গুরুমহারাজ :— আমার বাবা চিরকালই এক আপনভোলা উদাসীন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁর সংসার ছিল, জমিজমাও ভালই ছিল কিন্তু তিনি নিজে খুব একটা হিসেবী বা সংসারী ছিলেন না ! এর ফলে আমাদের সংসারে সেই সময় খুব অভাবও ছিল। আমার বাবা তাঁর পিসিমাকে খুবই মান্য করতেন। তাঁর ভয়েই আমার বাবা যতটা সম্ভব বাড়ীতে থাকতেন কিন্তু সুযোগ পেলেই বিভিন্ন আখড়া বা হরিবাসরে কিংবা যাত্রাপালায় গানবাজনা করতে চলে যেতেন।
আমার জন্মের আগে থেকেই যে কোনোভাবে আমার সম্বন্ধে(ঈশ্বরত্ব সম্বন্ধে)বাবার ধারণা পাকা হয়ে যায়। ফলে আমার জন্মাবার পর থেকেই আমি দেখেছি, অন্য সবার থেকে বাবা আমাকে বেশী প্রাধান্য দিতেন। তিনি সকলকেই—এমনকি আমার মাকেও বলে দিয়েছিলেন—”রবি(গুরু মহারাজ)যত ভুল বা অন্যায়ই করুক না কেন, রবিকে যেন কেউ কিছু না বলে”! আমার মনে আছে—আমাদের এক গৃহশিক্ষক একবার পড়াতে এসে আমাকে মেরেছিলেন(হয়তো কানমলা দিয়েছিলেন)। এটা জানতে পেরে সেই রাত্রেই বাবা তাঁর বাড়ী গিয়ে তাঁকে পড়ানোর ব্যাপারে জবাব দিয়ে আসেন এবং অন্য একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন।
এছাড়া বাবা কোথাও গেলেই সুযোগ পেলে আমাকে কাঁধে করে নিয়ে যেতেন। আমার বেশ মনে পড়ে নিভূজী বাজারের বিভিন্ন মহাজনী গদিতে বাবা শিশু অবস্থায় আমাকে নিয়ে যেতেন। একবারকার একটা উল্লেখযোগ্য কথা আমার মনে পড়ছে__সেইসময় সীতারামদাস ওঁকারনাথ এসেছিলেন ঐ নীভূজী বাজারে। বাবা আমাকে কাঁধে করে ওনাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন । ওখানে গিয়ে উনি আমাকে কাঁধে নিয়ে সীতারামদাসকে দেখাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন_‘দ্যাখো বাবা, ঐ যে উঁচুতে বসে আছেন—উনিই সীতারামদাস বাবা।” আমি তো ওনাকে দেখেই ওনার পূর্বজন্মের রূপটা বাবাকে বলে দিচ্ছিলাম। সেই সব কথা শুনে বাবা বলেছিলেন _”এইসব কথা লোকজনের সামনে বলতে নাই।!” এই বলে তাড়াতাড়ি উনি আমাকে ভিড় থেকে বের করে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে আমার একটা দারুণ bonding ছিল।
বাবাও আমাকে বুঝতেন আর আমিও তাঁকে বুঝতাম! ফলে ছোটোবেলায় বাবা কখনোই আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন নি। শুধুমাত্র যেহেতু আমি রাত্রে যখন তখন উঠে পালাতাম, এইটায় বাবা খুব চিন্তা করতেন বা ভয় পেতেন। এইজন্যেই মাঝে মাঝে উনি আমাকেও ভয় দেখাতেন। ফলে উনি নিজের কাছে আমাকে শুতে নিতেন, আর আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতেন__ পাছে আমি রাত্রিতে উঠে পালিয়ে যাই। কিন্তু বাবা ঘুমিয়ে গেলেই আমি রোজ রাত্রে পালাতাম।
বাবা মাঝে মাঝে আমাকে খুশি করার জন্য পয়সা দিতেন। চার আনা পয়সা প্রায়ই দিতেন। তখনকার দিনে চার আনা পয়সা একটা শিশুর কাছে অনেক। ২ নয়া পয়সায় একটা ঘুড়ি বা একটা বড় বেলুন পাওয়া যেতো। তখন একটা আইসক্রীমের দাম ছিল ২ নয়া, চার আনায় ৪টে বড় রসগোল্লা পাওয়া যেতো। তাহলেই ভাবো একবার_তখন জিনিসপত্রের বাজার দর কতো সস্তা ছিল! তবে ঐ পয়সা দিয়ে কিছু খাবার জিনিস কিনলে আমি সবাইকে দিয়ে খেতাম ! আর তা না হোলে মায়ের হাতে ঐ পয়সা ফেরত দিয়ে দিতাম।
একবার মনে আছে, নিভূজীতে বিশ্বকর্মা পূজার মেলায় দিদিদের সাথে গেছিলাম ! বাবা তো চার আনা আমাকে আলাদা দিয়েছেন, সেটা পকেটে রয়েছে। হঠাৎ দেখলাম আমার বয়সী একটা ছেলে (৩/৪ বছর বয়েস তখন আমার) ঘুড়িওয়ালার দোকানের সামনে খুবই কাঁদছে, তার হাতে একটা ছেঁড়া ঘুড়ি। ব্যাপারটা হয়েছে কি, ঘুড়ির দাম ২ পয়সা অর্থাৎ তিন নয়া কিন্তু ছেলেটি দিয়েছে ২ নয়া, ফলে দোকানদার ঐ পয়সা নিয়ে তাকে একটা ছেঁড়া ঘুড়ি দিয়েছিল। এবার হয়েছে কি _ছেলেটি সেই ঘুড়িটি ফেরত দিতে চাইছিল, দোকানদার তাও নেবে না। ঐ বয়সেই বাচ্ছা ছেলেটির আকুল-করা কান্না আমাকে স্পর্শ করলো এবং আমার মনে হোলো—”আমি তো অনেক বড়, আমার অনেক কিছু করার আছে” ! এরপরেই আমি এগিয়ে গেলাম দোকানদারের দিকে, গিয়ে তাকে বললাম _ “ঐ ছেলেটিকে ভাল ঘুড়ি ২-টো দাও—পয়সা আমি দেবো।” দোকানদার আমার(ঐটুকু ছেলের)বলার ভঙ্গি দেখে ঘাবড়ে গিয়ে ওকে ২-টো ভালো ঘুড়ি দিল এবং ছেঁড়া ঘুড়িটার বদলে ২ নয়া ফেরতও দিয়ে দিল। আমি ওর ভালো ঘুড়িদুটির পয়সা দিয়ে দিয়েছিলাম। সেদিন ছেলেটির মুখে পরিতৃপ্তির হাসি আমাকে খুবই আনন্দ দিয়েছিল। শিশুবয়েস থেকেই আমি বুঝেছিলাম যে, মানুষের দুঃখমোচন করে—মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই জীবনে আনন্দের আস্বাদ পাওয়া যায়।
যাই হোক, ঐ ব্যাপারটা নিয়ে পরবর্তীতে একটা ঘটনা ঘটেছিল _ ঘটনাটা বলছি শোনো ! সেই ছেলেটি তো এখন আর ছোট নাই, বড় হয়েছে, পয়সা-কড়িও করেছে। এদিকে আমি এখানে অর্থাৎ এই বনগ্রামে আশ্রম করেছি। কিছুদিন আগে সেই ছেলেটি এখানে এসে হাজির। ওকে দেখেই তো আমার স্মৃতিতে ফুটে উঠলো _’আরে এ তো সেই ছোটবেলায় ঘুড়ির দোকানের সামনে ক্রন্দনরত বালক’। ও হয়তো সেদিনের কথা ভুলে গেছিলো কিন্তু আমার সবই মনে পড়ে যাচ্ছিলো।
সব মানুষেরই জীবনে এমন কিছু ছোট-খাটো ঘটনা ঘটে, সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারলে দেখা যায় যে, জীবনের ধারাটাই পাল্টে গেছে। জানো তো কথা আছে, ‘স্বভাব যায় না মলে, ইল্লত যায় না ধুলে’ ! কিন্তু এই কথাটা সর্বোতভাবে ঠিক নয়। মানুষের স্বভাব বদলায়, আর তা বদলায় একমাত্র সাধুসঙ্গে ! সাধুসঙ্গে বিবেক জাগ্রত হয়। এই যে তোমরা এখানে এসেছো _স্বামী পরমানন্দ তোমাদের কি পরিবর্তন করছে বা কি করবে বলোতো ? স্বামী পরমানন্দ সব মানুষকে রাতারাতি বদলে দেবে, না পরমানন্দের সৎসঙ্গে এলে তাদের শিং গজাবে !!
প্রতিটি মানুষেরই স্ব স্ব ভাব রয়েছে, আর নিজ স্বভাব অনুযায়ীই মানুষের বিচারের ধারা পৃথক পৃথক হয়ে থাকে। পরমানন্দ শুধু সেই বিচারের ধারাটা বদলে দেবার চেষ্টা করে। কোনো মানুষকে যতই জ্ঞান দাও, যতই লেখাপড়া শেখাও, তার স্বভাবের পরিবর্তন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার বিচারের ধারাটি বদলে যাচ্ছে। এটাকেই বিবেকের জাগরণ বলা হয়ে থাকে।… (ক্রমশঃ)
