জিজ্ঞাসু:—আদিম মানব বা Homo-habilis-এর পর থেকে আর evolution কথাটা না ব্যবহার করে কি manifestation কথাটা ব্যবহার করা উচিত ?

গুরুমহারাজ:—এখনকার Genetic Science-এর নতুন Theory-গুলিতে manifestation কথাটিই ব্যবহৃত হোচ্ছে। ঋষিরা বলেছিলেন ‘ব্রহ্ম’ কলায় কলায় প্রকাশিত হয়েছেন জড়রূপে এবং জীব- রূপে। তাঁরা যে ‘প্রকাশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তার ঠিক ঠিক ইংরাজী প্রতিশব্দ manifestation ! তবে তুমি যেটা বললে অর্থাৎ Homo-habilis-এর কথা, এরা প্রায় পশুর দলেই পড়ে, কেননা তাদের আকৃতিটাই যা পৃথক কিন্তু তাদের আচার-আচরণ পুরোটাই ছিলো পশুর মতো ।

Homo-habilis-দের থেকেই মনের ক্রিয়া শুরু হয় এবং পর পর ধাপে ধাপে মনোজগতের উন্নতি ঘটতে থাকে। অবশেষে evolution-এর শেষ ধাপে(হোমো স্যাপিয়েন্স)পৌঁছে সে মননশীল মানবরূপে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করলো ।

দ্যাখো গৌরবাবু, ঋষিরা কিন্তু জীবজগৎ কে এভাবে ভাগ করেননি। তাঁরা জড় থেকে সগুণ ব্রহ্ম পর্যন্ত সবকিছুকেই ‘ব্রহ্মের প্রকাশ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আধারের উপযুক্ততা অনুযায়ী অন্নময়, প্রাণময়,মনোময়, বিজ্ঞানময় এবং আনন্দময় __এই পঞ্চকোষের ক্রিয়ার পার্থক্য হয় । আর তাই জগতে সবকিছুর এইরূপ ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ _ ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি ?

জানো, evolution -এ জীব যখন প্রথম মাথা উঁচু করে আকাশ দেখতে পারলো _তখন থেকেই মনোজগতের বিকাশের ক্রিয়া শুরু হয়। এরাই মানুষের আদি অবস্থা ‌। বিজ্ঞানীরা এদেরকে নাম দিয়েছেন Homo-habilis । তৎকালীন সময়ে এরা জঙ্গলের বাইরে উঁচু জলার ধারে বসবাস করতো। এখন যে সমস্ত স্থানে এদের ফসিল বা চিহ্ন আবিষ্কৃত হোচ্ছে, সেগুলো এই ধরণের জায়গাতেই। তখনকার পরিবেশে ডাঁশ বা মাছির এতো উৎপাত ছিল যে, বড় বড় লোমওয়ালা প্রাণী ছাড়া নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল ছিল। জীবনধারণের জন্য বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমিষ আহারের উপরেই নির্ভর করতে হোতো। খাদ্যের দখল নিয়ে গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে প্রচণ্ড লড়াই হোতো। লড়াই-এর সময় এরা মুখে “আ-বু-বু-বু” করে একরকম শব্দ করতো আর জোরে জোরে বুক চাপড়াতো। আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে গরিলারা থাকে তারা এখনও এই ধরণের আচরণ করে থাকে।

এর পরের stage হোলো Homo erectus। এরাই প্রথম প্রাণী যারা সম্পূর্ণ খাড়া হয়ে দু’পায়ে দাঁড়াতে পেরেছিল। Homo-habilis-দের ধড় আর মাথা ছিল সংযুক্ত ফলে ওদের মুখ নীচের দিকে ঝুঁকে থাকতো, ফলে আকাশ দেখতে গেলে –ওদের কষ্ট করে দেখতে হোতো‌ ‌। কিন্তু Homo erectus-দের ধড় আর মস্তকের মধ্যে গলা বা ঘাড় এসে গেল, আর এই জন্যই এরা শরীর না বাঁকিয়ে শুধু গ্রীবা ঘুরিয়েই চারিপাশ _এমনকি ঊর্ধ্বাকাশও দেখতে পেলো। এই প্রথম ভালোভাবে আকাশ দেখলো তারা—এইভাবেই জীব সর্বপ্রথম বিশালতার স্পর্শ পেলো !

Homo erectus-রা পুনরায় জঙ্গলে ফিরে গেল এবং গাছের কোটরে বা উঁচু স্থানে বাস করতে লাগলো। সেখানে তারা মাছ-মাংস অর্থাৎ আমিষ আহার ছাড়াও পুনরায় ফুল-ফল-পাতা বা সব্জিকে খাদ্য হিসাবে ফিরে পেল। এইসময় থেকেই তাদের সমাজজীবনে নারীর ভূমিকার একটা প্রাধান্য দেখা গেল। পুরুষেরা জন্তু-জানোয়ার শিকার করার কাজে অথবা অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই-এর কাজে সারাদিন সময় কাটাতো, আর নারীরা বাচ্ছাদের বা বৃদ্ধদের দেখাশোনা করতো- আহতদের শুশ্রূষা করতো- অবসর সময়ে ফুল-ফল, শাক-সব্জি আহরণ করে নিয়ে আসতো। ফুল-ফল-সব্জি জোগাড় করার সময় সেইগুলো খাদ্য হিসাবে গ্রহণযোগ্য কিনা তা তারা অন্য জীব-জন্তুর খাওয়া দেখে অথবা নিজেরাই মুখে দিয়ে তা পরীক্ষা করে তবেই নিয়ে আসতো। অর্থাৎ তখন থেকেই পরিবারের জন্য নারীর sacrifice-এর ভাবটি পরিলক্ষিত হোতে শুরু করেছিল।

এবার কোনোদিন হয়তো পুরুষেরা সারাদিন গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ঝামেলা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে, খাদ্যের সন্ধান করা হয় নি বা হয়তো শিকার পায়নি—শ্রান্ত-ক্লান্ত-হতাশ হয়ে ডেরায় ফিরে এসেছে । কিন্তু এসে দেখতো যে, নারীরা কিছু খাদ্য জোগাড় করে, সকলের জন্য সেগুলি পরিবেশন করে সাজিয়ে রেখেছে। নারীকে অন্নপূর্ণা বলা হয়েছে এই জন্যেই। অসময়ের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখার প্রবৃত্তিটা এদের বহুকালের অর্থাৎ যখন থেকে সমাজজীবন শুরু হয়েছিল প্রায় তখন থেকেই নারীর এই অদ্ভুত মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়।

এরপর কি কাণ্ড ঘটেছিল জানো_ নারীরা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে দেখে এই প্রথম পুরুষেরা সময় পেল “চিন্তা” করার ! জীবন সম্বন্ধে বা পরিবেশ সম্বন্ধে চিন্তা শুরু হোলো সেই তখন থেকেই। এর আগে পর্যন্ত তাদের শুধুই ব্যস্ত থাকতে হোতো খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্যগ্রহণ আর অন্তঃপ্রজাতি বা আন্তঃপ্রজাতির সঙ্গে সংগ্রাম নিয়ে। এবার শুরু হোলো জগত নিয়ে -জীবন নিয়ে মাথা ঘামানো। বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নানান পরিকল্পনা মাথায় আসতে লাগলো তাদের। জঙ্গলের আবাস ছেড়ে দিয়ে তারা চলে এলো নদীর তীরবর্তী কোনো উঁচু স্থানে, শুরু হোলো ‘গৃহ নির্মাণের কাজ, স্থায়িভাবে খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষির কাজ, পশুপালন ইত্যাদি নানান কাজ। ভিন্ন ভিন্ন মত ও প্রকৃতি অনুযায়ী ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে তারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো ! এইভাবেই শুরু হয়েছিলো migration !

তখন পৃথিবীর স্থলভাগ অখণ্ড ছিল। ফলে পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত চলল migra tion। Migrate করতে করতে যে যেখানে স্থায়িভাবে বসতি স্থাপন করেছে, আজকে আমরা তাদেরকেই সেই দেশের অধিবাসী হিসাবে পাচ্ছি। দেশ, কাল, জলবায়ু, পরিবেশের ভিন্নতায় হয়তো তাদের বর্ণ, শারীরিক গঠন গিয়েছে বদলে কিন্তু আদতে তারা প্রায় একই প্রকারের ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানীরা ঐ অবস্থার মানুষদের বলছে—নিয়েনদ্রেথাল ম্যান। এরাই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে migrate করেছে সবচাইতে বেশি। এদের আকৃতি ছিল প্রায় বর্তমান মানুষেরই মতো অর্থাৎ আদি Human বলতে গেলে এদেরকেই বলতে হয়।

যাইহোক, এসব তো গেল পুরোনো কথা, এবার এখন নতুন কথা শোনো। রাশিয়া বা অন্যান্য কয়েকটি দেশ চেষ্টা করছে, Homo-habilis থেকে Human-এর যে বিবর্তনক্রম, এইটার ঠিক reverse ক্রমে যদি কোনো মানুষ বা Human-কে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে নিশ্চয় তাকে Homo- habilis-এ রূপান্তরিত করা যাবে। এরফলে হয়তো মনুষ্যবুদ্ধিসম্পন্ন অথচ অতিমানবিক শক্তিসম্পন্ন একটা জীব সৃষ্টি করা যাবে। এদের দিয়ে অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ এসব সহজেই করানো যাবে। এই theory-র উপর কোনো কোনো দেশ Science Fiction ধরণের কিছু film-ও বের করেছে । মহাভারতের যুগে এই ধরণের research-এর ফল ছিল ঘটোৎকচ্। ঘটোৎকচকে দিয়ে কোনো সৃজনমুখী কাজ যখন হোলোনা _ তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে কৌশলে নিধন করালেন, অর্থাৎ ঐ ভুল reaserch-টাকে নষ্ট করে দিলেন। তবে, বহু সুচিন্তক এবং বিজ্ঞানিগণ এই ধরণের research-এর তীব্র বিরোধিতা করছে—এটাই আশার কথা। প্রকৃতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলেই মানুষের সর্বনাশ ত্বরান্বিত হয়, এটা পূর্বে-পূর্বেও হয়েছে, এখনও তা হবে।

তোমরা কখনই ভেবোনা – বর্তমানের সভ্যতাযুক্ত এই যে জগৎ তোমরা দেখছো অর্থাৎ যার বয়স মাত্র আড়াই-তিন হাজার বছর, এটাই একমাত্র সভ্যতা !! পূর্বে পূর্বে এই পৃথিবীতেই এই রকম কত সভ্যতার পতন হয়ে গেছে —যার কোনো record-ই বর্তমানে নেই।

রামায়ণ-মহাভারতের যুগেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কতো research হয়েছিল ! সে যুগেও Test-tube baby ছিল, এমনকি laboratory-তে বিকল্প মাতৃগর্ভেরও ব্যবস্থা ছিল। মহাভারতে পাবে গান্ধারীর সন্তানেরা অলাবুর মতো একটি ঘৃতকুম্ভের মধ্যে ১০ মাস ১০ দিন ছিল—মাতৃজঠরে নয়। মাতৃগর্ভের স্পর্শ না পাওয়ায় দুর্যোধনেরা কি হৃদয়হীন ছিল বলোতো ! ব্যাসদেব এসব বিজ্ঞান জানতেন। তিনিই experimentally এসব করেছিলেন। তাছাড়া রামচন্দ্রেরা চার ভাই যজ্ঞ থেকে জাত, ধৃষ্টদ্যুন্ম- যাজ্ঞসেনী এরাও তাই ! এগুলোকে কি বলবে? এগুলি ঋষিদের বিভিন্ন প্রকার research-এর ফল নয়কি ? কিন্তু মানুষ বিজ্ঞানের শুভপ্রয়োগ অপেক্ষা অশুভ প্ৰয়োগ বেশী করে থাকে – সে যুগেও এইটাই হয়েছিল। তাই ভগবানকে স্বয়ং আসতে হয়েছিল ভূভার হরণ করার জন্য।

সুতরাং আজকেও যদি তোমাদের বিজ্ঞানের গবেষণা প্রকৃতিবিরুদ্ধ হয় বা প্রকৃতির নির্দিষ্ট ছন্দের পরিপন্থী হয়, তাহলে আবারও একবার মানবসভ্যতা ধ্বংস হবে।।