এইবার নানু মহারাজের মুখ থেকে যে কথাটা শুনেছিলাম, সেটাও জানলে আপনারাও আমার মতোই কিছুটা ঘাবড়ে যেতে পারেন ! কারণ এই কথাটাও প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরের কথা। যদিও ওই কথা শোনার পর আমি চিন্তা করে দেখেছিলাম – ” ঠিকই তো ! গুরুমহারাজ তো ঠিক কথাই বলেছেন ! এইরকম কথা বলতে তো শুধুমাত্র গুরুমহারাজ যুগপুরুষ স্বামী পরমানন্দ-ই পারেন!” যাইহোক, ভনিতা ছেড়ে আসল কথায় আসি ৷
আমরা বিশেষতঃ যারা ভক্তিমার্গীয়, তারা কোনো না কোনো পরম্পরার ভক্ত (এই পথের ভক্তসংখ্যাই বেশি) এবং তারা সুযোগ পেলেই “ভবসাগর তারণ কারণ হে, …. গুরুদেব দয়া কর দীন জনে ৷” – সমবেত কন্ঠের এই প্রার্থনা সংগীতটি গাইবার সুযোগ পেলে তা নষ্ট করি না ৷ বনগ্রাম আশ্রম প্রতিষ্ঠার একেবারে গোড়ার দিকে অর্থাৎ যখন থেকে আশ্রমে প্রার্থনাঘর নির্মিত হয়েছিল এবং সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত প্রার্থনা হোতো – তখন গুরুজীর নির্দেশমতো শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণের আরাত্রিক ভজন (ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দ) এবং স্বামী তপেশ্বরানন্দের “পরমানন্দ বন্দনা” – এইগুলিই গাওয়া হোতো। পরবর্তীতে ভক্তদের নিজস্ব ইচ্ছায় “ভবসাগর তারণ .. দীন জনে ৷” – সংগীতটি সংযোজন হয়েছিল ৷
ফলে এই গানটিও বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে সকাল-সন্ধ্যায় প্রার্থনা সংগীত হিসাবে গাওয়া শুরু হয়েছিল। আমার যতদূর ধারণা এই গানটির সংযোজনের সময় বা তার পরেও বেশ কিছুদিন গুরুমহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে ছিলেন না (গুরুমহারাজ টানা তিন মাস, ছয় মাস এমনকি একবছর বা তার অধিক সময়ের জন্যেও বাইরে থাকতেন) ৷ তিনি আশ্রমে ফেরার পর অর্থাৎ বনগ্রামে থাকাকালীন সময়েও সকাল-সন্ধ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন, পরমানন্দ বন্দনার পর – ওই গানটিও গাওয়া হচ্ছিলো ৷ দু-চার দিন গুরুমহারাজের কানে এই গানটি যাওয়ার পর গুরুমহারাজ_ যে সমস্ত মহারাজেরা প্রার্থনা সংগীতের প্রধান শিল্পী ছিলেন অর্থাৎ যাঁরা মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন (হারমোনিয়াম বাজাতেন, তবলায় সঙ্গত করতেন ইত্যাদি) – তাঁদেরকে নিয়ে একটা আলোচনা করেছিলেন ৷
ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসীরা গুরুমহারাজের কাছে যাবার পর গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “এই গান(“গুরুদেব দয়া করো দীনজনে…”)-টা তোরা প্রার্থনা সংগীত হিসাবে পরমানন্দ মিশনে গাইবি না ৷ এটা আমার একদমই ভালো লাগে না ৷ দ্যাখ্_ তোরা পরমানন্দের শিষ্য নস্ – তোরা স্বামী পরমানন্দের সন্তান ! আমি তোদেরকে সন্তানবৎ-ই দেখি । তোরা রাজার ব্যাটা ! তাছাড়া তোরা কখনোই ‘দীন’ নস্ – পরমানন্দ সন্তানেরা ‘দীন’ হোতেই পারে না ৷ তাছাড়া তোরা আমার কাছ থেকে ‘দয়া’ ভিক্ষা করবি কেন ? ‘দয়া’ কথাটি খুব একটা গৌরবজনক শব্দ নয় ৷ ‘দয়া’ – শব্দটির মধ্যে উচ্চ-নিচ ভেদাভেদের ভাব রয়েছে, superiority-inferiority রয়েছে ৷ ‘দয়া’ স্বতঃস্ফূর্ত ভাব নয় – প্রেম স্বতঃস্ফূর্ত – স্বতঃউৎসারিত ৷ পরমানন্দের শুধু ‘প্রেম’-ই রয়েছে ৷ তোরা সেই প্রেমে অবগাহন কর্, অপার্থিব পরা-প্রেমে আপ্লুত হয়ে ওঠ্ ! এই প্রেমের প্রভাবে তোরাও এক-একটা ‘প্রেমিক’ হয়ে ওঠ দেখি ! আমি এটাই চাই। তোদের সংস্পর্শে যারা আসবে – তারাও এই প্রেমের স্পর্শ পেয়ে ধন্য হবে – প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ পাবে !
সুতরাং ‘গুরুদেব দয়া করো’, ‘গুরুদেব দীনজনে দয়া করো’ – এইসব বলবি না অথবা তোদের অন্তঃকরণে এইসব ভাব আনবি না ৷ এটা আমার ভালো লাগে না ৷
তোরা স্বামী পরমানন্দের সন্তান, তোরা সিংহশিশু ৷ ছাগলের দলে পড়ে “ব্যা – ব্যা” এখন হয়তো করছিস – এই যা ৷ যখনই স্বরূপের বোধ হবে – তখন তোরাই সিংহ গর্জন করবি, তোরাই তখন “সোহহম্ – সোহহম্ ” করবি !
