জিজ্ঞাসু—ঈশ্বর এবং ব্রহ্ম কি সমার্থক ?

গুরুমহারাজ:— ভারতীয় প্রাচীন শাশ্ত্রাদিতে বলা হয়েছে_”ওঁ তৎসৎ” !! এটিকে ভাঙলে পাওয়া যায়, অ — উ — ম্ — তৎ — সৎ,
বিরাট—হিরণ্যগর্ভ—ঈশ্বর— তুরীয়—ব্ৰহ্ম,
বিশ্ব — তেজস— প্রাজ্ঞ—তৎপুরুষ—আত্মা।
দ্যআখও, “ব্রহ্ম” কি তা মুখে বলা যায় না, তাই ব্রহ্মকে বলা হয়েছে ‘অবাঙ্মনসগোচর’। মাঝে মাঝে সেই অনন্ত, অসীম, অব্যক্ত ভাব থেকে কোনো স্থুল শরীরে সীমায় ধরা দেন ! তখন সেই রস-স্বরূপ ব্রহ্মের একটু-আধটু আভাস পাওয়া যায় তাঁকে ঘিরে। এই যে অসীমের সীমায়িত নরতনু__একেই অবতার, যুগাবতার ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া হয় ইত্যাদি।

যেমন যাদুকরের স্বচ্ছ কাঁচ – তাতে যে যে ভাব আরোপ করে, তাই দেখতে পায়—কেউ বাঘ, কেউ হাতি। কিন্তু জানো_ এইরূপ অনন্ত ভাব আছে, অনন্ত ভাবময় পরমেশ্বর। এইজন্যেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, ‘যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ।’ ওনার কথাটা এইবার ঠিক ঠিক তোমরা সকলে বুঝতে পারবে।

অরণ্য আর বনের মধ্যে তফাৎ কি বলোতো ? অরণ্য natural, বহু গাছ-পালা, লতা-গুল্ম, ঔষধি-বনস্পতির সমাহার—দিগন্ত বিস্তৃত দুর্ভেদ্য। তার মধ্যে কতো জীবজন্তু, কতো গাছপালা___কে তার হিসাব রাখে ! আর ‘বন’ মানুষের সৃষ্টি, যেমন বাঁশবন, তালবন, তপোবন। এগুলি বিশেষ purpose-এ সৃষ্টি করা হয়েছে। ব্যাপারটা ধরতে পারলে কি !

সেইরূপ ঈশ্বর যেন ‘অরণ্য’ আর অবতারাদি ‘বন’ ! যাঁরা বিশেষ purpose serve করার জন্য অবতীর্ণ হ’ন। তাই সর্বব্যাপী, সর্বান্তর্যামী, পরম সত্যস্বরূপ, পরম চৈতন্যস্বরূপ এবং পরম আনন্দস্বরূপ সেই সর্বব্যাপী সর্বশক্তিমান ঈশ্বর-ই যখন ভোগায়তন শরীর নিয়ে যুগোপযোগী ভাব ধারণ করে জীব-জগতের কল্যাণার্থে আবির্ভূত হ’ন—তখন সেই শরীর নারীকে বলা হয় অবতার।

জিজ্ঞাসু—বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ’ এতো প্রকট যে বর্তমান মানবসমাজ অস্থির হয়ে উঠেছে! এরূপ হোচ্ছে কেন ?

গুরুমহারাজ:— এই যে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ_ এগুলি ঐ সমস্ত সম্প্রদায়গুলির ভিত নড়ে যাবার লক্ষণ। কিছু একটা হোলেই ‘গেল গেল’ রব উঠছে। সেইজন্য ধর্মীয় মৌলবাদ দিয়ে জোর করে নিজেদের মতবাদকে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে ! কিন্তু এইভাবে বেশি দিন মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে ধরে রাখা যায় না।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ষোড়শ শতকে নবজাগরণের ঠিক আগে খ্রীষ্টধর্মে ঠিক এইরূপ ব্যাপারই ঘটেছিল। সেদিনও মৌলবাদ দিয়ে জোর করে চারদিকের বিশৃঙ্খলাকে চেপে রাখার চেষ্টা করেছিল খ্রীষ্টান সমাজ অর্থাৎ চার্চের বিশপ ও পাদ্রীর দল। কিন্তু পারেনি—রেনেসাঁস হয়ে গেল। ইউরোপ- আমেরিকার উন্নত দেশগুলির জনগণ মৌলবাদকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে এসেছিল। বর্তমানে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা চার্চ এবং পোপকে মাথা থেকে নামিয়ে ফেলেছে। নাহলে ভাবতে পারো –কিছুদিন আগে (এটা ১৯৮৭-৮৮ সাল) নেদারল্যাণ্ডে প্রকাশ্য জনসভায় পোপ (দ্বিতীয় জন পল ) কে ডিম ছুঁড়ে মারলো ! ১০০ বছর আগে হোলে এটা ভাবা যেতো ?

সুতরাং প্রথম বিশ্বে মৌলবাদের আর জায়গা নাই—এইটা এখন তৃতীয় বিশ্বে এখন শিকড় গেড়ে বসেছে। আর শুধু গেড়ে বসা নয়_ প্রথম বিশ্ব ও দ্বিতীয় বিশ্ব যতো মৌলবাদের বাঁধন মুক্ত হোচ্ছে, তৃতীয় বিশ্ব ততো বেশী করে বাঁধন গলায় পরছে। এইজন্যই দেখবে ভারতবর্ষের ন্যায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এখন বিভিন্ন বিপন্ন ধর্মীয় নেতাদের আশ্রয়স্থল। যখনই কোনো ধর্মীয় নেতা বিপন্ন হবে—তারাই এসব দেশে পালিয়ে আসবে। এইভাবে ঐ ধর্মীয় নেতাদের আশ্রয়স্থল এখন তৃতীয় বিশ্ব ! আর এই দেশের মানুষের এমনই মানসিকতা যে, তারা সকলকে গ্রহণও করবে।

যাইহোক, কথা হচ্ছিলো সাম্প্রদায়িকতা সম্বন্ধে। দ্যাখো, পৃথিবীতে বিভিন্ন সম্প্রদায় থাকা স্বাভাবিক কিন্তু ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ব্যাপারটা একেবারেই ভালো নয়। তাই যে সমস্ত সম্প্রদায়_ মানবতাকে উপেক্ষা করে ধর্মীয় মৌলবাদকে জোর করে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে, সেখানেই ততো হানাহানি ও রক্তপাত হয়েছে।

ঐ ধরণের সম্প্রদায়গুলিতে যদি যুগোপযোগী বলিষ্ঠ নেতা না জন্মায় – তাহলে ধীরে ধীরে ওরা অন্য আদর্শকে গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। প্রাকৃতিক কারণেই তা হবে ! কারণ প্রকৃতি কখনও অসাম্য বা অস্থিরতা বেশিদিন চলতে দেয় না, সাম্যে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। মহাবিশ্ব প্রকৃতির নিয়ম আমি মিলিয়ে দেখি তো, এইজন্যই বলছিলাম কোনোকিছুর‌ই অস্থিরতা ভাল নয়।

কিছুদিন আগে একটা লেখকের বইকে কেন্দ্র করে বিশেষ একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ে সারা বিশ্বে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেল। এগুলো ভালো লক্ষণ নয়—চরম অস্থিরতা অসাম্যেরই লক্ষণ। বর্তমানে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিন্ন করে, কিছু দেশ কমিউনিষ্ট হবার পর ধর্মীয় কুসংস্কারগুলি পরিত্যাগ করছে। ঐ সমাজ- তান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি এখন ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসছে। আর তাছাড়া _প্রথম বিশ্বের তো বটেই, তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষিত সমাজ আজ আর ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আবদ্ধ নাই। তাই বলছি এখনও যদি কোনো বলিষ্ঠ ধর্মীয় নেতা বা মহাপুরুষ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ না করেন _ তাহলে শুধুমাত্র মৌলবাদ দিয়ে ঐ সমস্ত সমাজকে টিকিয়ে রাখা খুবই মুস্কিল !