এইটা একটা অন্যতম সহজ পন্থা ৷ মহাপুরুষদের শরীর ধারণের এইটা একটা অন্যতম করুনার প্রকাশ – সাধারণ মানুষকেও একেবারে ধারণার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া !!
এই যে কথাগুলি বলা হোলো – এই কথাগুলি কিন্তু হালকা কথা নয়, কথার কথা নয় – এটি বড় সাংঘাতিক কথা ! কত যোগী (কর্মযোগী, রাজযোগী, জ্ঞানযোগী) পৃথিবীর কোনো নির্জন প্রান্তে (বনে-জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে) সমাজের সমস্ত ভোগ-ঐশ্বর্য, স্নেহ-প্রেম-মায়া-মোহের বন্ধন ছিন্ন করে গভীর নিষ্ঠায় একাগ্রচিত্তে যোগে রত রয়েছেন ৷ আবার কত ভক্ত মানুষ – তাঁরা ধ্যান-জপ, পূজা-অর্চনা, যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদির দ্বারা তাঁদের আরাধ্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য জীবনপাত করে চলেছে – অথচ মহাপুরুষ বা অবতারপুরুষদের শরীর ধারণের সময় যত সাধারণ মানুষ তাঁর বা তাঁদের সংস্পর্শে আসতে পারেন – তারাই ওই মহাপুরুষদের কৃপার বাতাস, করুণার পরশ পেয়ে থাকে ৷ আর এটাই বিশেষ প্রাপ্তি ৷ ধ্যান-জপ, পূজা-অর্চনা, আসন-প্রাণায়াম কিছুই করতে হোলো না – একেবারে ধারণার স্তরে পৌঁছে যাওয়া ৷ এটা যে কতটা পথ অতিক্রমণ বা উৎক্রমণ – তা একমাত্র মহাপুরুষরাই বলতে পারবেন, সাধারণ মানুষ তার থই খুঁজে পাবে না।
এইজন্যেই ভগবানের ভক্তদের সাথে – অন্যান্য পথের সাধকদের ঠিক মেলে না ! কোথাও যেন একটু খটমট, কোথাও যেন একটু বোঝাপড়ার দৈন্যতা পরিলক্ষিত হয়। আপনি শ্রীরামকৃষ্ণকে, চৈতন্যকে, বুদ্ধকে ধ্যান করেন – পূজা-অর্চনা করেন, তাঁর স্তব-স্তুতি করেন – তাঁদের নিয়ে ভাষণ দেন, তাঁদের আদর্শ চারিদিকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টায় ব্রতী রয়েছেন – আপনি কত ত্যাগী – বৈরাগ্য অবলম্বন করেছেন – সংসার ত্যাগ করেছেন (অবশ্য সবক্ষেত্রে মন থেকে সংসার ভোগ-ঐশ্বর্যের মোহ ইত্যাদি যায় নি) – আর এ কিনা বলছে – ‘সে ভগবানের ভক্ত, তার একটু সেবা করার সুযোগ পেয়েছিল, তাকে ভগবান খুব ভালোবাসতো – মর্যাদা দিতো ৷’ – তাতে কি এমন হয়েছে ? আমি কত বড় – আমাকে কত লোকে মানে-গনে, কত লোকে প্রণাম করে – তা জানিস ? কত বড় বড় নেতা আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, কত বড় বড় শিক্ষিত মানুষ মাস্টার-প্রফেসর-বড় বড় অফিসার আমার কাছে এসে নত হয় – তা জানিস ?
কিন্তু এইসব দিয়ে আধ্যাত্মিকতার বিচার হয় না ৷ ভগবান যদি কোনো ব্যক্তিকে একটুখানি — সামান্য একটুখানিও কৃপাদৃষ্টি প্রদান করেন – তাহলেই তো হয়ে গেল ৷ সংসার আশ্রমের ভোগ-ঐশ্বর্যও যা, সন্ন্যাস আশ্রমের ভোগ-ঐশ্বর্যও তো সেই একই ! ওই লোহার শিকল আর সোনার শিকলের যা পার্থক্য – শুধু সেইটুকুই ! নারীসঙ্গ বর্জন বা ব্রহ্মচর্যের বড়াই – সেটাও তো খুব একটা ধোপে টিকবে না ! কারণ মন থেকে কি সমস্ত ইচ্ছা বর্জন হয়েছে ? আজ্ঞাচক্রে মদন কি ভস্ম হয়েছে ? সেখানেও গুরুমহারাজ বলেছিলেন – মদন ভস্ম হবার পর কামদেব ‘অনঙ্গ’ হোলেন, অর্থাৎ স্থূলে না থেকেও সূক্ষ্মে বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে থেকে গেলেন ৷ তাই একজন্ম কেন, দু-চার জন্মের ব্রহ্মচর্য রক্ষা করার পরও স্খলন হয়ে যেতে পারে ! আর এর উদাহরণ রয়েছে ভুরি ভুরি ! সুতরাং ‘সাধু সাবধান’! কোন বড়াই নয় – কোন হামবড়া ভাব নয়, নত থাকা – আনত থাকা , সদাসর্বদা “হরিসে লগন” লাগিয়ে রাখাই সঠিক পন্থা। যো সো করে মানবজীবনের উদ্দেশ্য(ঈশ্বর লাভ বা ঈশ্বরত্ব লাভ।।) সফল করাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ! বাকি সবই তো বকওয়াস্ ! – তাই নয় কি ?
যাইহোক, এইসব নিয়ে অনেক কথা হোলো – এবার ফিরে আসি গুরুজীর জিজ্ঞাসা-উত্তরের আসরের কথায়ৃ ৷ একজন জিজ্ঞাসা করে বসলেন – ” আচ্ছা গুরুজী ! ঈশ্বর যেমন পুরুষ পদবাচ্য, তেমনই ঈশ্বরীও তো রয়েছেন ৷ তাহলে আল্লাহ্, গড, ভগবান, পরমেশ্বর, উপরওয়ালা ইত্যাদি বোঝাতে কিন্তু পুরুষকেই বোঝায় – এটা কেন ?” গুরুমহারাজ এর উত্তরে বলেছিলেন – ” সেমেটিক বা সুমেরীয়দের ঈশ্বর-আত্মা ইত্যাদি সম্বন্ধে ধারণা এসেছে ভারতীয় আর্যসংস্কৃতির বিকাশের অনেক পরে ৷ সুতরাং ওইসব দর্শনের সাথে বেদান্ত দর্শনের বিস্তার ফারাক ! বেদে বলা হয়েছে “আত্মা পুরুষায় শাশ্বতে!” এখানে ‘পুরুষ’ শব্দটি কিন্তু ইংরেজির male অর্থে ব্যবহৃত হয়নি ৷ ‘পুরে’-র অধীশ্বর হিসাবে ধরা হয়েছে। যেমন দেহপুরের অধীশ্বর ‘আত্মা’, তেমনি এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডরূপ বিরাট শরীরের অধীশ্বর-কর্তা-নিয়ন্তা হলো ‘পরমাত্মা’ ৷ স্থূল অর্থে যে নারী-পুরুষের ভেদ – সেই ভেদ ‘আত্মা’য় নাই ৷ আত্মজ্ঞান লাভ হোলে ভেদ থাকে না ৷ বেদ বা উপনিষদের গুঢ়রহস্য বুঝতে না পেরে পরবর্তীতে বিভিন্ন মত বা পথের মানুষ পরমাত্মা স্বরূপ, পরমব্রহ্মকে ‘পুরুষ’ (male) বানিয়ে বসে আছে। কিন্তু ভারতীয় ঋষিরা ভগবতী, ঈশ্বরী – এইসব শব্দও ব্যবহার করেছেন এবং এই শব্দগুলির দ্বারা তাঁরা পরমাশক্তিকে বোঝাতে চেয়েছেন ৷৷
এইভাবেই পরমপুরুষ ও পরমাপ্রকৃতি _এই সব শব্দের মাধ্যমে ‘ব্রহ্ম’ এবং তাঁর ‘শক্তি’-কে বোঝানো হয়েছে।।
