প্রশ্ন— ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে দেহভাণ্ডে’—এই কথাটা প্রচলিত আছে—এটা কি যথার্থ ?—যদি যথার্থ হয়—তবে আপনি ‘ভাণ্ডে ব্ৰহ্মাণ্ড তত্ত্ব’ সম্বন্ধে যদি বিস্তারিত আলোচনা করেন তাহলে খুবই উপকৃত হই । স

উত্তর—প্রিয় আত্মন্ !

ঠিকই, এই চরাচর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে আমাদের খণ্ডিত দৃশ্যমান এই স্থল মানবদেহ একই সূত্রে ওতপ্রোত রয়েছে। এই মানব শরীর হল বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক। সেইহেতু মানব শরীরকেও ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড বলা হয় এবং ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ডরূপ এই মানব শরীর ও বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ঐক্যসূত্রে গ্রথিত।

পূর্বে আলোচনা প্রসঙ্গে তোমাকে বলা হয়েছে যে—চিন্ময় পরাবাক প্রণবই ব্রহ্মের প্রকৃতি এবং ঐ পরাবাক্ প্রণবের অবরোহ গতিতে যে বিস্তার—তাই হল বিশ্বসৃষ্টি। যথাক্রমে প্রণব হতে মহৎ আবির্ভূত হয়। এইরূপে মহৎ হতে ব্যোম, ব্যোম হতে মরুৎ, মরুৎ হতে তেজঃ, তেজঃ হতে অপ এবং অপ হতে ক্ষিতি আবির্ভূ ত হয়।

প্রিয় আত্মন্ –এইভাবে প্রতিটি উপাদান ক্রমানুযায়ী পূর্ব উপাদান জাত । ঐ একইভাবে চিন্ময় পরাবাক্ প্রণব হতে অন্তঃ- করণ চতুষ্টয়, পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা এবং পঞ্চ কর্মে- প্রিয়সহ এই দৃশ্যমান খণ্ডিত স্থল মানবদেহ প্রতিভাসিত হচ্ছে ।

মানবদেহ হল পঞ্চভূতের সমষ্টি। এগুলি যথাক্রমে ব্যোম, মরুৎ, তেজঃ, অপ ও ক্ষিতি (Space, Plasma, Gas, Liquid, Solid)। এগুলি আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল ও পৃথিবী নামেও অভিহিত হয়ে থাকে

পঞ্চ উপাদানের সমষ্টির পরিণতি এই মানবদেহ। সুতরাং মানবদেহ গঠনে প্রতিটি উপাদান পঞ্চপ্রকারে অবস্থিত। মানবদেহের ভিতর এই পঞ্চ উপাদান অনুপ্রবিষ্ট রয়েছে পরস্পরভাবে।

যেমন—আকাশতত্ত্ব :— জ্ঞাতা, চিত্ত, বুদ্ধি, মন এবং অহংকার -এই পঞ্চরূপে মানবদেহে অবস্থিত। এরা অন্তঃকরণ বা অতীন্দ্রিয় নামে পরিচিত।

বায়ুতত্ত্ব :- প্রাণ, অপান, সমান, উদান এবং ব্যান–এ পঞ্চরূপে মানবদেহে অবস্থিত। এইগুলি পঞ্চ প্রাণধারক বায়ু, পঞ্চপ্রাণ নামে পরিচিত

অগ্নিতত্ত্ব :—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক—এই পঞ্চরূপে মানবদেহে অবস্থিত । এইগুলি ইন্দ্রিয়গ্রাম ও পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় নামে পরিচিত ৷

এইভাবে জলতত্ত্ব মানবদেহে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ – এই পঞ্চরূপে অবস্থিত। এগুলি পাঁচটি সূক্ষ্মভাব—পঞ্চ তন্মাত্রা নামে পরিচিত।

পৃথ্বীতত্ত্বও মানবদেহে বাক্, পাণি, পদ, উপস্থ ও পায়ু–এই পঞ্চরূপে অবস্থিত। এগুলি কর্ম করার জন্য—পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় নামে পরিচিত।

প্রিয় আত্মন্—এই যে পঁচিশটি তত্ত্বের কথা বলা হল, এর মধ্যে জ্ঞাতা হলেন পুরুষ—যাঁকে জীবাত্মা বলা হয়। আর অন্তঃকরণ চতুষ্টয়, পঞ্চপ্রাণ, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় মিলে হয় চতুর্বিংশতি তত্ত্ব। এই চতুর্বিংশতি তত্ত্বকে প্রকৃতি বলা হয় ।

এখন নিশ্চয় বুঝা গেল যে, চতুর্বিংশতি তত্ত্বই হল প্রকৃতি এবং জ্ঞাতা বা আত্মা হলেন পুরুষ । বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সমষ্টিরূপে ক্ষর এবং অক্ষর অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির লীলা যেমনভাবে সম্পূর্ণ হচ্ছে, তদ্রূপ ব্যষ্টিরূপে মানবজীবনেও ঐ একইভাবে একই লীলা সংঘটিত হচ্ছে ।

এই ক্ষেত্রে মানব শরীর হল প্রকৃতি এবং শরীরের স্বামী আত্মা হলেন পুরুষ। অর্থাৎ জীবাত্মা হলেন পুরুষ এবং জীবদেহ হল প্রকৃতি।

সুতরাং সমষ্টিরূপে অক্ষর পুরুষ ও ক্ষর প্রকৃতির বিশ্বব্রহ্মাণ্ডরূপলীলার ন্যায় মানবজীবনেও ব্যষ্টিরূপে জীবাত্মা ও জীবদেহরূপক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ডে জীবনলীলা সংঘটিত হয়ে চলেছে ৷

প্রিয় আত্মন্ ! এরূপ সমষ্টির ভিতর ব্যষ্টি এবং ব্যষ্টির ভিতর সমষ্টির লীলা ওতপ্রোতভাবে ঘটে চলেছে ।

প্রশ্ন – এই ব্যষ্টি এবং সমষ্টির ব্যাপারটি অনুগ্রহ করে আরো একটু বিস্তারিতভাবে বললে ভাল হয় ।

উত্তর—প্রিয় আত্মন্ ! পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে— অক্ষর পুরুষ হলেন আত্মা এবং ক্ষর প্রকৃতি হল শরীর ৷ এই শরীর আবার স্থুল, সূক্ষ্ম এবং কারণভেদে তিন প্রকার।এক্ষণে সমষ্টি ও ব্যষ্টি ভেদে এর আলোচনা করা হচ্ছে—তুমি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর এবং অনুধারন কর।

প্রথমে যে পঁচিশটি প্রাথমিক তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে তার দ্বারা এই শরীর গঠিত। এই অবস্থাকে জাগ্রত বলা হয়। ব্যষ্টিতে ইনি বিশ্ব নামে খ্যাত এবং এর অধিষ্ঠাতা (সমষ্টিতে ) শিব বা বিরাট

দ্বিতীয় সূক্ষ্ম শরীর। পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা, পঞ্চ প্রাণ এবং মন ও বুদ্ধি এই সতেরটি তত্ত্ব দ্বারা সূক্ষ্ম শরীর গঠিত। এই অবস্থাকে স্বপ্ন বলা হয়। ব্যষ্টিতে ইনি তৈজস্ নামে খ্যাত। এর অধিষ্ঠাতা ( সমষ্টিতে ) হিরণ্যগর্ভ ৷

তৃতীয় কারণ শরীর । এই কারণ শরীরে জ্ঞাতার সঙ্গে চিত্ত যুক্ত হয়ে থাকে ; এটা হল অন্তঃকরণ বা কারণ শরীর। এই ইনি প্রাজ্ঞ নামে খ্যাত। এর অবস্থার নাম সুষুপ্তি । ব্যষ্টিতে ইনি অধিষ্ঠাতা ( সমষ্টিতে) ঈশ্বর ।

এর পর যে অবস্থা, তা প্রাথমিক তত্ত্বগুলির মিশ্রণবিহীন অবিমিশ্র স্থিতি—শুদ্ধ চৈতন্য সাক্ষী মাত্র যা হল মহাকারণ শরীর। এই অবস্থাকে তুরীয় বলা হয়। ব্যষ্টিতে ইনি তৎপুরুষ নামে খ্যাত। এঁর অধিষ্ঠাতা (সমষ্টিতে ) পুরুষোত্তম তি

এর পর যা, তা সকলের ঊর্ধ্বে ক্ষর ও অক্ষরের পরপারে । অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতির পরে— উপাধিবিহীন অখণ্ড—অদ্বৈত—সনাতন—পরতত্ত্ব বা আত্মতত্ত্ব। ইনিই পরব্রহ্ম — পরমেশ্বর ।

প্রিয় আত্মন্‌ ! বেদমন্ত্রের ‘ওঁ তৎ সৎ’-বিশ্লেষণ করলেনিম্নের রূপে দাঁড়ায় :

যথা— ওঁতৎ সৎ

অ  উ ম  তৎ সৎ

অ  উ ম ⌣ ⁠                      •⁠

সমষ্টি |             বিরাটহিরণ্যগর্ভঈশ্বরপুরুষোত্তমপরব্রহ্ম

ব্যষ্টি | বিশ্বতৈজসপ্রাজ্ঞ তৎপুরুষআত্মা

অবস্থা |জাগ্রত স্বপ্ন সুষুপ্তি তুরীয়ব্ৰহ্ম

শরীর |                স্থূল                সূক্ষ্ম                   কারণ              মহাকারণ               কারণাতীত

⬇️           ⬇️               ⬇️              ⬇️               ⬇️

 ⬇️           ⬇️               ⬇️              ⬇️               ⬇️

          (অন্নময় ও প্রাণময়)(মনোময় ও বিজ্ঞানময়)(আনন্দময়)  (আপ্ৰকৃত চিন্ময়)  (সচ্চিদানন্দময়)

প্রিয় আত্মন্ !

এখন মানব-দেহতত্ত্বের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে –একাগ্রতা সহকারে শ্রবণ কর ।

মানবদেহ যে পঞ্চভূতের সমষ্টি বা পরিণতি, তা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে । ঐ পঞ্চভূতই একত্রিত হয়ে মানবদেহের আকৃতি দিয়েছে। এবার পঞ্চভূতের গুণাবলী হতে মানবদেহ কিভাবে আকৃতি নিয়েছে –তা-ই আলোচ্য বিষয় । 

ক্ষিতি বা পৃথ্বীতত্ত্বের আকৃতি মানবদেহে :- অস্থি, চর্ম, মেদ, শিরা ও কেশ।

অপ বা জলতত্ত্বের আকৃতি মানবদেহে :- মল, মূত্র, শোণিত, শুক্র ও শ্লেষ্মা।

তেজঃ বা অগ্নিতত্ত্বের আকৃতি মানবদেহে :- ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, মোহ ও সংগম ৷

মরুৎ বা বায়ুতত্ত্বের আকৃতি মানবদেহে :- গতিবেগ, আক্ষেপণ,আকুঞ্চন, লজ্জা ও ভয় ।

ব্যোম বা আকাশতত্ত্বের আকৃতি মানবদেহে :- কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ ও মাৎসর্য।

এইভাবে পঞ্চভূতের গুণাবলী মানব শরীরে আকৃতি পেয়েছে।

প্রিয় আত্মন্—এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে, সমস্ত কিছুই পঞ্চগুণাবলীর বিকারমাত্র, যা ব্যষ্টি অন্তঃকরণে বিষয়বৃত্তিরূপেপ্রকাশ পাচ্ছে।

কিন্তু আত্মা বিকাররহিত । যা কিছু বিকার উৎপন্ন হচ্ছে সবই পঞ্চভূত সমষ্টির পরিণতি বা পরিণামস্বরূপ এই দেহের ।

আত্মা সচ্চিদানন্দ– সাক্ষীস্বরূপ—চৈতন্যস্বরূপ—দ্রষ্টামাত্র –বিজ্ঞাতা।

সুতরাং বিকার শরীরের, আত্মার নয়। আত্মা শরীরের স্বামী।

প্রিয় আত্মন্ ! তত্ত্বমসি—তুমি ঐ আত্মা — সমস্ত ঘটনার সাক্ষী—সমস্ত জ্ঞানের বিজ্ঞাতা — সমস্ত অনুভবের অনুভবী—সমস্ত দৃশ্যের দ্রষ্টা। তুমি শাশ্বত—সনাতন – চৈতন্যস্বরূপ – সচ্চিদানন্দ আত্মা ৷ তুমিই শুদ্ধ—বুদ্ধ—মুক্ত—বোধস্বরূপ—তুমিই সেই আত্মা ।

এই আত্মা যখন অবিদ্যাহেতু ভ্রান্তিবশত নিজেকে দেহ ভেবে থাকে অর্থাৎ ‘আমি শরীর’–এরূপ অভিমান করে, তখনই সে পঞ্চভূতের শরীরের যাবতীয় বিকার নিজের বলে অনুভব করে এবংআধ্যাত্মিক সুখ এবং দুঃখ ভোগ করে থাকে । এই সব ভোগ কেবলমাত্র দেহ অভিমানবশত হয়ে থাকে। কারণ সে আত্মস্বরূপ হয়েও অজ্ঞান-অবিদ্যাবশত: নিজেকে শরীর ভেবে শরীরের যাবতীয় বিকারজনিত সুখ ও দুঃখ ভোগ করছে। আত্মচৈতন্য লাভ হলে অর্থাৎ সঠিক রোধে রোধ হলে শরীরাভিমান অপগত হয় আর শরীরাভিমান দূর হলে শরীরগত সুখ এবং দুঃখও অপসারিত হয়। আর তখনই স্ব-স্বরূপের বোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ আত্মচৈতন্যে নিমগ্ন হয়ে স্ব-স্বরূপের সমাধি লাভ হয়। সচ্চিদানন্দ আত্মা তখন আপন প্রকৃতিকে আশ্রয় করে আপনিই আপনার রসমাধুর্যআস্বাদন করেন।

প্রকৃত চৈতন্য বা আনন্দ একই তত্ত্ব। নিস্তরঙ্গ আর তরঙ্গায়িত (Static and Dynamic) ৷

প্রিয় আত্মন্‌—পরাৎপরা পরমেশ্বর আপন প্রকৃতি দ্বারা এই সমগ্র বিশ্ব রচনা করে পুনরায় আপন প্রকৃতিকে আশ্রয় করে আপন মাধুর্যরস আস্বাদন করছেন।

আনন্দ প্রতিষ্ঠিত—পরমেশ্বরের মহিমা অপার।

প্রশ্ন :—আপনি কয়েকবার ‘সচ্চিদানন্দ’ শব্দটি বললেন, ঐ ‘সচ্চিদানন্দ’ শব্দটির তাৎপর্য কি ? –তা একটু সবিস্তারে বুঝিয়ে বলুন।

উত্তর :–প্রিয় আত্মন্! ব্রহ্ম বা পরমেশ্বর সচ্চিদানন্দময় এবং তিনি রসস্বরূপ—যা তোমার নিকট পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সৎ, চিৎ এবং আনন্দ যথাক্রমে সন্ধিনী, সম্বিৎ এবং হ্লাদিনী । এই হল পরমেশ্বরের স্বরূপশক্তি বা প্রকৃতি।

প্রণব বিশ্লেষণকালে তোমাকে এই সম্পর্কে বলা হয়েছে। তথাপি তোমার বুঝবার সুবিধার জন্য তার কিছু অংশ এখানেও আলোচনা করা হচ্ছে ৷

পরমেশ্বরের প্রকৃতিই হল পরাবাক্ চিন্ময় প্রণব। ঐ চিন্ময় প্রণব পরমেশ্বরের প্রথম প্রকাশ এবং প্রথম রূপ। যা অস্ফুটরূপে পরমেশ্বরে বিরাজমান থাকেন । ঐ প্রণবই পরমেশ্বরের চিন্ময় স্বরূপ বা সচ্চিদানন্দ ।

ঐ প্রণবই সব কিছু ব্যাপ্ত হয়ে আছেন । কারণ সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় চিন্ময় পরাবাক্ প্রণবেরই বিস্তার বা আবর্তন, তাঁর স্বরূপ শক্তির খেলা বা লীলা। অর্থাৎ শক্তি ও শক্তিমানের লীলা। কারণ এই ক্রমসংকোচ এবং ক্রমবিস্তার শক্তিরই ক্রীড়া। শক্তিমান সাক্ষীস্বরূপ। তিনি আপন স্বরূপশক্তির ও বিকাশরূপ খেলা দেখতে থাকেন।

বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের ভিতরও এই প্রণবতত্ত্বের সুন্দর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁরা বলেন- পরমেশ্বরের স্বরূপশক্তি ( চিন্ময় প্রণব ) প্রধান । এই স্বরূপশক্তি যথাক্রমে অন্তরঙ্গা, বহিরঙ্গা এবং তটস্থা নামে পরিচিত।

পরমেশ্বরের বহিরঙ্গা প্রকৃতি বা মায়াশক্তির প্রকাশ এই স্কুল জগৎ। পরমেশ্বরের অন্তরঙ্গা প্রকৃতি বা চিৎশক্তির প্রকাশ অন্তর্জগৎ —ভাব জগৎ বা আধ্যাত্মিক জগৎ। আর পরমেশ্বরের অন্তরঙ্গা ও বহিরঙ্গা শক্তির মধ্যবর্তিনী শক্তি হল তটস্থা প্রকৃতি অর্থাৎ জীব- শক্তি; যা সমগ্রবিশ্বে অনন্ত এবং অসংখ্য প্রাণীরূপে বিরাজমান ।

স্বরূপশক্তির সংকোচন অবস্থায় শক্তি স্বরূপে লীন হয়ে যায় এবং প্রসারণ অবস্থায় পুনরায় স্বরূপশক্তি হতে প্রসারিত হতে থাকে । এই ক্রমবিস্তার হল অবরোহ এবং ক্রমসংকোচ হল আরোহ । এইভাবে স্বরূপশক্তির অবরোহ ও আরোহক্রমে একটি বিবর্তন সম্পূর্ণ হয় । এই হল পরমেশ্বরের বিবর্তবিলাস বা লীলাবিলাস ।

এখন নিশ্চয় বুঝতে পারলে যে, তাঁর স্বরূপ হল সচ্চিদানন্দ এবং স্বরূপের শক্তি হল মায়াশক্তি, চিৎশক্তি এবং জীবশক্তি ; যথাক্রমে বহিরঙ্গা, অন্তরঙ্গা এবং তটস্থা।

প্রিয় আত্মন্—বেদাদিশাস্ত্রে এই তত্ত্বই অস্তি, ভাতি ও প্রিয় রূপে উল্লেখিত । আর আমরাও পূর্বে আলোচনা করেছি পরমেশ্বরের স্বরূপশক্তি বা প্রকৃতি হল চিন্ময় প্রণব ।

পরমেশ্বরের ‘সৎ অর্থাৎ ‘সন্ধিনী’ শক্তি দ্বারা সমগ্র বহির্বিশ্ব ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। তাঁর ‘চিৎ’ অর্থাৎ সম্বিৎ শক্তি দ্বারা সমগ্ৰ অন্ত জগৎ ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। আর তাঁর আনন্দ অর্থাৎ হলাদিনী শক্তি দ্বারা সমস্ত প্রাণিকুল ও জীবকুল ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। তিনি পূর্ণ হয়েও সচ্চিদানন্দ স্বরূপে সমস্ত কিছুকে ব্যাপ্ত করে রয়েছেন । সমস্ত কিছুই তাঁর স্বরূপের ভিতর, তাঁর স্বরূপের বাইরে অধিষ্ঠিত কিছুই নেই ।

—পরিশিষ্ট—

— আমি—

আমি শাশ্বত চিরন্তন ৷

অপরিবর্তনীয় নিত্য সত্য।

আমি সমগ্র বিশ্ব কল্পনা করি

কল্পনা আমায় জানতে পারে না,

আমি অজড়, অমর, অমৃত।

আমি দ্রষ্টা, আমি জ্ঞাতা

আমি অনুভবকারী ও কল্পনাকারী—

আমি কোন সৃষ্ট-পদার্থ নই ।

সংসারে আমিই একমাত্র চেতন,

এই জগৎ আমাতে আবির্ভূত হয়—

আমাতেই স্থিতি লাভ করে—

আমাতেই বিলীন হয়।

সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়

এই সমস্ত নিয়ম

আমায় স্পর্শ করতে পারে না।

আমি মহাকাল,

ভূত বর্তমান ভবিষ্যৎ

আমায় স্পর্শ করতে পারেনা ।

আমি অচিন্ত্য অচ্যুত—

চিন্তাশক্তি দ্বারা

আমায় কেউ জানতে পারে না ।

আমি অসীম চৈতন্যময়—

আমি আশ্চর্য অদ্ভুত,

বাক্-শক্তি দ্বারা আমায় বলা যায় না।

আমি অজড় অমর চিরন্তন—

মননশক্তি দ্বারা

আমাকে জানা যায় না

আমি সবকিছু প্রত্যক্ষ করি,

সবকিছু অনুভব করি—

কেউ আমায় দেখতে পায় না

কারণ আমি দ্রষ্টা, দৃশ্য নই ।

আমি দেহকে অনুভব করি—

দেহ আমায় অনুভব করে না।

সমগ্র বিশ্ব আমাতে ওতপ্রোত,

আমি নির্ভরশীল নই—

আমি সবকিছুর আশ্রয় অবলম্বন ।

আমি নিত্যমুক্ত স্বাধীন,

আমি নিত্য নিরঞ্জন—

কোনকিছুআমায়

দূষিত কলুষিত করতে পারে না ।

জাগ্রৎ আমায় জানতে পারে না,

স্বপ্ন আমাকে দেখতে পায় না—

সুষুপ্তি আমায় বুঝতে পারে না।

এ-গুলোকে আমি কল্পনা করি—

আমিই কেবল আমাকে অনুভব করি ।

সমগ্র বিশ্ব আমার কল্পনা,

কেবল একজনেরই অস্তিত্ব আছে—

সে আমি ।

আমি অমৃত,

জন্ম-মৃত্যু আমায়

স্পর্শ করতে পারে না।

আমি সৃষ্টবস্তু নই,

আমার আবির্ভাব হয় না—

তিরোভাবও হয় না ।

আমি চিরসত্য চিদ্-ঘন—

জগৎ আমায় বলতে অক্ষম ।

আহার বিহার রমণ নিদ্রা

এরা আমায় স্পর্শ করে না।

সৃষ্টি পরিবর্তনশীল

রূপান্তরিত সর্বদা,

আবির্ভাব ও তিরোভাবে

আমি কিন্তু সৃষ্টিছাড়া।

অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ

আমায় জানে না,

আমি অদৃশ্য অজ্ঞেয়—

আমায় দেখা যায় না—

জানা যায় না ।

আমি দ্রষ্টা জ্ঞাতা অনুভব কৰ্তা ৷

আমি অসংখ্য কল্পনা করি—

ঈশ্বর আমার কল্পিত,

খোদা গড সমস্ত দেবদেবী

আমি কল্পনা করি ।

আমি সমগ্র বিশ্বের

নামকরণ করে থাকি—

বিশ্ব আমার নামকরণ

করতে পারে না ।

সমগ্র নাম-রূপ আমি

কল্পনা করি—

নাম-রূপ আমায়

জানতে পারে না,

আমি নাম ও রূপের প’রে ।

আমাকে জানা যায় না

আমি অজ্ঞেয়,

আমি সকল সত্যের সত্য

পরম সত্য।

আমি অর্জন করলে

বর্ধিত হই না

অর্জন না করলে

হ্রাস পাই না,

অনন্ত কর্মের ভিতর

আমি পূৰ্ণ ৷৷

[ ‘বাউল কথা’ জ্ঞান-ভাগ সমাপ্ত হল । ]