গুরুমহারাজ : ~ একটু আগেই তো এই কথাগুলোই বলছিলাম যে, ‘পূর্ণত্বলাভ-ই হোলো মানবজীবনের উদ্দেশ্য’ ! “পূর্ণত্বলাভ” অর্থে স্বরূপে ফিরে যাওয়া ! জীব স্বরূপতঃ তো পূর্ণই – কিন্তু আত্মবিস্মৃতির জন্য সে নিজেকে অপূর্ণ ভাবছে আর কষ্ট পাচ্ছে ! আর কষ্ট পাচ্ছে বলেই সে সেই অবস্থা থেকে মুক্ত হোতে চাইছে এবং আনন্দের আস্বাদন লাভের জন্য এটা-ওটা-সেটায় আনন্দ খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে ! কিন্তু উদ্দেশ্যহীনভাবে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ালে যেমন মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না, তেমনি মানবেরও জন্ম-জন্মান্তর ধরে বিভিন্ন আকর্ষণের প্রতি ছুটে বেড়ানোই হোচ্ছে – কিন্তু পূর্ণত্বলাভ আর হোচ্ছে না !
মানবের পূর্ণত্বলাভ হয় জ্ঞানে, ধ্যানে এবং প্রেমে ! জ্ঞানে জ্ঞানীর ব্রহ্মের বোধ হয়, ধ্যানে ধ্যানীর পরমাত্মার বোধ হয় এবং প্রেমে বা সেবায় ভক্তের ভগবান-এর বোধ হয়, ভগবৎ আস্বাদন হয়।
কিন্তু তুমি যে অবতরণের বা descending-এর কথা বলছিলে – ওটা পৃথক তত্ত্ব ! সাধারণ মানুষ ascending তত্ত্বে রয়েছে, সাধনার ক্রম ধরে সাধক(মানব) অপূর্ণতার বোধ থেকে পূর্ণত্ত্বের বোধে উপনীত হয় ৷ কিন্তু সেই অবস্থায় পৌঁছে – জন্ম -জন্মান্তরের সংস্কারলব্ধ ‘কাঁচা আমি’র অস্তিত্ব হারিয়ে পরম অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় ৷ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন – ” নুনের পুতুলকে সাগরে ডোবালে – সে সেই সাগরেই মিশে যায় ৷” এখানেও সেইরকমটাই হয় – মানব (সাধক) যখন বুঝতে পারে যে সে নিজেই সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ, তখন সে সেই সচ্চিদানন্দ সাগরেই মিশে গিয়ে আপন(কাঁচা আমি) অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে ৷
কিন্তু অবতারতত্ত্ব – পৃথক তত্ত্ব ! ওই যে বলা হোলো descending তত্ত্ব ! সচ্চিদানন্দ সাগর থেকেই যেন সহস্র সহস্র বুদবুদ সৃষ্টি হোচ্ছে, ছোটো ছোটো ঢেউ সৃষ্টি হোচ্ছে, আবার এক একটা বড় ঢেউ বা তরঙ্গের সৃষ্টি হোচ্ছে। কিন্তু যখন কোনো সাইক্লোন বা সুনামির সৃষ্টি হয় তখন এক একটা তরঙ্গ এতো বিশাল হয়ে থাকে যে, তা সমুদ্রের বেলাভূমিকে অতিক্রম করে বেশ খানিকটা মূল ভুমিকেও প্লাবিত করে দিয়ে থাকে! তখন সেই তরঙ্গ সামনে যা পায় – সবকিছুকেই নিজের বক্ষে ধারণ করে এবং তাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যায়। মনুষ্যশরীরের অবতারগণ যেন সচ্চিদানন্দ সাগরের ঐরকমই এক একটা মহা মহা তরঙ্গ ! তাঁরা যখন শরীর ধারণ করেন- তখন তাঁরা উচ্চ-নিচ, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, ছোটো-বড়র বাছবিচার করেন না। সামনে যাকে পান – তাকেই তাঁদের অপার্থিব, অপ্রাকৃত প্রেমে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যান। এরফলে তাঁরা জীবজগতের অগ্রগতির প্রবাহের (বিবর্তন এবং সংবর্তন জনিত)বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা বা vacuum সৃষ্টি করে যান। সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করার জন্য আবার একটা অগ্রগতির স্রোত সৃষ্টি হয় এবং জীবসকলের বিবর্তনের ধারা, বিশেষতঃ মানুষের চেতনার উত্তরণের ধারা পুনরায় গতিলাভ করে ৷
Ascending সাধকদের (আমরা সাধারণতঃ যাদেরকে মহাত্মা-মহাপুরুষ-যোগী-ধ্যানী জ্ঞানী বলে থাকি) দ্বারা এইরূপ গতিশীলতা দান করা সম্ভব নয় ৷ কারণ তাঁরা(ascending) সকলে পূর্ণ ন’ন, আর যদিও কেউ পূর্ণতা অর্জন করেন তাহলে তিনি পূর্ণত্বে পৌঁছেই আপন অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেন ৷
অপরপক্ষে descending বা অবতাররা “পূর্ণ” হয়েই আসেন – সর্বদা তাঁরা পূর্ণত্বের বোধেই থাকেন ! কিন্তু জীবজগতের কল্যাণের জন্য নিজেকে প্রয়োজনমতো আবৃত রাখেন। ফলে তাঁরা সাধারণ আর পাঁচটা মানুষের মতোই আচরণ করেন ! তবে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেলে – তখন তাঁরা আত্মপ্রকাশ করেন এবং অতি দ্রুত আরব্ধ কাজ করতে শুরু করে দেন। যেটুকু কাজ করতে এসেছিলেন(মা জগদম্বার লীলা পুষ্ট করার জন্য)- তা সম্পন্ন হোলেই আর তিলমাত্র দেরী করেন না – জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় নিজের স্থুলশরীরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার সচ্চিদানন্দ সাগরেই মিশে যান !
Ascending-দের নিজস্ব identity থাকে কিন্তু descending-দের থাকে না ৷ এমন অনেক সাধক এখনোও পৃথিবীতে রয়েছেন – যাঁরা হাজার হাজার বছর ধরে শরীর ধারণ করে রয়েছেন, পৃথিবীর নানা মঙ্গলসাধন করে যাচ্ছেন কিন্তু তাঁদের নিজস্ব identity রয়ে গেছে ! অপরদিকে অবতারতত্ত্বে অবতারদের নিজস্ব কোনো identity থাকে না! ঈশ্বরতত্ত্বই অবতারতত্ত্ব রূপে কাজ করে ৷ সেই অর্থে কখনোই বলা যায় না – ভগবান রামচন্দ্রই ভগবান শ্রীকৃষ্ণরূপে লীলা করেছেন বা ভগবান শ্রীকৃষ্ণই শ্রীচৈতন্য রূপে লীলা করেছেন অথবা শ্রীচৈতন্যই শ্রীরামকৃষ্ণরূপে লীলা করেছেন ! অবতারতত্ত্বের সেইরূপ কোনো identity নাই, তবে একথা বলা যায় যে তত্ত্বতঃ সকল অবতারেরাই এক !
আর একটা কথা তুমি বলছিলে – ‘ভগবান শুধুমাত্র মনুষ্যশরীরেই লীলা করেন’- এটাও ঠিক নয় ! মা জগদম্বার লীলার জগতে যে কোনো প্রজাতিতেই ঈশ্বরের অবতরণ হোতে পারে। ব্যাপারটা ধরতে পারলে না তো__এটা কেমন হয় তা বুঝিয়ে বলছি শোনো ৷ ধরো, পৃথিবীগ্রহের কোনো অঞ্চলে মহামারীতে কোনো মনুষ্যেতর প্রজাতির জীব লুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে কিন্তু এই প্রজাতিটির এখনো পৃথিবীতে থাকার প্রয়োজন রয়েছে __ তখনই ওই বিশেষ প্রজাতিতে ঈশ্বরের অবতার একজন strong সদস্য হিসাবে অর্থাৎ বিশেষ immunity power নিয়ে শরীর ধারণ করতে পারেন এবং ওই প্রজাতির বহু নারী শরীরের সঙ্গে মিলিত হয়ে – ওই প্রজাতিকে রক্ষা করে থাকেন । এইভাবেই পরমেশ্বর ✓রীমায়ের জগতের বিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখেন। তাই বলছিলাম _ঈশ্বরের লীলা যে কোনো শরীরেই হতে পারে কিন্তু মনুষ্য শরীরে হয় উন্নত লীলা ! এটিকে মনুষ্যলীলা বলা যায়! তবে এটা মনে রাখবে যে, ঈশ্বর যখন যে শরীরেই অবতরণ লীলা করুন না কেন __সেইটাই তখন হয় সেই প্রজাতির highest manifestation ! গীতায় বিভূতিযোগ পড়লে দেখতে পাবে সেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কথাগুলিই বলেছেন ৷ অক্ষরের মধ্যে আমি অ-কার, বৃক্ষের মধ্যে আমি অশত্থ, বিষের মধ্যে আমি কালকূট – ইত্যাদি ৷
ঈশ্বরের অবতারতত্ত্বে সন্ধিনী, সম্বিত এবং হ্লাদিনী এই তিনপ্রকার শক্তির প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় ৷ কিন্তু ঈশ্বরের যে লীলায় এই ত্রিবিধ শক্তির পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায় – সেই শরীরকেই “পুরুষোত্তম স্বয়ং” বলা হয় ! “পুরুষোত্তম” কিন্তু নরশরীর ছাড়া অন্য কোনো প্রজাতির শরীরে হওয়া সম্ভব নয় – কারণ এই পৃথিবীতে যেহেতু নরশরীর-ই জীববিবর্তনের highest manifestation তাই মানব শরীরের লীলাই শ্রেষ্ঠ লীলা!
আরো একটা ব্যাপার এখানে উল্লেখ করা যায় __যে কোনো অবতার তত্ত্বেই বিশেষ বিশেষ শক্তির প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়, একেই বলা হয় ভগবানের ‘মহিমা শক্তির’ প্রকাশ। এইভাবেই প্রকাশের ভিন্নতা অনুযায়ী শাস্ত্রকারেরা অবতারদেরকে অংশাবতার, কলাবতার, লীলাবতার ইত্যাদি নামে অভিহিত করে থাকেন! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এইসব দিয়ে “অবতারতত্ত্ব” বিচার করা যায় না ! ঈশ্বরের অবতরণ হয় – ধর্মজগতের গ্লানি দূর করতে অর্থাৎ ভূভার হরণ করতে । তবে অতি সাধারণ মানুষের দুরাগ্রহ দূর করাটাও তাঁদের একটি অন্যতম কাজ ৷ এইজন্যেই অবতারগণ (যখন শরীর ধারণ করেন) প্রথমেই দুঃখের চূড়ান্ত রূপকে নিজের জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন, নিজে চূড়ান্ত দুঃখকে ভোগ করে নেন ! তারপর – তাঁরা মনুষ্যসহ সকল কিছুর দুঃখমোচনে সচেষ্ট হ’ন ৷
যে সমাজকে কিছু নিঃস্বার্থভাবে দিতে চায় – দেওয়ার এটাই একমাত্র কৌশল ! সাধন-সহায়ে জীবনে চরম আনন্দলাভ করার পরই অপরকে আনন্দ দেওয়া যায় ৷ চূড়ান্ত শিক্ষালাভ করলে – তবেই অপরকে শিক্ষা দেওয়া যায়। তেমনি চূড়ান্ত দুঃখভোগ করার পরই অপরের দুঃখ নিবারণ করা যায় ! নিজের জীবনে চরম দুঃখভোগ করে নিয়ে – এইবার তাঁরা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যান এবং blotting paper যেমন তরল পদার্থ automatically শোষণ করে নেয় – তেমনি তাঁরাও জীবের দুঃখ automatically বা spontaneous ভাবে শোষণ করে নেন ! আর সেইজন্যই বলা হয় ভগবান “করুনাময়” !!
** *অষ্টম খন্ড সমাপ্ত* **
