জিজ্ঞাসু:—ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ যেভাবে মাথাচাড়া দিচ্ছে, তাতে ভারত কি আবার বিভক্ত হবে –গুরুজী?

গুরুমহারাজ:—না-না, অতোটা দুশ্চিন্তা কোরোনা। ভারতবর্ষ আর নতুন করে বিভক্ত হবে না। জানো তো _’বিচ্ছিন্নতাবাদ’, ‘সংকীর্ণতাবাদ’ এইসব শব্দগুলি ভারতবর্ষে আগে ছিল না। Semitic(সুমেরীয়)দর্শন সমূহ এদেশে আসার পর থেকেই ভারতবর্ষে এইসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন ভারতবর্ষে ষোড়শ মহাজনপদ নিয়ে যে বিশাল ভারতবর্ষের মানচিত্র ছিল সেটা থেকে _তো এখন অনেকটা অংশই বাদ চলে গেছে, কিন্তু বাদ গিয়েও কি সমস্যা মিটেছে ? অখন্ড ভারতের যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলি কোনো না কোন কারণে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, তারাও কি শান্তিতে রয়েছে ? সেইসব দেশে সমস্যা বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে কিন্তু তাদের সমস্যা মেটেনি। পূর্বের ষোড়শ মহাজনপদ ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল, তাদের মধ্যেও ঝগড়া-লড়াই যে হোতো না তাও নয়। কিন্তু বর্তমানের যে ধর্মীয় sentiment নিয়ে লড়াই, জাতপাতের লড়াই- এগুলি ছিল না। এগুলি এলো ভারতবর্ষে semitic চিন্তার অনুপ্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ! কারণ semitic চিন্তা ভারতীয়দের চিন্তাভাবনার জগতে ব্যাঘাত ঘটালো। বৌদ্ধ বা জৈনধর্মের চিন্তা ভারতবর্ষের প্রচলিত ধারায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি করেনি। কারণ বৌদ্ধ বা জৈনদের সংস্কৃতি একই, ধর্মমতগুলির আর্দশ-ও ত্যাগ এবং বৈরাগ্যের উপরই প্রতিষ্ঠিত। ফলে এই ধর্মমতগুলি কখনই ভারতবর্ষের পক্ষে সমস্যা -সৃষ্টিকারী বা ভয়ের ছিল না। কিন্তু Semitic-রা যখন থেকেই ভারতে ঢুকলো, তখন থেকেই এদেশের মানুষের প্রচলিত Life style-এর পরিবর্তন ঘটলো- আর এটারই ফল হোলো মারাত্মক! স্বর্গ-নরক কল্পনা, কাফেরবাদ _ ইত্যাদি বিষয় গুলিই গণ্ডগোল পাকালো এখানকার মানুষের মনোজগতে।

ওদের ‘একেশ্বরবাদ’-এ কোনো সমস্যা ছিল না—এখনও এটি কোনো সমস্যা নয়। ভারতেই সাংখ্যদর্শনে একেশ্বরবাদের সমর্থন রয়েছে, সুতরাং ভারতীয়দের কাছে এটা নতুন কথা কিছু নয়। ফলে শুধু ‘একেশ্বরবাদে’র তত্ত্ব ভারতীয়রা হজম করে ফেলতো। কিন্তু কাফেরবাদ অর্থাৎ হয় কলমা পরে ইসলাম হও অথবা তুমি কাফের, অতএব মরো— সাম্রাজ্য দখলের সঙ্গে সঙ্গে এইভাবে ধর্মান্তরকরণে ভারতবর্ষের প্রচলিত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বিরাট ‘ঘা’ পড়ে গেছে। ষোড়শ মহাজনপদ নিয়ে বিশাল দেশ ছিল ভারতবর্ষ! বহু জনগোষ্ঠী তার অন্তর্ভুক্ত ছিল কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভারতীয়দের এমনই একটা সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল যে, কেউ কখনই অন্য কারও সেই বৈশিষ্ট্য নষ্ট করতে পারতো না। প্রতিটি জাতির নিজস্ব জাতীয় বৈশিষ্ট্য থাকে, যেমন মারাঠীরা স্বাধীনতা প্রিয়_ ওরা কখনোই এই ব্যাপারে কারো সাথে আপোষ করবে না! প্রয়োজনে ওরা প্রাণে মরবে সেও ভালো কিন্তু সহজে পরাধীনতা মেনে নেবে না। হিমাচলের ডোকরা বা নেপালীদের সাথে এদের স্বভাব খানিকটা মেলে, স্বাধীনতায় অন্য কারো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করবে না ! জম্মুতে এই জাতির লোকেরা থাকার জন্যই জম্মুতে দীর্ঘদিন মুসলমানরা ঢুকতে পারেনি। এইভাবে বিভিন্ন জাতির যে ভিন্ন ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য _তার উপরে হোলো ‘জাতীয় বৈশিষ্ট্য’, সেটি সংস্কৃতিগতভাবে এবং স্বদেশপ্রীতির দিক থেকে এক‌ই থাকে! সেইটা Semitic চিন্তা ঢোকার সাথে সাথে অর্থাৎ এদেশীয়রা ধর্মান্তরিত হওয়ার পর থেকেই এদেশের মানুষের originality বহুলাংশে নষ্ট হয়ে গেছে। Semitic-রা ধর্মের নামে Crusade অথবা ‘জেহাদ’ করেছে, হাজার হাজার লোককে মেরে ফেলেছে অথবা এখনও মারছে, এটা একটা আদিম প্রকৃতি নয়কি ? আদিমযুগে এক জনগোষ্ঠীর লোকের সাথে অন্য জনগোষ্ঠীর দেখা হলেই জঙ্গলে লড়াই লেগে যেতো—শুরু হোতো মারামারি। উদ্দেশ্য একটাই, অপর গোষ্ঠীর সমস্ত লোককে মেরে ফেলতে হবে, তাহলেই ভোগের সামগ্রীগুলি দখল করে নিজেরাই ভোগ করতে পারবে এবং তাছাড়া ওদের এটাও বিশ্বাস ছিল যে _পরাজিত মানুষগুলোর গায়ের মাংস খেতে পারলে তাদের দৈহিক শক্তি বা বল খুব বেড়ে যাবে। তা _এখনকার সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে, জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে যে যুদ্ধগুলি হোচ্ছে _তা কি সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হোচ্ছে না ? আজকের সাম্রাজ্যবাদীরাও অপর একটি রাষ্ট্র জয় করে অধিবাসীদের খেয়ে ফেলতেই তো চাইছে! যাকে তোমরা আধুনিক পরিভাষায় বলতে পারো– Economical ex- ploitation বা অর্থনৈতিক শোষণ। তাই বিচার করে দেখলে দেখা যায় বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষই আদিম মানসিকতাসম্পন্ন- অসভ্য ! এই পৃথিবী গ্রহে একমাত্র Spiritual ব্যক্তিরাই সভ্য ।

ভারতবর্ষই যুগে যুগে বিশ্বকে Spirituality শিখিয়েছে, আবার এখনো শেখাবে। আগামীদিনে দেখবে Spirituality দিয়েই “সভ্য বা অসভ্য”-এর বিচার হবে। সুতরাং ভারতবর্ষ তথা ভারতবাসী যত তাড়াতাড়ি Semitic চিন্তাসমূহ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভারতের orginal ঐতিহ্য গ্রহণ করে নেবে অর্থাৎ তারা বেদ বা উপনিষদমুখী হবে _ ততোই ভারতবর্ষের মঙ্গল ত্বরান্বিত হবে।

জেনে রাখবে Sprituality- ই প্রকৃত গণতন্ত্র, যা ব্যক্তি-স্বাধীনতা নিশ্চয় করে। একই বাড়িতে বাবা-মা-ভাই-বোন পৃথক পৃথক ইষ্টচিন্তা করতে পারে, বিভিন্ন আচার পালন করতে পারে এবং এটা হয় পারস্পরিক কোনো বিরোধ ছাড়াই। এইটা Semitic -রা ভাবতেই পারবে না_একে অপরকে ‘কাফের’ বলে, বিধর্মী বলে মেরেই ফেলবে ! ‘মৌলবাদ’ পৃথিবীগ্রহের অভিশাপ।

ভারতীয়দের অনেক ধর্মমতের মধ্যেই(যেমন_ তথাকথিত বৈষ্ণবদের ভিতর) সংকীর্ণতা রয়েছে! দেখবে —যারা কৃষ্ণভজনা করে না, তাদেরকে ওরা ‘নরকের কীট’ বলে মনে করে। কিন্তু Semiticরা আরও ভয়ংকর, এদের ধর্মমত না মানলে ‘কোতল’ করে বসে।

সুতরাং ভারতবর্ষ কেন, পৃথিবীতে শান্তির বাতাবরণ তৈরী করতে গেলে, রক্তপাত বন্ধ না হোক –তা কমাতে গেলে, মানুষের মনোজগতে বা চিন্তার জগতের পরিবর্তন করতে হবে, আর সেটার দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষিত বিবেকবান মানুষদেরকেই। যারা ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা —তাদেরকেই বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে ক্ষুদ্রতর বিচ্ছিন্নতাবাদ বা সংকীর্ণতাবাদের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। তবেই আজকের প্রচেষ্টা ‘আগামীদিনের বাস্তবে’– রূপ নেবে ৷৷