গুরুমহারাজ:—হ্যাঁ-হ্যাঁ, এটা খুবই সম্ভব। খাদ্যগ্রহণ না করে বহু বছর সুস্থ শরীরে বেঁচে রয়েছে এমন যোগীর দেখা এখনও মেলে। হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে তো খুবই আছে, খুঁজলে সমভূমিতেও পাওয়া যাবে।
দক্ষিণভারতের(অন্ধ্রপ্রদেশ)বালযোগীর কথা paper-এ বেরিয়েছিল ছবিসমেত, উনিতো প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর একই আসনে সমাসীন। আহার, নিদ্রা বা অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া ছাড়াই তাঁর শরীরের growth-ও হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের ছবিসহ reporting বেরিয়েছিল ওখানকার কাগজে। আমাদের আশ্রমের দক্ষিণভারতের ভক্তরা এক copy কাগজ আশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি এখানকার(বনগ্রাম আশ্রমের)সকলকে দেখিয়েছি সেটা।
জানো, সাধনকালে যোগীর নিদ্রা কমে যায়,আর যোগের চূড়ান্ত অবস্থায় নিদ্রার প্রয়োজনই হয় না। প্রকৃতপক্ষে ধ্যানেই শরীরের প্রকৃত বিশ্রাম হয়। নিদ্রা অপেক্ষাও ধ্যানের গভীরে শরীরের বিশ্রাম করে নেবার কৌশলই জিতনিদ্র অবস্থা। লক্ষ্মণ, অর্জুন ইত্যাদি বিভিন্ন রথীদের এই কৌশল জানা ছিল।
তবে লক্ষ্মণের খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারটা কেমন ছিল_ সেইটা বোঝাতে আমি একটা গল্প বলছি শোনো ! এক সন্ন্যাসী উপযুক্ত গুরুর খোঁজে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কারণ তার উপর দৈব নির্দেশ ছিল যে, যে ব্যক্তি কখনও খায়নি, কখনও স্ত্রীসঙ্গ করেনি—সেই হবে তার গুরু। ‘এমন গুরুর সন্ধান কোনো নির্জন স্থানেই মিলতে পারে, নিশ্চয়ই লোকালয়ে নয়’_এই ভেবে সে বনে- জঙ্গলে-নদীতীরবর্তী স্থানে-পাহাড়ে-পর্বতে গুরুর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। একদিন এক নদীর তীরে একটি কুটির দেখতে পেয়ে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় সাধুটি আহার্য বা পানীয়ের নিমিত্ত সেখানে গেল। মনে একটু আশাও ছিল –হয়তো এখানে কোনো সন্ন্যাসী বাস করে, হয়তো সেই তার দৈব নির্দেশিত গুরুও হোতে পারে ! কিন্তু ঘরের সামনে গিয়েই সে হতাশ হোলো। কারণ সে দেখলো গৃহস্বামী একজন গৃহস্থ, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার নিয়ে সংসার পেতে বসে রয়েছে। দৈবনির্দেশ অনুযায়ী স্থানটি এইরকম ছিল ভেবে যতটা খুশি সন্ন্যাসীটি হয়েছিল, বৃদ্ধ সংসারীটিকে দেখে সে ততোটাই হতাশ হয়ে পড়লো। কিন্তু তার অন্তর্জগতে এই সব ভাবনা যখন চলছে, সেই সময় হঠাৎ সে দেখলো— গৃহস্বামী গৃহ থেকে বাইরে বেরিয়ে তার সামনে এসে সাদরে তাকে আহ্বান করছে এবং সে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর, অতএব তাকে আহার্য ও পানীয় গ্রহণের জন্য সানুনয়-অনুরোধ করছে। সন্ন্যাসী ঐরকম গৃহস্থ বাড়ি দেখে__ খাবার ব্যাপারে প্রথমটায় আপত্তি করছিল কিন্তু বৃদ্ধের আন্তরিক আপ্যায়নের কাছে তার কোনো ওজর-আপত্তি টিকলো না ! ভিতরে যেতেই ও দেখলো গৃহকর্তা যেন আগে থেকেই জানতো যে, সে আসবে এবং তার জন্য যেন গৃহস্থটি একেবারে ready-ই ছিল। কারণ ও দেখলো খাবার গ্রহণের জন্য দু’খানা আসন পাতা রয়েছে, দু’খানা থালায় ভাত-তরকারি সাজানো রয়েছে, এমনকি দুটো গ্লাসে জলও রয়েছে।
ক্ষুধার্ত সন্ন্যাসী আসন গ্রহণ করেই তাড়াতাড়ি গণ্ডুষ করে খাদ্য গ্রহণ করতে যাবে _এমন সময় হঠাৎ গৃহস্বামী বলে উঠলেন,“মহাত্মন, আপনি খাদ্য স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করুন, কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, আপনার মাথার উপর যে খাঁড়াটা ঝুলছে, ওটা যে কোনো সময় আপনার ঘাড়ে পড়তে পারে।” সন্ন্যাসী উপরে তাকিয়ে দেখলো—সর্বনাশ ! সে যেখানে বসে আছে, ঠিক তার উপরে প্রকাণ্ড একটা খাঁড়া সরু একটি সুতোর সঙ্গে বাঁধা রয়েছে, তাও সেটাকে আবার নড়ানো হোচ্ছে। খাঁড়াটির তীক্ষ্ণ ধার একেবারে চক্চক করছে, ফলে যে কোনো মুহূর্তে সুতো ছিঁড়ে খাঁড়াটি তার ঘাড়ের উপর পড়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিতে পারে। এদিকে সে গণ্ডুষ করে ফেলেছে, ফলে খাদ্য-ত্যাগ করে উঠে পড়া মানেই পুনরায় উপবাস। কয়েকদিন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকার পর হাতের মুঠোয় খাদ্য ও পানীয় পেয়েছে _একে ছাড়েই বা কি করে ! এক নিদারুণ সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়ে ‘জয়-মা’ বলে সন্ন্যাসী উপরের দিকে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে হাতের সাহায্যে আহাৰ্য্য কোনোক্রমে মাখিয়ে খাদ্য গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করতে লাগলো। কোনক্রমে খাওয়া শেষ হোতেই—শেষে গণ্ডুষ করে সড়াক্ করে এক প্রকাও লাফ মেরে সরে এসে সন্ন্যাসী বলে উঠলো – “বাবা বাঁচলাম! উঃ- কি সাংঘাতিক লোকমশাই আপনি ! আপনাকে দেখে তো অতটা বুঝিনি ?” গৃহস্বামী বললেন “বুঝতে আপনি অনেক কিছুই পারেন নি, সে যাইহোক এখন বলুন তো কেমন খেলেন ? ঝোলটা কেমন হয়েছিল, সুক্তোটায় কি কি দেওয়া হয়েছিল – বলুন দেখি ?” সন্ন্যাসী বলল, “কি জানি মশাই—কি কি রান্না হয়েছিল আর তাদের স্বাদ কেমন ছিল, এসবের কোন স্বাদ-গন্ধ আমার মনে নেই ! আমার সম্পূর্ণ একাগ্রতা ছিল ওই খাঁড়াটির উপর _কেন না যদি সুতো কোনো কারণে ছিঁড়তো, তাহলে যেন আমি সরে আসতে পারি_বুঝথষতে পেরেছেন ?” সন্ন্যাসী বললেন, “তাহলে বৎস ! বিশেষ পরিস্থিতিতে, প্রাণসংকট অবস্থায় খাঁড়াটির অবস্থানের প্রতি যেমন সুতীব্র একাগ্রতা তোমার মধ্যে তৈরী হয়েছিল, যার ফলে দীর্ঘ উপবাসের পর গ্রহণীয় আহার্যও তোমার নিকট তুচ্ছ হয়ে গেছে, স্বাদহীন হয়ে গেছে _ তেমনি যদি কারও ঈশ্বরের প্রতি সদা-সর্বদা এইরূপ একাগ্রতা নিবদ্ধ থাকে, তিনি খাদ্যগ্রহণই করুন আর সংসারই করুন—কোনো কিছুরই taste তাঁর মধ্যে থাকে না ! তিনি সদাসর্বদা নির্লিপ্তই থাকেন।”
যুবক সন্ন্যাসীটি এই কথা শুনে একেবারে অভিভূত হয়ে গেল। তখন ঐ বৃদ্ধ গৃহস্থ তাকে বললেন, “বৎস ! আমিই তোমার সেই নিদিষ্ট গুরু, তোমার জন্যই আমি এখানে সংসার পেতে বসেছিলাম। পূর্ব সংস্কারবশতঃ তোমার মনের মধ্যে গৃহস্থদের প্রতি ঘৃণাভাব জন্মেছিল। এটা সাধনপথের খুবই অন্তরায়, তাই তোমার চৈতন্য আনার জন্যই এই আয়োজন।” সন্ন্যাসীটি নিজের ভুল স্বীকার করলেন এবং তাঁকে গুরু বলে মেনে নিয়ে তাঁর নির্দেশিত পথে চলে আপনার অভীষ্ট সিদ্ধ করলেন।
গল্পটা তো শুনলে _তাহলে এবার এখান থেকে কি বুঝলে বলো তো ! এখান থেকে এটাই বোঝা গেল যে, যিনি প্রকৃত যোগী অর্থাৎ সদা-সর্বদা যাঁর সঙ্গে ঈশ্বরের যোগ রয়েছে তাঁর কোনো কর্মেই আসক্তি নেই ! এইরূপ ব্যক্তির ‘কর্মে অকর্ম’ হয় এবং তাঁকে তাঁর কৃত কর্মের জন্য কোনো কর্মফল ভোগ করতে হয় না।
আমার গুরুদেব রামানন্দজী বলতেন, “খাও-পিও, চাখো মৎ”। লক্ষ্মণের ক্ষেত্রে এটাই হোতো। রাম এবং সীতাকে জঙ্গলের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করা এবং যতটা সম্ভব তাঁদেরকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখার যে গুরুদায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন, সেটাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য লক্ষ্মণ সদা-সর্তক থাকতেন। ফলে তিনি ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য বা শরীর রাখার জন্য—দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহার্য্য গ্রহণ করতেন ! বনবাস চলাকালীন খাদ্যের taste গ্রহণ করে খাওয়া হোতো না। নিদ্রার ব্যাপারটাও ঐ রূপেই হোতো, বিশ্রাম নিতেন ঠিকই কিন্তু তিনি সদা-সতর্ক থাকতেন ! সামান্যতম শব্দেও তিনি ছুটে আসতেন রামের কাছে। এই অবস্থাটাকেই নিদ্রাহীন বা খাদ্যহীন অবস্থা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ….. [ক্রমশঃ]
