গুরুজী:—দ্যাখো, easy-chair-এর বাংলা অর্থ হোলো আরাম-কেদারা। কিন্তু আরাম বা কেদারা—এ কথাগুলি আবার ফার্সি শব্দ ! একটি বিদেশী শব্দের বাংলা করা হোচ্ছে অন্যান্য বিদেশী শব্দ দিয়ে—ব্যাপারটা বেশ মজার না ? মুসলমানেরা এদেশে আসার আগে পর্যন্ত ভারতীয়রা বসার জন্য এই ধরণের কেদারা বা কুর্সি ব্যবহার করতো না। ভারতীয়দের ছিল আসন—কুশাসন(কুশ নির্মিত আসন), কোনো শক্ত ঘাস বা পাতা দ্বারা নির্মিত আসন, পশুলোমের দ্বারা তৈরী আসন, এছাড়া চর্মাসন(হরিণের চামড়া-বাঘের চামড়া ইত্যাদি)। সাধারণ জনগণ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এইধরণের আসনগুলি ব্যবহার করতো। আর রাজন্যবর্গের জন্য ছিল সিংহাসন, মণি-মুক্তাখচিত দামী কাঠের অথবা ধাতব আসন ! বর্তমানে ওটারই generalisation হয়েছে এবং তা আজকের chair-এ রূপ নিয়েছে।
জিজ্ঞাসু:—বলা হয় আনন্দ এবং দুঃখ মানুষের জীবনে পাশাপাশি থাকে। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায়_মানুষ তার সমগ্র জীবনে কর্ম যাই করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে আনন্দভোগ অপেক্ষা দুঃখভোগটাই বেশি হয়ে থাকে—এইটা কেন হয় গুরুজী ?
গুরুমহারাজ:—দ্যাখো, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন _’মানুষ মনেতেই বদ্ধ, আবার মনেতেই মুক্ত!’ কথাটা একদম সঠিক। এটাকেই ভারতীয় শাশ্ত্রে বলা হয়েছে –‘মায়াবদ্ধ’ অবস্থা এবং ‘মায়ামুক্ত’ অবস্থা। মায়াবদ্ধ জীবের বস্তুতে-বিষয়ে-ব্যক্তিতে সদাই আসক্তি ! আসক্তিবশতঃ তাদের মন যেন সদাই কাঙাল ! সর্বদাই দাও’ ‘দাও’ করছে, সর্বদাই এটা চাই—ওটা চাই -এর পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। একটা বাসনা মিটতে না মিটতেই অন্য কোনো বিষয়-বাসনা পুরণের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে । অনিত্যের প্রতি এই যে আসক্তি, এটাই দুঃখের কারণ !
আসলে হয় কি জানো _বাসনা পূরণ হয়ে গেলে অর্থাৎ ভোগের সামগ্রী লাভ করলেও দুঃখ, আবার তা না পেলেও দুঃখ। কারণ চাওয়ার এই যে কৌশল–ওটাই তো ভুল ! তাহলে এবার দেখা যাক্ ‘মায়ামুক্ত’ অবস্থাটা কি রকম যিনি ‘মায়ামুক্ত’ –তিনি অনাসক্ত, তাই তিনি যেন তাঁর মনের রাজা ! তিনি সদা-সর্বদা মনে রাজকীয় ভাব পোষণ করেন। তখন আর তাঁর মনে ‘দাও- দাও’ ভাব থাকে না! তখন শুধুই ‘নাও-নাও ! কিন্তু “যো বৈ ভূমা তৎ সুখং নাল্পে সুখ- মস্তি”_অর্থাৎ ‘যা ভূমা, তাই সুখ, অল্পে সুখ নাই’। এই ধরণের ত্যাগী, অনাসক্ত লোকদের দেখে জাগতিক ভোগ-সুখে মত্ত মানুষেরা ভাবে _’এরা কি দুঃখী, এরা জাগতিক কোনো ভোগটাই করলো না—তাহলে এদের বোধহয় জীবনটা বৃথাই হয়ে গেল!’ কিন্তু অনাসক্ত যে জন _ তিনি জানেন তিনিই প্রকৃত সুখী, তিনি জানেন প্রকৃত ভোগী তিনিই ! এই অনাসক্ত স্থিতিকেই বলা হয় পরমহংস বা অবধূত স্থিতি।
বেনারসে আমি একজন অবধূতকে দেখেছিলাম, উনি এক শীতের সন্ধ্যায় রাস্তার উপর একটা লাইট- পোষ্টে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছিলেন। একজন মাড়োয়ারী ভদ্রলোক ওনার এই অবস্থা দেখে অর্থাৎ সাধু শীতে কষ্ট পাচ্ছে ভেবে –একটা শাল কিনে নিয়ে এসে তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিল। সাধুটি বালকের ন্যায় আহ্লাদিত হয়ে শালটি গায়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। আমিও ব্যাপারটার পরিণতি কি হয় তা দেখার জন্য সাধুটির পিছন পিছন নিরাপদ দূরত্ব রেখে অনুসরণ করতে লাগলাম। অবধূতজী অনেকটা পথ হেঁটে এসে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে চারিদিকটা দেখে নিলেন, তারপর একটা কাঁটার ঝোপে শালটাকে বেশ ভালোভাবে যত্ন করে জড়িয়ে দিলেন— যেমন করে মা তার শিশুকে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচানোর জন্য যত্নসহকারে চাদর জড়িয়ে দেয়—ঠিক সেইভাবে। তারপর অবধূতজী উঠে দাঁড়িয়ে থু-থু করে থুতু ফেললেন দু’বার। শেষকালে চাদরটার উপর প্রস্রাব করে খালি গায়ে আবার ফিরে গেলেন পূর্বের জায়গায় এবং খালি গায়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলেন৷
এখানে ব্যাপারটা হোলো কি জানো—অবধূতজী তো সহজ অবস্থায় সদানন্দেই আছেন কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁর অবস্থাটাকে ভাবছে ক্লেশকর ! ঐ সাধুটির মনে যেহেতু কোনো আসক্তি নেই, তাই তিনি পার্থিব কোনো বস্তু অপরের কাছ থেকে নেবেন কেন? তাঁকে কিছু দেবার জন্য ঈশ্বর স্বয়ং সদাসর্বদা প্রস্তুত ! কিন্তু তিনি যে মনের রাজা–তাঁর কোনোকিছুরই প্রয়োজন নাই ! সেইজন্যই তো আমি তোমাদেরকে বলি _’মানুষ অর্থের অভাবে বা কোনো বস্তুর অভাবে গরীব হয় না, আসলে মানুষের মন গরীব হয় ! তোমরা যারা এখানে বসে আছো তাদের সকলকে বলছি–তোমরা তোমাদের মনকে কাঙাল করো না ! জগতের কাছে, ঈশ্বরের কাছে বা মা জগদম্বার কাছে আর কত ‘দাও-দাও’ করবে ? এবার বলো–’মা তুমি আমার সবকিছু নাও’, ‘মা আমাকে নাও’, ‘আমাকে তোমার করে নাও’, ‘আমাকে তোমার কাজে লাগাও’—এই চাওয়াতেই অনাবিল শান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারবে !
মানুষ সবসময়ে দুঃখে আছে বলেই তো হা-হুতাশ করছে ! তোমরা একবার মায়ের কাছে “মা নাও” বলে প্রার্থনা করো, দেখবে তিনি তোমাদের সকল দুঃখ হরণ করে নিয়ে তোমাদের অনাবিল আনন্দের সন্ধান দেবেন। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে পরমানন্দের সন্ধান দেবেন।।
