জিজ্ঞাসু :–আপনি একবার বলেছিলেন শুচিবায়ুগ্রস্ততা ভাল নয়, এই ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন ? গুরুমহারাজ:—হ্যাঁ, শুচিবায়ুগ্রস্ততা একটা রোগ, mania। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শুচিবায়ুগ্রস্ততার সাথে কোনো না কোনো ভাবে sexual connection রয়েছে। হয় কোনো অপরাধবোধ কাজ করে অথবা dissatisfaction কাজ করে। এইজন্য দেখবে অল্পবয়সী বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তারা বেশী শুচিবায়ুগ্রস্তা হয়। এদের প্রচণ্ড ঠাকুর-ঠাকুর বাতিক থাকে কিন্তু বৈরাগ্য থাকে না। এটা একটা বিরাট ফাঁকি। নিজের অন্তর্জগতের কামনা-বাসনাকে এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা, overcome করার নয়। এই ধরণের ঘটনা ভারতীয় সমাজে প্রায়ই ঘটে থাকে, তাই বললাম। তবে অন্যদিক দিয়ে বিচার করলে ওদের করারই বা কি আছে_বলো? এরা সাধারণ মহিলা–ব্রহ্মচারিণী তো আর নয় ! দ্যাখো, অশিক্ষা আর অজ্ঞতা থেকেই কুসংস্কারের জন্ম হয়। ফলে একরাশ কুসংস্কার এদের নিত্যসঙ্গী হয়। এইভাবেই খানিকটা সমাজের চাপে, খানিকটা অজ্ঞতাবশতঃ কুসংস্কারের দায়ে এরা বিভিন্ন complex-এ ভোগে। এখনকার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা অবশ্য দেখা যাচ্ছে অনেকটা কুসংস্কারমুক্ত, বিভিন্ন complex থেকে বেরিয়ে আসছে। ফলে দেখবে আগামী দিনে এই ধরণের আচার আর অতটা প্রকট হবে না। তোমাদেরকে আমি আগে বলেছিলাম যে, ‘স্ব-ভাবে সকলে ঠিকই আছে_ সেখানে সবাই রাধা, শুধু ঢঙ বা ভঙ্গিমায় পার্থক্য।’ বাউলগানে আছে, ‘ইচ্ছা করে পরানডারে গামছা দিয়া বান্ধি’—কিন্তু তাই কি হয় ,পরাণকে কি গামছা দিয়ে বাঁধা যায় ? এইটাই ফাঁকি। মন দিয়ে ঈশ্বরকে ধরতে চাই, কিন্তু যা বাক্য ও মনের অতীত _তাকে কি এভাবে বাঁধা যায় ? তাকে ধরতে গেলে প্রাণে প্রাণ সংযোগ করতে হয়। বলতে পারো এটাই Spiritual Art বা আধ্যাত্মিক কলা।। জিজ্ঞাসু :—আচ্ছা গুরুজী! অনেক লোকই তো এখানে আসে- এরা সবাই কি ঈশ্বরবিশ্বাসী এবং এরা সকলেই কি ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্যেই আসে ? গুরুমহারাজ:—তা আসবে কেন ? বরং এখানে এমন অনেকেই আসে, যাদের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক আছে— কিন্তু তারা আদৌ ঈশ্বরে বিশ্বাসীই নয়। তারা আমাকে ভালোবাসে, ভারতীয় সংস্কৃতিকে ভালোবাসে_তাই আসে। অবশ্য আমিও তাদের ভালোবাসি। আচ্ছা _এমন কথা আমি কোথায় বা কখন বলেছি যে, ঈশ্বরে বিশ্বাস করলে তবে আমার কাছে আসবে, অন্যথায় এসো না। বরং আমি বলি যে, ঈশ্বরে বিশ্বাস করুক বা না করুক সে আত্মবিশ্বাসী হোক, সে বিবেকপরায়ণ হোক—তাহলেই হবে। তখন অন্তত তার দ্বারা সমাজের আর কোনো ক্ষতি হবে না। একজন ঈশ্বরবিশ্বাসী অথচ দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি অপেক্ষা ঈশ্বরে বিশ্বাসহীন নীতিজ্ঞানযুক্ত বিবেকবান ব্যক্তি লক্ষগুণে সমাজের পক্ষে ভালো – একথা আমি মুক্ত কণ্ঠে বলবো । এবার কথা হোচ্ছে, ঐ যে তুমি বললে ঈশ্বরলাভের ইচ্ছা—এমনটা বলা হয় বটে কিন্তু ঠিক ঠিক ভাবে বলতে গেলে বলা উচিত_ ‘ঈশ্বরত্বলাভের ইচ্ছা’। কারণ ঈশ্বর কোনো বাইরের বস্তু বা ব্যক্তি নয়—ঈশ্বর তোমার অন্তরেই অন্তর্যামীরূপে বিরাজমান। সুতরাং তাঁকে বাইরে খুঁজতে যাওয়া বোকামি, নিজের অন্তর্জগতেই খুঁজতে হয়। দ্যাখো, মানবজীবনে ঈশ্বর লাভের ইচ্ছা আসা কি মুখের কথা ? ঐটাই তো আসল—ওটা হোলে তো হয়েই গেল। একবার ঠিক ঠিক মুমুক্ষু হোতে পারলে তাঁকে আর খুঁজে বেড়াতে হবে না – তিনিই তোমার হাত ধরবেন। তাই ঈশ্বরত্বলাভের প্রথম শর্ত ‘মুমুক্ষুত্বম্’। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন_ ‘এইরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হোলে তখন জগৎসংসারের সবকিছু ‘আলুনি’ বোধ হয়।’ তা__ তোমরাও তো এখানে এসেছো, তোমাদের কি সংসারের সবকিছুতে আলুনি বোধ হয়েছে ? হয় নি –তাই তো ! তবু বিভিন্ন মানুষ এখানে আসে—অবশ্য‌ই তারা শান্তি পায় বলেই আসে। একটি গানে রয়েছে__’সাধুসঙ্গ নামে আছে পান্থধাম, শ্রান্ত হোলে তথায় করিও বিশ্রাম’। সাধুসঙ্গ করা ভালো, এতে মনের ময়লা দূর হয়, অন্তরে শান্তিলাভ হয়। এই যে তোমরা এখানে এসেছো, সাধুসঙ্গ করছো__এতে তোমাদের‌ও কল্যান হবে, তোমাদের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কারের শোধন হয়ে যাবে।।