(গুরুজী তাঁর ছোটোবেলার কথা বলছিলেন। গতদিনের আলোচনার পরবর্ত্তী অংশ আজ…..)

… যাইহোক বাবার কথা বলতে গিয়ে আরও অনেক কথা বলা হয়ে গেল। এইভাবে ছোটবেলায় বাবা যে আমাকে বেশী প্রাধান্য দিতেন তার কারণটা হোলো—’আমাকে নিয়ে বাবার বেশ কিছু “দর্শন” হয়েছিল।’ আর তাছাড়াও বিভিন্ন সময়ে নানান ধরণের সাধুরা বাবাকে আমার সম্বন্ধে কিছু পূর্ব অনুমান বা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন _সেইজন্যেই বাবা আমাকে একটু অধিক প্রশ্রয় দিতেন। এখন আমাদের ওখানকার (কৃষ্ণদেবপুর, গুরুজীর জন্মভূমি) অনেকে আমার কাছে এসে বলে যে, আমার ছোটবেলায় বাবা যাদের সঙ্গে মিশতেন– তাদের কাছে তিনি আমার সম্বন্ধে নানান ভালো ভালো কথা বলতেন ! ফলে তাদের বাড়ীর ছেলেরা(যারা হয়তো গুরুজীর‌ই বয়সী বা কিছুটা ছোটো)আমাকে চিনতো না কিন্তু “রবি”- এই নামটা জানতো !

হয়তো এইসব নানা কারণে বাবা কখনোই ছোটোবেলায় আমাকে শাসন করেননি, বরং অধিক স্নেহ করতেন_অন্যান্য ভাইবোন অপেক্ষা অধিক মর্যাদা দিতেন। তাই উনি আমাকে ‘রবিঠাকুর’ বলে সম্বোধন করতেন।

আমার বাবার নাম ছিল ফকিরচন্দ্র। আমার মনে হয় কি জানো–হয়তো দাদু ঠাকুরমার ছেলে-মেয়ে মারা গিয়েছিল বা ঠিক সময়ে ছেলে হচ্ছিলো না—তাই স্থানীয় কোনো ফকির সাহেবের দরগায় মানত করে ছেলে হয়েছিল, তাই ঐরূপ নামকরণ হয়েছিল। তবে আমার ক্ষেত্রে নামটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আমি গর্ব করে সবাইকে বলতে পারি—আমার পিতা ছিলেন “ফকির”। বাবা ছোটবেলায় আমাকে ‘ভোলানাথ’ও বলতেন। আমি ছোটোবয়সে কোনো ন্যায়-অন্যায় করলে বা কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো কারণে অভিযোগ করলে বাবা বলতেন, ‘ও ভোলানাথ, ওকে তোমরা কেউ কিছু বোলো না।’

জিজ্ঞাসু :–গুরুজী! এইসব কথা শুনতে অপূর্ব লাগছে । আপনার ছোটবেলার এই ধরণের আরো কিছু ঘটনা যদি বলেন —তাহলে বড়োই কৃতার্থ হই।

গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, আমার ছোটবেলার অনেক ঘটনার কথা আমি ছাড়া একমাত্র আমার গর্ভধারিণী জানেন কিন্তু এমনই মজার ব্যাপার যে, মহামায়ার চক্রে মা সেইসব কথা ভুলে গেছেন বা পরে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে থাকেন।

আমার জলে ডোবার ঘটনাটা কৃষ্ণদেবপুরে পাড়ার সবাই জানতো—’জলের ভিতরে নাকি “জলকুমারী”(কাল্পনিক কোনো জলদেবী)থাকেন, তিনিই আমাকে ধরে রেখেছিলেন—এই রকম আর কি ?

ছোটবেলায় আমার শরীরটা নাদুস-নুদুস ছিল। তখনকার দড়ি দেওয়া প্যান্ট, প্রায়ই দড়ি ছিঁড়ে প্যান্ট খুলে যেতো ছেলেদের, কোনরকমে জড়িয়ে পরা হোতো__কিন্তু ছুটতে গেলেই আবার খুলে যেতো। ফলে একহাতে প্যান্ট ধরে ছুটতে হোতো।

আমার যখন ৬/৭ বছর বয়স তখন বাবা প্রথম বোতাম লাগানো “ইংলিশ প্যান্ট” কিনে দিয়েছিলেন। তখন আমাদের কি আনন্দ !

যাইহোক্, ছোটবেলায় আমি কিন্তু একটু হাবাগোবা ছিলাম। সবার সব কথা ভালোমতো শুনতে পেতাম না—আশেপাশে ঘটে যাওয়া সবকিছু দেখতাম ও না ভালো করে ! এমনকি সবার কথা ঠিক করে বুঝতেও পারতাম না! এইসব কারণে পাড়ার ছেলেরা আমাকে ‘ভোম্বল’, ‘কালা’ ইত্যাদি নামে ডাকতো। আমার ঐ আত্মভাবে থাকার সুযোগ নিয়ে তারা আমাকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিতো। যেমন ধরো, পাড়ার কোনো বৃদ্ধার কুলগাছে কুল পাড়তে হবে_ আমাকে একটা ঢিল ধরিয়ে দিয়ে বলতো, ‘মার গাছে ঢিলটা!’ আমিও ওদের কথা শুনে একটা ঢিল নিয়ে ছুঁড়ে দিতাম। কুল পড়তো, তারা কুড়িয়ে নিয়ে ‘দে ছুট্’। বাড়ীর বৃদ্ধাটি বেরিয়ে এসে আমাকে গালাগালি দিতো এবং বাড়ীতে গিয়ে মাকে আমার নামে complain করতো ! ছোটোবেলায় আমি এইসবের প্রতিবাদ করতে পারতাম না বা নিজের হয়ে সাফাই গাইতাম না কখনও !

ওই যে বলা হোলো _বৃদ্ধার কুলগাছ! কুলগাছ পাহারা দেবার সঙ্গে কোনো না কোনো বৃদ্ধার (বুড়ির) বেশ সম্পর্ক রয়েছে। দেখবে, যে কোনো গ্রামে দু-ঊকটা এমন কুলগাছ থাকে _যেটা পাহারা দেয় কোনো না কোনো বৃদ্ধা (বুড়ি)! আর ছেলের দল তার গাছেই বেশী ঢিল মারে। বুড়িটি যে গালাগালি দেয় _ সেটা ছেলেরা গায়ে মাখে না বরং মজা পায় ! তারা জানে তো _ বুড়ি আর যাই করুক মারবে না বা দৌড়ে তাদেরকে ধরতে পারবে না !

যাই হোক, আমার ছোটোবলায় পাড়ার ছেলেরা আমাকে আরও অন্য কাজেও লাগাতো, যেমন—কোনো পাঁচিল থেকে হয়তো আমগাছের ডাল নড়ালে আম পড়বে, ওরা সেই পাঁচিলে আমাকে তুলে দিতো ! তুলে দিয়ে ওরা আমাকে বলতো _‘ডালটা নড়া’! ওদের কথা না শুনলে হয়তো মারতে পারে, তাই আমি আমগাছের ডালটি নাড়িয়ে দিতাম । আম পড়তো, আর ওরা কুড়িয়ে নিয়ে পালাতো। আমি তো তখন‌ও পাঁচিলে। ফলে ঐ বাড়ীর লোক এসে আমাকে ধরে ফেলতো। ফলে হয় শাস্তি নাহয় বাড়ীতে complain ! মা-ও এসবের জন্য আমাকে বকাবকি করতেন —শাস্তিও দিতেন। বাবা থাকলে অবশ্য শাস্তি রদ্ হয়ে যেতো।।