানে আবিষ্ট করে উপাসনা করেন।

অনুগ্রাহ্য ভক্ত—এরূপ ভক্তরা সমস্ত কর্ম ভগবানে সমর্পণ করেতাঁর আশ্রিত হয়ে থাকেন। এঁরাই অনন্য যোগী নামে অভিহিত।

ঈশ্বরায়ণ ভক্ত—এরূপ ভক্তগণ নিজের মনকে এবং বুদ্ধিকে ভগবানে অর্পণ করে তাঁর মধ্যেই নিবাস করেন।

পূজাপরায়ণ ভক্ত— এই প্রকারের ভক্তগণ কেবল ভগবানের পূজার জন্যই কর্ম করে থাকেন ।

অভ্যাসায়ণ ভক্ত—এরূপ ভক্তগণ আপন চিত্তবৃত্তিতে তদাকারপ্রাপ্ত হন অর্থাৎ পুনঃপুনঃ ভগবান চিত্ত প্রণিধান করেন ।

ফলত্যাগী নিষ্কাম ভক্ত— এরূপ ভক্তগণ সমস্ত কর্ম করেও নিষ্কাম থাকেন। অর্থাৎ কর্মের ফল ভগবানে অর্পণ করে থাকেন।

অদ্বেষ্টাভক্ত—এই শ্রেণীর ভক্তগণ আপন স্বভাবে ‘নির্বের’ অর্থাৎ বৈৱভাৰ শৃষ্ঠ, শান্ত, সহিষ্ণু এবং দৃঢ় নিশ্চয় হন। এইভাবে সমস্ত প্রাণিকুলের প্রতি রাগ-দ্বেষহীন হয়ে মন এবং বুদ্ধি ভগবানে অর্পণ করেন।

শান্ত ভক্ত—এঁরা গ্রহণ ও ত্যাগ বিষয়ে নির্বিকার থেকে ভগবানেরসঙ্গে শান্তরসে মগ্ন থাকেন

অনপেক্ষ ভক্ত—এরূপ ভক্তগণ কোন ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, ক্রিয়া, শিক্ষা এবং সর্বপ্রকার আড়ম্বর বর্জিত হয়ে একমাত্র ভগবানে যুক্ত থাকেন ৷

শামায়ণ ভক্ত—এই সকল ভক্ত কর্মবিক্ষেপ হতে মুক্ত থাকেন ৷ চিত্তবিক্ষেপ-বর্জিত হয়ে শান্তচিত্তে ভগবানে চিত্ত সমাহিত করেন ।

সমভক্ত—এরূপ ভক্তরা শত্রু, মিত্র, মান, অপমান, শীত, উষ্ণ, সুখ, দুঃখ ইত্যাদিতে নিরাসক্ত হয়ে অবিচলিতভাবে ভগবানে স্থিত থাকেন।

অনিকেত ভক্ত—এরূপ ভক্তগণ যেখানে যেমন পরিস্থিতি, সেখানে তেমনভাবে অবস্থান করেও মৌন ও সন্তুষ্টচিত্তে ভগবানে চিত্তপ্রণিধান করেন ।

শ্রদ্ধাবান ভক্ত—এই সকল ভক্তগণের ভগবান সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ অনুভূতি না থাকলেও শ্রদ্ধামূলক বিশ্বাস দ্বারা ভগবৎ-পরায়ণ থাকেন। এদের সরলতা দেখে ভগবান অতি শীঘ্র দর্শন দেন ।

জ্ঞানাশ্রিত ভক্ত—এই শ্রেণীর ভক্তগণ ভগবান সর্বভূতের অন্তর্যামী এবং সর্বত্র তিনি বিরাজমান—এইরূপ নিশ্চয় হয়ে সর্বব্যাপক ভগবানকে বিশ্বাত্মকরূপে ভজনা করে থাকেন ।

রাগাশ্রিত ভক্ত—এইরূপ ভক্তগণ ভগবানকে অত্যধিক আপনজন জেনে, কোন একটি মানবোচিত ভাবকে আশ্রয়পূর্বক তাঁকে ভালবাসতে থাকেন । শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য এবং মধুর—এই ভাবগুলির মধ্যে যে ভাবটি স্বভাবগত অর্থাৎ স্বভাবের অনুকুল, সেই ভাবটিকে আশ্রয় করেন এবং তীব্রভাবে ভগবানকে ভালবাসেন। এঁরা ভাবাশ্রয়ী বা রাগাশ্রয়ী ভক্ত। এটাই ব্রজভাব বা বৃন্দাবনভাব অথবা গোপীভাব । এঁরাই ভক্ত শিরোমণি । ভগবান এই ভাবে অতিশয় প্রসন্ন। যিনি অসীম—সীমাহীন হয়েও ভক্তের নিকট সসীম রূপ পরিগ্রহ করেন এবং ভক্তের সহিত লীলা করে থাকেন। এটাই ভগবানের মাধুর্য বা মহিমা

প্রেমাশ্রিত ভক্ত—এই প্রকারের ভক্তগণ পার্থিব-বিষয়জ্ঞান-বর্জিত এবং ভগবৎ প্রেমোন্মাদ—ভগবানের, প্রেমে সর্বদা পাগল ৷ এঁরা সর্বক্ষণ ভগবৎ প্রেমে মগ্ন হয়ে থাকেন এবং ভগবানের শৃঙ্গারাত্মক লীলারস মাধুর্যে ডুবে থাকেন। এটা ভগবৎ প্রেমের চরম ও পরম পরিণতি, সর্বভাবের পরিণতি — এটাই মধুর ভাব—এটাই রাধাভাব ।