জিজ্ঞাসু—তাহলে ‘হজ’ ব্যাপারটা কোথা থেকে এসেছে ?

গুরুমহারাজ:—বর্তমানের ‘জেলহজ্জ’ মাসে ‘হজ’ করার রীতি রয়েছে। বহু প্রাচীনকালে আরবে ইব্রাহিম নামে একজন নবী ছিলেন। তাঁর দুইজন স্ত্রী ছিল। একজনের নাম ছিল হজেরা এবং অপরটির নাম সায়েরা। প্রথম অবস্থায় ‘হজেরা’র কোনো সন্তানাদি হয়নি। তাই তিনি গভীর মনোদুঃখে কাল কাটাতেন। এদিকে সায়েরার গর্ভলক্ষণ দেখা দেওয়ায় তিনি(হজেরা) আরও ভেঙে পড়েন। তাঁকে খুশি করার ইচ্ছায় স্বামী ইব্রাহিম তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। তৎকালীন যুগে আরবের মরুভূমিতে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া ছিল দুঃসহ কষ্টের। দুপুরের দিকে উপযুক্ত আশ্রয় না পেলে পথচারীদের প্রাণসংকট উপস্থিত হোতো। কারণ একটাই—নিদারুণ উত্তাপ এবং ভয়ঙ্কর জলাভাব !

যাইহোক, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ওঁদের যাত্রাপথেই ‘হজেরা’ সন্তানসম্ভবা হ’ন। এতে ইব্রাহিম পড়েন উভয় সংকটে কারণ তিনি খবর জানতেন সায়েরাও পূর্ণগর্ভা । তাঁকে সাহায্য করাও যেমন তাঁর কর্তব্য তেমনি হজেরাও ধীরে ধীরে আসন্নপ্রসবা হয়ে উঠতে লাগলেন—তাঁকেও সঙ্গ দেওয়া তাঁর ততোধিক কর্তব্য ।

চলার পথেই একসময় বর্তমান মক্কার কাবাশরীফ যেখানে অবস্থিত সেখানে সাফা ও মারওয়া পর্বতের মধ্যবর্তীস্থানে নির্জন প্রান্তরে হজেরার শিশু সন্তান প্রসব হোলো। কিন্তু সদ্যোজাত শিশুপুত্র ও তার মাকে ঈশ্বরের (আল্লাহ) হাতে সমর্পণ করে ইব্রাহিম সায়েরার সাহায্যের জন্য তাঁর কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। সেই নির্জন মরুপ্রান্তরে অন্নকষ্ট এবং সর্বোপরি জলের অভাবে হজেরা বড়ই কাতর হোতে থাকেন। তাঁর দুর্বল শরীরে শিশুর একমাত্র আহার মাতৃদুগ্ধও শুকিয়ে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। কাতর প্রাণে ঈশ্বরের করুণা ভিক্ষা করতে থাকেন মা হজেরা। কোনো সাহায্যের আশায় শিশুকে কাপড়ের মধ্যে ভাল করে মুড়ে রেখে তিনি একবার ছুটে যান সাফা পাহাড়ের মাথায় । ওখান থেকে বহুদূর তাকিয়ে দেখেন সুবিস্তৃত বালিয়াড়িতে যদি কোনো ব্যক্তিকে অথবা কোনো ‘কাফেলা'(বণিকদের উটের সারি) দেখা যায়, যদি তাঁর স্বামী ইব্রাহিম ফিরে আসেন। আবার কাপড়ে জড়ানো শিশুপুত্রকে যদি শকুন বা কোনো প্রাণী কোনরূপ অনিষ্ট করে তাই পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে দৌড়ে নেমে আসেন তিনি। আবার ছুটে যান মারওয়া পাহাড়ের মাথায়—মুখে অনর্গল ঈশ্বরের স্তুতি, ব্যাকুলা জননীর যা একমাত্র আশ্রয়। ওখান থেকেও দূরের দিকে তাকিয়ে তিনি বালি আর শূন্যতা ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। আবার শকুন তাড়ানোর জন্য পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে নেমে এলেন নীচে। এইভাবে মোট ৭ বার তিনি ঐ দুই পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। [এখনও হজকারীরা ঐ দুই পাহাড়ের মধ্যে ‘দোয়া’ ও ‘জিগির’ করতে করতে ৭বার ছোটাছুটি করেন ও পাথর ছোঁড়েন।] শুধুমাত্র উপর‌ওয়ালার দেওয়া মাতৃত্ব শক্তির চিরন্তন মমতা ও স্নেহ-ই তাঁকে শক্তি যুগিয়েছিল এই অসাধ্য সাধন করার ! কিন্তু সাতবারের বারও যখন কাউকে দেখতে পেলেন না তখন তিনি হতাশ হয়ে পুত্রের কাছেই ফিরে এলেন। তারপর অবসন্ন দেহে প্রায় মূর্ছিতা অসহায় মাতা করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শিশুপুত্রের দিকে। মায়ের এই নিদারুণ করুণ অবস্থা এবং অপার্থিব স্নেহভরা দৃষ্টিই কি ঘটালো এই দুনিয়ায় এক মহান ও অলৌকিক সৃষ্টি ! মা হজেরা অবাক হয়ে দেখলেন—শিশু ইসমাইলের ছোট্ট ছোট্ট দুটি পা কাপড়ের আবরণ থেকে বেরিয়ে মরুপ্রান্তরে অনন্ত উষ্ণ বালুকারাশির মধ্যে মৃদু মৃদু আঘাত করছে—যেন মায়ের কোলে শিশু পরম নিশ্চিন্তে খেলা করছে। আর কি আশ্চর্য—শিশু ইসমাইলের পা যেখানে যেখানে আঘাত করছে, সেখান থেকেই মরুভূমি ভেদ করে উঠে আসছে সুশীতল পানি (জল)! মূর্ছিতাপ্রায় হজেরা চমক ভেঙে উঠে বসলেন, হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন সেই পবিত্র পানি—অঞ্জলি ভরে মুখে দিলেন—আঃ ! ঈশ্বরের করুণাই যেন বিগলিত হয়ে উঠে আসছে! নিজে দু’অঞ্জলি পান করে সন্তানের মুখেও এক অঞ্জলি দিলেন। শিশু ইসমাইলের মুখে স্বৰ্গীয় পবিত্র হাসি! উৎসারিত জল কিন্তু আর বন্ধ হয়নি—ধীরে ধীরে জল উঠতেই লাগলো। প্রথমটায় উত্তপ্ত বালিয়াড়িতে পড়েই সেই জলধারা শুকিয়ে যেতে লাগলো। সাবধানী মা হজেরা পবিত্র এবং প্রাণস্বরূপ এই জলকে সংরক্ষণ করার জন্য ঐ স্থানে চারিদিকে বালির বাঁধ দিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎসারিত পানিতে আবদ্ধ স্থানটি জলপূর্ণ হয়ে একটি কূপে পরিণত হোলো—সেইটিই আজকের ‘জমজম্’ কূপ। যার পবিত্র পানি স্পর্শ করা ও সংগ্রহ করাও হজের অন্যতম অঙ্গ।

মরুভূমির বুক চিরে জল বেরিয়ে আসতেই ওখানকার আকাশে উড্ডীয়মান পাখিরা ঐ স্থানটিতে যেতে থাকলো। মরুভূমির বুকে সামান্য জলও যে ওখানকার প্রাণীদের কতটা কাঙ্ক্ষিত তা এসব চিত্র থেকেই বোঝা যায়।

যাইহোক বহু দূর দিয়ে একদল বণিকের ‘কাফেলা’ যাচ্ছিলো এক দেশ থেকে অন্য এক দেশে বাণিজ্য করার নিমিত্ত। তাদের পরিচিত পথে হঠাৎ পাখীদের আকাশে পাক খাওয়া দেখে তারা নিশ্চিত হোলো যে, নিশ্চয় পাখীরা জলের সন্ধান পেয়েছে । কিন্তু এখানে জল এল কি করে ? কাফেলার মুখ ঘুরিয়ে তারা এলো ওখানে। এসে দেখলো শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে বসে আছেন মা হজেরা। মায়ের মুখে সব শুনে তারা নিশ্চয় করলো যে, এই শিশু নিশ্চয়ই কোনো মহাপুরুষ বা মহামানব হবেন– যাঁর দ্বারা এই শিশু বয়সেই এমন অসাধ্য সাধন হয়েছে ! অত‌এব পরবর্তীকালে এনার দ্বারা আরও কতো মানবকল্যাণমূলক কাজ সাধিত হবে। তাই তারা মা হজেরা ও ওই অলৌকিক শিশুর উদ্দেশ্যে কিছু খাদ্যদ্রব্য ও উপহার-সামগ্রী প্রদান করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেল । তবে তারা যাবার আগে বলে একথা বলে গেল যে, বাণিজ্য করে ফেরার পথে তারা আবার সেই স্থানে আসবে এবং জলের যখন ব্যবস্থা হয়ে গেছে তখন এখানেই তারা তাদের যাতায়াতের পথে বিশ্রামের জন্য আস্তানা গড়ে তুলবে।

এইভাবেই কালক্রমে ওখানে প্রথমে লোকবসতি এবং আরও পরে নগরীর পত্তন হয়েছিল। লোকমুখে হজেরা ও ইসমাইলের এইসব চমৎকারী ব্যাপার শুনে ইব্রাহিম এসেছিলেন পুত্রকে দেখতে—ফলে তখন আবার ওঁদের মিলন হয়েছিল।

এরপর থেকে ইব্রাহিম ও হজেরা ওখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন।কথিত আছে যে, ইব্রাহিম ও ইসমাইল ঘর বানানোর জন্য বালি সরাতেই নাকি ওখানে কোনো প্রাচীন নির্মাণের ধ্বংসাবশেষ পান এবং সেটাই ছিল আদি পিতামাতা আদম ও ইভের উপাসনা গৃহ । যার উপর হয়েছে আজকের কাবাশরীফ। নবী ইব্রাহিম ছিলেন ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ। তাঁর দুজন স্ত্রীর গর্ভজাত দুই সন্তান অর্থাৎ হজেরা-র গর্ভজাত ইসমাইল এবং সায়েরার গর্ভজাত পুত্র ইস্রাইল— এঁরা দুজনে দুটি পরম্পরার সৃষ্টিকতা। ইসমাইল পরম্পরায় কোরেশ বা কোরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হজরত মহম্মদ (সঃ)। আর ইস্রাইল থেকে মোজেস বা মুসার পরম্পরা ধরে আসেন ইশা বা যীশু। সুতরাং ইহুদি, খ্রীষ্টান এবং মুসলমান এই তিন ধর্মমতই কিন্তু ইব্রাহিম বা আব্রাহাম থেকে এসেছে। এইজন্যই ওল্ড টেষ্টমেন্টের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং কোরানের সৃষ্টিতত্ত্ব একই। এছাড়া ইহুদি বা খ্রীষ্টান এবং ইসলামীয়রা উভয়েই ইব্রাহিম বা আব্রাহামকে, ইসমাইলকে নবী বলে তো মানেই—এমনকি যীশুও মহম্মদের (সঃ) পূর্ববর্তী হওয়ায় ইসলামীয়রা তাঁকেও একজন নবী বলে মানেন।