জিজ্ঞাসু :– আপনার কাছে এসব শুনে মনে হোচ্ছে যেন, আমরা কোনো অপার্থিব জগতে চলে এসেছি এবং আপনি একজন অপার্থিব মানুষ। আরও কিছু আপনার বাল্যকালীন জীবনকথা শুনতে ইচ্ছা হোচ্ছে, যদি অনুগ্রহ করে বলেন ?

গুরুমহারাজ :— ৫ বছর বয়সে আমার ✓রী মাতৃদর্শন হয়েছিল। আমি দেখেছি_’৫’ এই সংখ্যাটা আমার জীবনে খুবই তাৎপর্যবহ। ৫ বছর বয়সে আত্মদর্শন বা মাতৃদর্শন হয়, ১০ বছর বয়সে আমার গৃহত্যাগ এবং পথে পথে ঘোরা শুরু, ১৫ বছর বয়সে হিমালয়ে গুরুকুলের সঙ্গলাভ, ২০ বছর বয়সে পূনরায় সমাজে প্রত্যাবর্তন এবং চাকরিতে যোগদান, ২৫ বছর বয়সে সন্ন্যাসগ্রহণ, ৩০ বছর থেকে বিভিন্ন স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা ও পরিপূর্ণভাবে গুরুভাব ধারণ, ৩৫ বছর বয়সে প্রথম বিদেশ যাত্রা আর(তখন গুরুমহারাজের ৩৯-বছর বয়স)৪০ বা ৪৫ বছর বয়সে আবার কি কি হবে তা ওই ✓রীমা জগদম্বাই জানেন(৪৫- বছর বয়সের পর‌ই গুরুজী শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন)!

জিজ্ঞাসু :– মাত্র ৫ বছর বয়সে আপনার মাতৃদর্শন হয়েছিল?

গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ, আমার তখন ৫ বছর বয়স, প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। ছোটবেলায় আমি ঐ রকম(একটু আত্মভাবে থাকা, আপনভোলা ছেলে)ছিলাম বলে আমার এক দিদির উপর মা আমার ভার দিয়েছিলেন, যাতে সঙ্গে করে সে আমাকে স্কুলে নিয়ে যায় বা নিয়ে আসে। কিন্তু দিদিরও তো তখন অল্প বয়স, একটা বাড়তি দায়িত্ব নিতে সেই বা রাজী হবে কেন ?

অভিভাবকদের ভয়ে সেই দিদি দায়িত্বটা নিয়েছিল বটে কিন্তু তার জন্য আমার লাঞ্ছনা ও বড় একটা কম হোতো না ! আমি তখন শিশুশ্রেণীতে পড়ি, ফলে আমাদের আগে ছুটি হোতো কিন্তু মায়ের আদেশ ‘দিদির সঙ্গে বাড়ী আসবি।’ তাই চুপটি করে দিদির ছুটি না হওয়া পর্যন্ত স্কুলের গেটে বসে থাকতাম । সব ছেলেরা চলে যেতো কিন্তু আমি বসে থাকতাম ! দিদির ছুটি হ‌ওয়ার পরে যখন ও আমাকে দেখতে পেতো__ আমি feel করতাম যে, দিদি খুবই বিরক্ত হোতো।

এক-একদিন দিদি আমার মাথায় গাঁট্টা মারতে মারতে বা ঠেলতে ঠেলতে বাড়ীতে নিয়ে আসতো। একদিন হয়েছে কি, ওরা বন্ধু- বান্ধব মিলে ঠিক করেছে – স্কুল যাওয়ার পথে যে পেয়ারাবাগান ছিল_ সেখান থেকে পেয়ারা চুরি করবে! কিন্তু ফেরার পথে আমি দিদির সাথে থাকলে ওদের খুবই মুস্কিল—কারণ আমি ওদের কীর্তির কথা বাড়ীতে বলে দেবই_ তা ওরা জানতো। কারণ আমি কখনও সত্য গোপন করতে পারতাম না। আর আমি বলে দিলেই মায়ের হাতে নির্ঘাত মার–সেটা দিদি ভালোমতোই জানতো! ছোটবেলা থেকেই ‘সত্যি কথা বলা’ সহজাতভাবে আমার স্বভাবে ছিল। এমনকি অন্য কেউ মিথ্যা কথা বললেও ধরে ফেলতে পারতাম। যে কোনো মানুষের মুখ দেখে বলে দিতে পারতাম—সে সত্যি বলছে কিনা ! আমার এই practice-টাকে আমাদের প্রতিবেশীরা কাজে লাগাতো। কারও কিছু হারিয়ে গেলে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি-টিষ্টি খাইয়ে জিজ্ঞাসা করতো, ‘বলো তো বাবা ! অমুক জিনিসটা কোথায় আছে বা কে নিয়েছে ?’ আমি অনেক সময় অপরাধী হাজির থাকলে নামটা বলে দিতাম, কোনো কোনো সময় এড়িয়ে যেতাম।

যাইহোক্, এইসব কারণে দিদি আমাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। তাই স্কুল যাবার সময় বলেই দিয়েছিল যে, আমার স্কুল ছুটি হয়ে গেলে __ সেদিন যেন আমি একা-একাই বাড়ি ফিরি। আমিও সানন্দে বলেছিলাম ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইটুকু পথ আমি একাই যেতে পারবো।’ ফলে সেদিন স্কুল-ছুটির পর বই বগলে নিয়ে আমি গুটি গুটি পায়ে বাড়ীর দিকে হাঁটছিলাম। তখন স্কুল থেকে আমাদের বাড়ী আসার পথে অনেকগুলি কলাবাগান পড়তো আর ঐসব অঞ্চলে তখন জনবসতিও কম ছিল, ফলে রাস্তাঘাট প্রায়ই জনশূন্য থাকতো। এখন(বর্তমানে) সেই সমস্ত জায়গায় পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লোকজনেরা ঘরবাড়ী করে ফেলেছে, আর রাস্তাঘাট ততোটা ফাঁকা নাই। রাস্তার উপরে একটা ডোবা ছিল, আর আমাদের পাড়ায় ঢোকার মুখে একটা শিবমন্দির ছিল। আমার চেনা রাস্তা—প্রতিদিনই ঐ পথে স্কুল যাওয়া-আসা করি, কাজেই অসুবিধার কোনো কারণ ছিল না।

কিন্তু সেদিন হয়েছিল কি জানো, শিবমন্দিরের কাছে আমি যেই এসেছি__ হঠাৎ দেখি একজোড়া কুকুর মিথুনরত অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এর আগে কখনোও ঐ অবস্থায় কোনো কুকুর দেখিনি, ফলে অবাক- বিস্ময়ে নিবিষ্টচিত্তে ঐ কুকুর দুটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম ! কতক্ষণ ঐভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ দেখি আমার ঠিক বিপরীত প্রান্তে অর্থাৎ কুকুরগুলোর উল্টোদিকে আমারই বয়সী একটি মেয়ে বড় বড় চোখে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে ! মেয়েটির গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ, একঢাল কালো চুল পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পরনে লাল পেড়ে খাটো শাড়ী— আঁটোসাঁটো করে বাঁধা, আর কপালে মস্ত একটা লালরঙের টিপ! আমি তার দিকে তাকাতেই সে আমাকে বলল, “কি দেখছিস্, জগৎ ? আয় আমি তোকে জগৎ দেখাবো।” এই বলে সে এগিয়ে এসে কুকুর দুটোর গলা দু’হাতে জড়িয়ে ধরে মাঝখানে বসল, আমিও এগিয়ে গেলাম তার চোখে চোখ রেখে। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে যেই ওর ঐ কপালের লাল রঙের টিপটার দিকে নজর গেল, অমনি মনে হোলো সেই টিপটা আস্তে আস্তে বড় হোচ্ছে, আর সেটা বড় হোতে হোতে এতো বড় হোলো, যেন তা দিকচক্রবাল ছাড়িয়ে সীমাহীন হয়ে গেল ! এরপরেই আমার চেতনা যেন তার মধ্যে কোথায় বিলীন হয়ে গেল। ঐখানে বেহুঁশ হয়ে কতক্ষণ পড়েছিলাম তার ঠিক নাই। দিদির ছুটি হবার পর সে দলবল নিয়ে পেয়ারা চুরি করে সেগুলো খেয়ে তবে বাড়ী গেছিলো।

যাওয়ামাত্রই মায়ের খোঁজ “ভাই কই ?” দিদি তো অবাক ! এখনো আসে নি ?? শুরু হোলো আমার খোঁজ—সবাই দৌড়ে বেরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে শুরু করেছে। তারপর বাবা আমাকে শিবমন্দিরের কাছে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দেখতে পান। প্রথমে সবাই ভেবেছিল—বুঝি সাপের কামড়ে আমি মারা গেছি। কারণ ভাদ্র-আশ্বিন মাসে কলাবাগানে সাপের খুব উৎপাত হয়, আর ঐ সময়ই আমাদের পাড়ার একটি ছেলে সাপে কেটে মারাও গিয়েছিল।

এরপর আমাকে বাড়ী নিয়ে গিয়ে মুখে-চোখে জল দেবার বহুক্ষণ পর আমার শরীরে চেতনা ফিরে এসেছিল। হুঁশ আসার পর আমি দেখলাম _মায়ের ব্যাকুল মুখখানি আমার মুখের উপর ঝুঁকে রয়েছে। সেই সময় আমার মা-ও কপালে বেশ বড় সিঁদুরের টিপ পরতেন। আমার চোখ মায়ের সেই সিঁদুরের টিপের দিকে যেতেই ফের তা বড় হোতে হোতে দিকচক্রবাল ছাড়িয়ে গেল, ফলে পুনরায় আমি চেতনা হারালাম!

ঐ অবস্থাটা আমার একটানা বেশ কয়েকদিন ছিল। তারপর অনেকটা সুস্থ হয়েছিলাম। কিন্তু ঐ যে মেয়েটি আমার জীবনে প্রকট হোলো __সে আমাকে আর ছাড়েনি। আমার সাথে-সাথেই সেও বড় হয়েছে, আর সদা-সর্বদা আমার সঙ্গে থেকেছে। ✓রী মায়ের সাথে সাক্ষাৎ হবার পর তার পরবর্তী কয়েকমাস যে আমার কি অবস্থা গেছে –তা তোমাদের কি বলি বলোতো ! ঐ মেয়ে আমাকে সুস্থ হয়ে খেতে দিতো না, শুতে দিতো না, শুধুই জগৎজ্ঞান, জগতরহস্য দেখাতো আর নানা কিছু শেখাতো !

রাত্রে সবাই ঘুমালে আমাকে ডেকে নিতো, তারপর বাইরে কোথাও নিয়ে চলে যেতো। কোথায় সে নিয়ে যায়নি ? গাছের ডালে, দিঘির জলে, পাহাড়ের মাথায়, মাঠের আলে—রাতের পর রাত কেটে গেছে তার সঙ্গে আমার ! বাবা জানতে পেরে এক-একদিন আমার জামার সঙ্গে ওনার গায়ের কাপড় বেঁধে রাখতেন, কিন্তু সে(মেয়েটি অর্থাৎ মা জগদম্বা)ঠিক খুলে দিতো। উঁচুতে খিল দিয়ে রাখতো বাবা, যাতে আমি নাগাল না পাই। সেই আমাকে কি করে খিল খুলতে হবে তা শিখিয়ে দিতো!

একদিন রাত্রে পুকুরের উপর দিয়েই টেনে নিয়ে যাচ্ছে, পাশের বাড়ীর কাকীমা দেখে মাকে বলেছিল, ‘তোমার ছেলেকে নিশিতে পেয়েছে দিদি, রাত্রে দেখলাম তোমার ছেলে জলের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেল।” আসলে উনি তো আর তাকে(মা জগদম্বাকে)দেখতে পাননি, শুধুই আমাকে দেখেছিলেন ফলে ঐ রকম ধারণা করেছিলেন। মা আর কি করেন ওঝা ডেকে ঝাড়ফুঁক করিয়ে নিলেন। তারা নানান অত্যাচারও করেছিল এই শরীরটার উপর। কিন্তু কিছুতেই কিছু হোলো না দেখে _তারা আর আসেনি, ফলে আমিও সাময়িকভাবে রেহাই পেয়ে গেছিলাম।।