গুরুমহারাজ:—কে বললো তোমাকে যে, আমার এই পোশাক জবড়- জঙ্গ ? তুমি কি কখনো পরে দেখেছো—যে বুঝবে ! অন্যান্য যে কোনো পোশাকের চেয়ে এই পোশাক comfortable, স্বাস্থ্যকর এবং সুবিধাজনক। খাঁটি ভারতীয় পোশাক এটা —আমি কোঁচা দেওয়া ধুতি কাপড় তো পরিনি ! লুঙ্গির মতো করে নিয়ে আধখানা কাপড় পড়েছি—তাও কাটা কাপড়, সেলাই করা নয়। এর ফলে এটা পড়ে হাঁটা-চলায় আমার কোনোই অসুবিধা হয় না । তুমি আমার সাথে হাঁটতে বা ছুটতে পারবে না। তুমি হয়তো দেখনি—বিভিন্ন ক্যারাটে মাষ্টাররা, নিনজা বা সাওলিনের শিক্ষকরা এই ধরণের পোশাকই ব্যবহার করেন। এই পোশাক পড়ার শিক্ষা বৌদ্ধ পরম্পরা থেকে এসেছে। বৌদ্ধগুরুরা, এমনকি ভগবান বুদ্ধও এইভাবেই পোশাক পরতেন। এই পোশাকটির সবচাইতে বড় সুবিধাটা কি জানো—এটা যত তাড়াতাড়ি পরে ফেলা বা খুলে ফেলা যায়, অন্য কোনো পোশাকে তুমি তা করতে পারবে না। আমি ২ মিনিটেই ready হয়ে যেতে পারবো, অথচ তখন দেখা যাবে তুমি হয়তো প্যান্টের বোতাম আটকাচ্ছো কিংবা গলার টাই-টা ঠিক করছো—ব্যাপারটা বুঝতে পারলে স…. __ কি বলতে চাইলাম!
ভারতীয় ঋষি-পরম্পরা যে পোশাক নির্বাচন করেছেন তা কি কখনও খারাপ হোতে পারে ? জানবে, নিশ্চয়ই তা সবদিক থেকেই সুবিধাজনক। যদি মূল্যের বিচারে আসতে চাও—তাহলেও দেখবে যে, minimum cost-এ আমি সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক পোশাকটাই পরতে পারছি। আর এই গেরুয়া রঙ—এটা ত্যাগের প্রতীক। এই রঙের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই তোমার অশান্ত মন শান্ত হবে— তোমার অস্থির ও উষ্ণ মস্তিষ্ক শীতল হবে। ভারতীয় প্রাচীন চিন্তাধারাগুলোর ভালো দিকগুলো খুঁজতে চেষ্টা করো, দেখবে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁদের চিন্তাধারা ছিল কি নিখুঁত এবং কত সূক্ষ্ম ও সুন্দর।
জিজ্ঞাসু:—মানুষের জীবনে নিদ্রার কতটুকু প্রয়োজন—বিশেষত সাধকের জীবনে ?
গুরুমহারাজ:—নিদ্রা বা আহারগ্রহণ এগুলিকে কখনই সার্বজনীনভাবে কোনো ঘড়িধরা নিয়মে আনা যায় না। মোটামুটি এইরকম হোলে ভাল হয় —এমন বলা যায়। তাই সাধারণ মানুষ বা সাধক যে কারও ক্ষেত্রেই হোক না কেন—শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ চেষ্টা করলে নিজেই বুঝতে পারবে যে, কোন্ জিনিসটি তার কতটা প্রয়োজন।
দ্যাখো, দিনরাতই তো কেউ ঘুমায় না, আর ২৪ ঘণ্টাই কেউ খেয়েও যায় না! কার শরীরে কোন্ জিনিসটার কতটা প্রয়োজন, তা নিজেকেই বিচার করে নির্ধারণ করতে হয়। সাধারণত যারা দৈহিক পরিশ্রম বেশী করে, তারা একটু বেশী পরিমাণ আহার করবে অথবা বেশীক্ষণ বিশ্রাম নেবে। আর যারা দৈহিক পরিশ্রম বেশী করে না, তারা কম পরিমাণ আহার গ্রহণ করবে বা কমসময় বিশ্রাম করবে। শারীরিক পরিশ্রম হোচ্ছে না অথচ কেউ বেশী খাচ্ছে বা বেশী ঘুমাচ্ছে __তাহলে কি হবে ? সেই ব্যক্তির খাবার digest হবে না তাছাড়া সবসময় শরীর ম্যাজ ম্যাজ করবে, অলসতা আসবে _এইসবই তো হবে।
খাওয়া আর ঘুম-এর ব্যাপারটা শিশুদের কাছে শিখতে হয় ! শিশুরা খিদে পেলেই চিৎকার করে কাঁদে, আবার খাবার খেয়ে পেট ভরে গেলেই চুপ করে যায়। তাকে আর এক ঝিনুক দুধও খাওয়াতে পারবে না, জোর করে খাওয়ালেও সাথে সাথেই বমি করে দেবে। আবার শিশুর নিদ্রাকর্ষণ হোলে ঠিক ঘুমিয়ে যাবে কিন্তু ঘুম ভাঙলেই একেবারে সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা ছুঁড়ে খেলা করতে শুরু করবে। শিশুরা কখনোই আলসে ব্যক্তির মতো ঘুম ভাঙার পরও শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে না।
খাওয়া এবং ঘুমের এইটাই সঠিক নিয়ম। যেদিন যেমন ক্লান্তি সেদিন তেমন বিশ্রাম। যখনই নিদ্রাভঙ্গ হবে তখনই স্প্রিং-এর মতো লাফ মেরে উঠে পড়বে এবং নিত্যকর্মে লেগে পড়বে। পশুদের মধ্যে কুকুরের কাছে যোগীরা এই শিক্ষা গ্রহণ করেছে। বলা হয় ‘ষট্ শুনঃ’, অর্থাৎ কুকুরের ছটা গুণ যোগীরা নিয়েছে। কুকুরের স্বভাবে রয়েছে দেখবে কোনো কাজ নেই তো _ পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে কিন্তু সামান্য খুট্ করে শব্দ হোলেই সঙ্গে সঙ্গে উৎকর্ণ ! প্রয়োজনে একেবারে ছুটে বেরিয়ে যাবে। যেন সর্বদাই alert, সর্বদাই ready !
মহাভারতের যুগে অর্জুনের এই গুণ রপ্ত ছিল, তাই তাকে বলা হোতো “গুড়াকেশ” অর্থাৎ জিতনিদ্র।।
