গুরুমহারাজ:— ‘অবধূত’ কথাটি সন্ন্যাস আশ্রমের একটা বিশেষ স্থিতি। অনেক ‘অবধূতে’-র কথা হয়তো তোমরা শুনে থাকবে। তবে শিব-অবতার বা শিব-স্থিতিতে থাকা অবধূতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজনের নাম তোমাদের অনেকেরই জানা_আর তিনি হোলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। অবধূতাচার্য দত্তাত্রেয়কে যোগী সম্প্রদায় আদি অবধূত হিসাবে মানে। কেউ কেউ ওনাকে সাক্ষাৎ শিব বলেও মনে করেন। উনি ২৪টি গুরুর কথা তাঁর শিষ্যদের নিকট উল্লেখ করেছিলেন, যেমন—পঞ্চ মহাভূত, পঞ্চ তন্মাত্রা, আকাশ, সূর্য, চন্দ্র এছাড়াও কামার, ব্যাধ, চিল, মৌমাছি ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকের কাছে তিনি কোনো না কোনো বিষয়ে শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং তা তিনি তাঁর নিজের জীবনে যোজনা করে সুফল পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এইগুলিকে বলার সময় গুরুরূপে উপস্থাপনা করেন। রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ এই পঞ্চ তন্মাত্রায় বিভিন্ন প্রাণীরা আকৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। তিনি মানুষকে বিভিন্ন তন্মাত্রার ব্যাপারে সাবধান হোতে শিখিয়েছিলেন। পৃথিবীর অপরিসীম সহ্য করার শক্তি তাঁকে অবাক করেছিল এবং তা তিনি জীবনে শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন মানুষ মল, মূত্র, আবর্জনা যা কিছু খারাপ —মাটিকে দেয় কিন্তু মাটি দেয় জীবনদায়ী ফসল—শস্য। জলকে তিনি দেখেছিলেন স্বচ্ছতার প্রতীক হিসাবে। কতকিছু তাকে অস্বচ্ছ করার চেষ্টা করে কিন্তু জল আবার নিজে নিজেই স্বচ্ছ হয় ! জল জীবন দান করে, জল জীবনে শান্তি দান করে—সাধু জলের মতো স্বচ্ছ হোক, পৃথিবীর মত সর্বংসহ হোক। তিনি অগ্নির নিকট শিখেছিলেন নির্বিকারত্ব এবং শুদ্ধত্ব। অগ্নি সবকিছুকেই পোড়ায়—চন্দন কাঠকেও পোড়ায় আবার বিষ্ঠাকেও পোড়ায় কিন্তু নিজে অবিকৃত থাকে, নিজে শুদ্ধ, পবিত্র থাকে। সাধু অগ্নির মতো নির্বিকার হোক, পবিত্র হোক। বাতাস সুস্থান কুস্থান সব স্থানের মধ্যে দিয়ে যায়, সুগন্ধ-কুগন্ধ সবকিছু গ্রহণ করে কিন্তু নিজে লিপ্ত হয় না। সাধু বাতাসের ন্যায় নির্লিপ্ত হোক। আকাশ উদার সবকিছুতে তার ছায়া পড়ে, কিন্তু কারও ছায়া আকাশে পড়ে না। সাধু আকাশের ন্যায় উদার হোক । সূর্য নির্বিশেষ। সবাইকে সমান আলো দেয়—সূর্যই সবাইকে প্রকাশিত করে কিন্তু কোনো কিছুই সূর্যকে প্রকাশ করতে পারে না। সাধু সূর্যের ন্যায় নির্বিশেষ হোক। চন্দ্র যেমন কলায় কলায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, আবার কলায় কলায় হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। অতএব জগতে চিরন্তন কিছুই নয়, সবই বিনাশশীল এবং পুনরায় তারপরেও তার প্রকাশের বা বিকাশের সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই সাধু জগতের সৌন্দর্য সম্বন্ধে সাবধান থাকবে কারণ তা চন্দ্রকলার ন্যায় ক্ষণস্থায়ী।
এইভাবে সকল সন্ন্যাসীর গুরুস্থানীয় অবধুতাচার্য দত্তাত্রেয়র শিক্ষা পরম্পরাগতভাবে সন্ন্যাসীরা মেনে চলার চেষ্টা করেন। এইগুলি ছাড়া কামারের কাছে তিনি শিখেছিলেন নিষ্ঠা। কারণ কামার একমনে তীর তৈরী করে থাকে, বাদ্যি বাজিয়ে একদল বরযাত্রী পাশ দিয়ে চলে গেলেও সে দেখতে পায়না। তার কর্মের প্রতি এতো নিষ্ঠা ছিল যে, কাজ শেষ না করে সে অন্য ব্যাপারে মন দেয়নি। যোগীর এইরূপ নিষ্ঠাই তাঁকে উত্তরণের পথে নিয়ে যায়। তিনি শিখেছিলেন ব্যাধের কাছে একাগ্রতার শিক্ষা। ব্যাধ জলাশয়ের তীরে তীক্ষ্ণ ফলা নিয়ে অপেক্ষা করছে একাগ্রচিত্তে, অনেকক্ষণ পর একটা মাছ এল আর সেটাকে গেঁথে ফেলল। যোগী শিখলেন একাগ্রতাই কৃতকার্যতার একমাত্র উপায়। চিলের কাছে শিখলেন—অশান্তির মূল ভোগ্য-বস্তুকে ত্যাগ করার শিক্ষা। একখণ্ড মাংস নিয়ে উড়তেই একপাল কাক “কা-কা” করে চিলটিকে উদ্ব্যস্ত করে তুলল। চিল গাছে বসতে পারছে না—নীচে নামতে পারছে না—উড়তে গেলে কাকেরা ঠোকর মারতে যাচ্ছে আর ক্রমাগত “কা-কা” করে বিরক্ত করছে। চিলটি মাংস-খণ্ডটি মুখ থেকে ফেলে দিল ! কাকের দল চিলকে ছেড়ে মাংসখণ্ডের পিছনে ছুটলো। চিল পরম নিশ্চিন্তে একজায়গায় বসে গা-চুলকাতে লাগল। যোগী শিখলেন কিভাবে ভোগের বাসনা ত্যাগ করে সমাজের মানুষের ঝামেলা এড়িয়ে নিজে শান্তি পাওয়া যায়।
অবধৃত মৌমাছির কাছে শিখলেন সঞ্চয়ের কুফল। হাজার হাজার মৌমাছি লক্ষ লক্ষ ফুল থেকে এক রেণু, এক রেণু মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে সঞ্চয় করেছিল ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু তাদের সঞ্চয় সম্পূর্ণ হোতেই একদিন একটি ভল্লুক এসে মধুসমেত মৌচাকটি ভেঙে নিয়ে চলে গেল। হাজার হাজার মৌমাছির সে কি আপশোস ! সাধু বুঝলেন সঞ্চয়ে বৃথা কালক্ষয় হয়। আর সাধুর জীবনে সঞ্চয়ই অশান্তির কারণ।
এইতো অনেকগুলো বলে ফেললাম, প্রার্থনার সময়(সন্ধ্যাকালীন প্রার্থনা)হয়ে গেল, তাই এখন এই পর্যন্ত থাক ৷৷
