জিজ্ঞাসু—আনন্দময়ী মা এতো উন্নত হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য সম্প্রদায় তাঁর বিরোধ করে – মানতে চায় না, এরকম কেন করা হয় –গুরুজী?

গুরুমহারাজ:— দ্যাখো, আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছে__সাধারণ মানুষের মানা না মানার কি মূল্য আছে ? সবাই যে তাঁকে মেনে নেবে না—এটা তো তিনি জানেন, তাই বিরোধ করেন না। আমি দেখেছি—করপাত্রীজী দশনামী সম্প্রদায়ের একজন মধ্যমণি ছিলেন, উনি আচার্য শঙ্করের reference দিয়ে নারীর বিরোধ করতেন । উনি বলতেন, ‘আত্মা পুরুষায় শাশ্বতে’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আত্মায় স্ত্রী-পুরুষ ভেদ নেই। এযুগে সারদা মা প্রথম দীক্ষা দিয়ে এটা প্রমাণ করে দেখালেন যে, নারীরও দীক্ষা দেবার অধিকার রয়েছে যদি তার জ্ঞান থাকে । আনন্দময়ী মা দীক্ষা দিতেন বলে করপাত্রীজী ওনার নিন্দা করতেন।

একদিন হয়েছে কি__ কোনো কারণবশতঃ করপাত্রীজী কনখলে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে এসে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন । ওনাকে আসন-জল ইত্যাদি দেবার পরেই আনন্দময়ী মা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ের কাছে বসে বয়স্ক সন্ন্যাসী করপাত্রীজীর প্রতি সন্তানভাব আরোপ করে তাঁর পদসেবা করতে শুরু করে দিলেন। করপাত্রীজী এতে খুবই প্রসন্ন হোলেন এবং নিজের কাজ মিটিয়ে মায়ের আশ্রম থেকে চলে গেলেন ‌ যাবার সময় হয়তো মনে একটু অহংকারও নিয়ে গেলেন। এই ঘটনায় মায়ের ভক্তরা খুবই ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তারা মনে মনে ভাবলো_এই ঘটনায় মা কতটা ছোটো হয়ে গেল ! ফলে তারা সকলে মিলে একজোট হয়ে আনন্দময়ী মায়ের কাছে গিয়ে__ মাকে ঐ সন্ন্যাসীর পদসেবা করার কারণ জিজ্ঞাসা করলো। মা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সন্তানের গায়ে ময়লা লাগলে মা-ই তো তাকে কোলে নেয়, ধুয়ে মুছে সাফ করে—মা কি তাকে ফেলে দেয় !’ দেখেছো তো __আধ্যাত্মিক ব্যক্তি বলতে কি বোঝায় ! এই জন্যই তো বলা হয়—”আধ্যাত্মিক জগতের বিচিত্র বিধান” !

জিজ্ঞাসু–হোলি উৎসবের কি কোনো ভাল দিক আছে ?

গুরুমহারাজ—ভালভাবে utilise করলে সব অনুষ্ঠানেরই ভাল দিক থাকে। ‘হোলি’ হোলো বসন্তোৎসব ! গোটা বিশ্বে নানান নামে নানান উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বসন্তোৎসব পালিত হয়। ভারতবর্ষে এটা ‘হোলি’ নামে পালিত হয়। ভারতবর্ষের প্রাচীন সংস্কৃতির ধারাটিই হোচ্ছে যে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠানের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতাকে জুড়ে দেওয়া ! এখানেও তাই হয়েছে, কৃষ্ণ-ভগবানের লীলা-কাহিনীকে স্মরণ-মনন করে মানুষ বসন্তোৎসবে মেতে ওঠে। নাচগান হয়—হৈ-হুল্লোড় করে, প্রচুর খাওয়া-দাওয়া হয়, পোশাক পরে –এইভাবেই তো অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তবে যদি hygienic দিক দিয়ে বা সামাজিক দিক থেকে দেখা যায়__ তাহলে বলা যায় যে, এই ধরণের উৎসব সৃষ্টির পিছনে নানান কারণ রয়েছে। যেমন ধরো, হোলির প্রাক্কালে যে চাঁচর হয়—এটা আবর্জনা পোড়ানোর ব্যবস্থা। শীতকাল মানুষকে কুঁড়ে করে দেয়। তখনকার দিনে মানুষের অভাব ছিল। রাজতন্ত্রে সাধারণ মানুষ কখনও ভাল থাকে না, সাধারণ মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ ও বাসস্থানের অভাব থাকে। তাই শীতে কষ্ট পায় নিচু তলার মানুষ।এবার শীত চলে গেলে মানুষ শরীরে উদ্যম পায়, নতুনভাবে আবার বাঁচার বা টিকে থাকার চিন্তা- ভাবনা শুরু করে। তাই জড়তাপূর্ণ পুরাতনকে বিদায় দেয় এইভাবে আবর্জনা পুড়িয়ে_হোলি উৎসব পালন করে।

এই উৎসবকে ফাগের উৎসব ও বলা হয়ে থাকে। ‘ফাগুয়া’ বা ‘ফাগ’ অর্থাৎ আবির আগে natural জিনিস দিয়ে তৈরী হোতো, এখন chemical মেশানো হোচ্ছে। তাই হোলিতে রং মাখার পর অনেকের মাথায় বা গায়ের skin-এ effect হয়।

যাইহোক, ওসব কথা পরে হবে__এখন বর্তমানের আলোচনায় ফিরে আসি। আগেকার দিনে বলা হোতো __ফাগ নাকি anti-pox ! ব্যাপারটা কিছুই নয়, ওইসব আবর্জনা পোড়ানো ছাইভস্ম মেখে ভাল করে স্নান করা—এই আর কি ! শীতকালে হয়তো ভাল স্নান হয় না—এই সুযোগে সেটা হয় । তবে বৃন্দাবনে হোলিতে খুবই ধূমধাম হয়। এখানে সাত্ত্বিকভাবে হোলি- উৎসব পালন করা হয়। বর্তমানে শান্তিনিকেতনেও সুশৃঙ্খলভাবে হোলি- উৎসব পালন করা হোচ্ছে।

আমাদের ওখানে কবিলপুর, বাঘনাপাড়া, কালনায় এইসময় বাজি পোড়ানো হয় – বহু লোক বাজিকরদের বাজির কারসাজি দেখতে জড়ো হয়।