গুরুমহরাজ :– হ্যাঁ, অবশ্যই রয়েছে। জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি—এই তিন অবস্থাতেই আমি সদাজাগ্রত। সাধারণতঃ গর্ভে থাকাকালীন অবস্থার কথা _সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে থাকে না, কারণ মানুষের চেতনা ঐ অবস্থায় শুধুমাত্র স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই দুই অবস্থায় থাকে।
সাধারণ মানুষের জাগ্রত অবস্থাতেই বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি হারিয়ে যায়, তা আবার স্বপ্ন বা সুষুপ্তি অবস্থার স্মৃতিচারণ ! তিন অবস্থাতেই স্মৃতিচারণ তিনিই করতে পারেন_ যিনি ঐ তিন অবস্থাকে অতিক্রম করেছেন অর্থাৎ যিনি তুরীয় স্থিতিতে বিরাজ করছেন।
সে যাইহোক, মা জগদম্বার ইচ্ছায় আমার পূর্ব পূর্ব বহুজন্মের স্মৃতি রয়েছে, সুতরাং এই শরীরে গর্ভে থাকাকালীন অবস্থার স্মৃতিও রয়েছে। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম যে, কেন মা জগদম্বা ঐ অবস্থায় সাধারণ মানুষের চেতনা অবলুপ্ত করে রাখেন ! কারণ গর্ভের আঁধার, অসহনীয় গরম এবং মানব শরীরের অভ্যন্তরের গন্ধ সহ্য করে দীর্ঘদিন থাকা খুবই কষ্টকর ! অনেকসময় এমনও হয়েছে যে, কোনো মহাপুরুষের বা মহামানবের হয়তো গর্ভে থাকাকালীন সময়ে স্বপ্নাবস্থা কেটে গেছে অর্থাৎ সে জাগ্রত অবস্থায় ফিরে এসেছে __আর সাথে সাথেই তার মৃত্যু ঘটে গেছে ! ঐ অসহনীয় অবস্থা সহ্য করতে পারেনি ! শিশুমৃত্যু, গর্ভকালীন মৃত্যু __এইসব বিষয়ে আধুনিক ডাক্তার বা বিজ্ঞানীরা যাই ব্যাখ্যা দিক না কেন—আমি যেটা বললাম, ওটাকেও সত্যি বলে জানবে।
গর্ভে থাকাকালীন অবস্থায় আমি মায়ের সাথে একাত্ম হয়ে মায়ের চোখ দিয়ে জগৎ দেখতাম। মায়ের মুখ দিয়ে অনেক সময় অনেক কথা বলে দিতাম। মায়ের চিন্তার সঙ্গে নিজের চিন্তা মিলিয়ে মাকে অন্য চিন্তা থেকে সরিয়ে এনে ভগবৎমুখী করে রাখতাম। একবার এমনও হয়েছিল—মায়ের চোখের ভাষা যে অন্যরকম তা বুঝতে পেরে আমার বাবা কিছুদিনের জন্য ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন।
ঐ অবস্থায় আমার সময় কাটাতে কোনোরকম অসুবিধা হোতো না। কারণ মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের যে শব্দ তার এক অপূর্ব ছন্দ (Rhythm) রয়েছে, যা ওস্তাদ বাজিয়ের বীণাবাদনের “দ্রিম্ দ্রিম্” তানের মতো ! সেই দ্রিম্ দ্রিম্ ধ্বনির Rhythm আর তার সঙ্গে মায়ের হৃৎপিণ্ডের লাব-ডুব্ শব্দ যেন তবলার তাল বলে মনে হোতো ! তাছাড়া শরীরের অভ্যন্তরে সৃষ্ট আরও নানারকম শব্দ মিলেমিশে একটা অর্কেষ্টা সৃষ্টি করতো। ঐ অদ্ভুত সুর-মূর্ছনায় আমি অধিকাংশ সময় মগ্ন হয়ে থাকতাম, বলা চলে একেবারে তন্ময় হয়ে থাকতাম। এইভাবে কতসময় যে অতিবাহিত হয়ে যেতো_তার ঠিক থাকতো না।
মায়ের গর্ভ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার পর অর্থাৎ আমার জন্মের পর_ আমি মায়ের বুকে কান পেতে ঐ সুরমূর্চ্ছনা শোনার চেষ্টা করতাম—পেতামও, আর আমি ঐ অবস্থাতেই মগ্ন হয়ে যেতাম।
আরও পরে যখন আরেকটু বড় হলাম(শিশু অবস্থা), তখন আমার পরবর্তী ভাই-বোনেরা মাকে দখল করে নিল _ ফলে তখন মাকে অতোটা কাছে না পাওয়ায় আমি নিজের মধ্যেই আত্মস্থ হয়ে ঐ রক্ত-সঞ্চালন-ধ্বনি আর হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি সহ সমগ্র সুর মূর্ছনাকে শোনার চেষ্টা করতাম। আর তা খুঁজে পেয়ে তখন তাতেই মগ্ন হয়ে যেতাম। অনেকে ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে ভাবতো__ আমি বোধহয় কালা হয়ে গেছি, কোনো কথা শুনতে পাই না !
জানো __মানুষ নিজেই জানে না যে তার শরীরের মধ্যেই কতো সব অপূর্ব ব্যাপারসমূহ রয়েছে, কতো রহস্য লুকিয়ে আছে তারই মধ্যে __সারাজীবনে এসব আর আর জেনে ওঠাই হয় না। বাইরের জগতের কথা জানতে গিয়েই মানুষের করুন অবস্থা _ ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ I
যাইহোক, ৯ মাস ১০ দিন কেটে গেল কিন্তু মায়ের প্রসবকাল পূর্ণ হোলো না, আর প্রসবকাল পূর্ণ নাহলে তো প্রসব হয় না ! এমনিতে সবাই বলে থাকে প্রসবকাল হোলো ১০ মাস ১০ দিন কিন্তু ডাক্তারী মতে এই কথাটা ভুল ! এটা হোলো ৯ মাস ১০ দিন অর্থাৎ ২৮০ দিন, fertilisation-এর ২৮০ দিন পরে সাধারণতঃ বাচ্ছা প্রসব হয়। আমার ক্ষেত্রে __প্রসব হোতে প্রায় ১২ মাস লেগেছিল। পাড়া-পরশীরা সবাই মাকে বলতো _’তোমার পেটে ছেলে নেই, হয়তো Tumour হয়েছে’। মা কিন্তু মানুষজনের কথাতে মোটেই বিচলিত হ’ননি। কারণ আমি গর্ভে আসার পর থেকে মা এতকিছু দর্শন করেছিলেন বা জাগ্রত ও স্বপ্ন অবস্থায় এতো কিছু শুনেছিলেন(বিভিন্ন মহাত্মাগণের নিকট হোতে) যে, তাঁর গর্ভের সন্তান যে তাঁর বহু জন্মের সাধনার ফল –তা তিনি বিলক্ষন জানতেন। যদি আমার মা শিক্ষিতা হোতেন এবং তাঁর সমস্ত অভিজ্ঞতা লিখে রাখতে পারতেন _ তাহলে তোমাদের কাছে সেটা একটা অমূল্য দলিল হোতে পারতো। আমার মা সেই সময় স্বপ্নাবস্থায় পৃথিবীর কোথায় না গেছেন ! আর কতো মহাপুরুষ, দেবদেবীর যে দর্শন পেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই ৷
যাইহোক, প্রসবকালে মায়েদের প্রসব বেদনার কথা সবাই জানে এবং সেই যন্ত্রণা নিয়েই সবাই কথা বলে। কিন্তু গর্ভে থাকাকালীন সময়ে এবং বিশেষতঃ প্রসবকালীন(তখন গ্রামাঞ্চলে নর্মাল ডেলিভারিই হোতো!)এ্য সময়ে শিশুদের যা কষ্ট হয় –তার কথা বেশিরভাগ মানুষই খবর রাখে না। সদ্যোজাত শিশুরা কথা বলতে পারে না কিন্তু তাদের expression দেখে বোঝা যায়__ প্রসবকালে শিশুর কি ভীষণ কষ্ট হয় ! কিন্তু ঐ যে আগেই বলা হয়েছিল_সাধারনতঃ গর্ভস্থ শিশু স্বপ্নাবস্থায় থাকে _তাই তার এইসব যন্ত্রণার কথা মনে থাকে না। তবে যাঁর পূর্ণজ্ঞানে প্রসব হয় তাঁর যন্ত্রণাই যন্ত্রণা ! যতক্ষণ শিশু মাতৃগর্ভে থাকে, ততক্ষণ তার খাওয়া-দাওয়া, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, রেচন সবই মাতৃঅঙ্গের অভ্যন্তরেই বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থার সাহায্যে হয়ে থাকে। তবে, গর্ভস্থ সন্তানের রক্ত চলাচল, হৃৎপিণ্ডের কাজ তার নিজের মধ্যেই চলতে থাকে। প্রসবকালে হৃৎপিণ্ডে এতো pres sure পড়ে যে, প্রতি মুহূর্তে মনে হয় _ ‘এক্ষুনি প্রাণ বের হয়ে যাবে’। এখন তো 80% বেবী-ই ‘সিজারিয়ান বেবী’ ! তারা জানতেই পারছে না যে, Normal প্রসবে মায়ের সাথে সাথে সন্তানেরও কি প্রচণ্ড কষ্ট হয়ে থাকে। তবে আমার কি মনে হয় জানো, Normal প্রসবের সঙ্গে শরীরের কোনো কাজের বা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সম্পর্ক আছে। হয়তো পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা এটা গবেষণা করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন।
