গুরুমহারাজ :— হ্যাঁ, এই দেহের ছোটোবয়সেই বলতে পারো। আমি তোমাদের একটা কথা প্রায়ই বলি ___ ‘শুধুমাত্র ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন বা যোগাভ্যাসেই যে কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ ঘটে তা কিন্তু নয় __অতি ভয়ে, অতি আনন্দে, অতি আবেগে ইত্যাদি যে কোনো ব্যাপারে ‘অতি’ কিছু করতে পারলেই কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ ঘটে যেতে পারে।
এই কথাটা তোমাদেরকে যে জোর দিয়ে বলতে পারছি তার কারণ, এই ব্যাপারটা আমি আমার জীবনে একেবারে প্রত্যক্ষ করেছি! ঘটনাগুলো বলছি শোনো, শুনলেই তোমরা ধারণা করতে পারবে।
প্রথমবারের ঘটনাটা ঘটেছিল যখন, তখন আমি বয়সে খুবই ছোটো। সেদিন সন্ধ্যার পরে আমার মা উনুনের সামনে বসে পিঠে তৈরি করছিলেন। টগবগ্ করে পিঠেগুলো দুধে ফুটছিল( মা তাঁর সন্তানদের জন্য দুধ পিঠে বানাচ্ছিলেন)আর সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে একটু বসার সুযোগ পেয়ে মা উনোনের সামনেই ঘুমে ঢুলতে শুরু করেছিলেন। সেই অবস্থাতে হঠাৎ করে মা হুমড়ি খেয়ে ঐ ফুটন্ত দুধের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ঐ বয়সেই আমি তৎক্ষণাৎ মাকে চুল ধরে টেনে তুলেছিলাম। মায়ের গলা থেকে বুক ও পেট পর্যন্ত পুরো অংশটাই একেবারে ঝলসে গিয়েছিল__ মায়ের অবস্থা দেখে আমি এমন ভয় পেয়েছিলাম যে সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা হারিয়েছিলাম। তবে আমার অন্তরজগতের চেতনা সদা জাগ্রত থাকে। ফলে ঐ অবস্থাতেই আমি মায়ের যাবতীয় কষ্ট নিজের শরীরে নেবার চেষ্টা করছিলাম । তখন দেখলাম আমার শরীরের অভ্যন্তরস্থ কুলকুণ্ডলিনী থেকে শক্তি বিচ্ছুরিত হয়ে শরীরটাকে ঠিক রেখে দিল এবং আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম। অবশ্য মায়ের ঘা সারতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল কিন্তু মায়ের বিশেষ কষ্ট হয় নি।
দ্বিতীয় ঘটনাটা যখন ঘটেছিল, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৪/৫ বছর। তখন থেকেই বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লে আমি প্রতি রাত্রিতেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তাম। সেইরকমই একদিন গভীর রাত্রে বাড়ী হোতে বেরিয়ে আমি বাঘনাপাড়া ষ্টেশন যাবার আগে যে কালভার্টটা আছে, ওখানে গিয়ে বসে ছিলাম। আমি তখনও জানতাম না যে, ঐ জায়গাতেই প্রচুর মানুষ ট্রেনে কাটা পড়েছিল ! ঐখানে এমনিতেই accident তো হোতোই এমনকি যারা suicide করতো__ তারাও ওইখানেই মরতো !
যাইহোক, সেই সময় সারারাত্রি ধরে আকাশের দিকে চেয়েই আমার সময় কাটতো ! প্রকৃতপক্ষে তখন আমার নিজেকে নিয়েই নানারকম experiment চলতো। সেদিন ঘটনাটা ঘটলো কি__ হঠাৎ একটা ট্রেন-আসার শব্দে আমি সচকিত হয়ে গেলাম এবং ট্রেনটা চলে যাবার পর “ওঁ-ও-ও-ও-” এইরকম একটা আওয়াজ পাচ্ছিলাম, আওয়াজটা ঠিক অনেকটা সাইরেনের মতো ! মনে হোচ্ছিলো যেন দূর থেকে শব্দটা ভেসে আসছিল। ধীরে ধীরে আওয়াজটা নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছিলো। প্রথমে ভাবলাম রেলের স্টাফেদের ট্রলি, কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম ট্রলিও নয় কারণ দূর থেকে দেখা যাচ্ছে উঁচু মতন কি একটা আসছে আর “ওঁ-ও-ও-ও-” আওয়াজের সঙ্গে একটা ধপ-ধপ্ আওয়াজ যুক্ত হোচ্ছে। ব্যাপারটা কি হোতে পারে—ভাবতে ভাবতেই ওটা একেবারে আমার সামনে এসে পড়লো। আর তাকে দেখেই আমার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল !
জিনিসটা কি ছিল বলো তো—একটা কবন্ধ !! দীর্ঘ দেহী আলখাল্লা মতো পরা, শুধু ধড়টা ধপ-ধপ্ করতে করতে রেললাইন বরাবর এগিয়ে যাচ্ছে, আর কাটা মুণ্ডটা রেললাইনের ঠিক মাঝখান বরাবর ড্রপ্ খেতে খেতে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে চলেছে, সেইটাতেই “ওঁ-ও-ও-ও-” করে শব্দ হোচ্ছে। এদিকে আবার কবন্ধটা দু’হাত বাড়িয়ে সেই কাটা মাথাটা(মুণ্ডটা) ধরার চেষ্টা করছে আর বিফল হয়ে হাতদুটো বুকে চটাস্ চটাস্ করে মারছে ! কারণ ধরতে গেলেই কাটা মুণ্ডুটা ড্রপ্ খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে কবন্ধটাও তাকে ধরার জন্য আরও একপা একপা করে এগোচ্ছে !
যাইহোক, চোখের সামনে এই দৃশ্যটা দেখে ভয়ে আমার শরীর একেবারে স্থির হয়ে গেল। আমি দেখলাম আমার মস্তিষ্ক থেকে একটা হিমশীতলতা ধীরে ধীরে নীচের দিকে নেমে আসছে। বুঝতে পারলাম একেই মৃত্যুর তুহিনশীতল স্পর্শ বলে। আমি প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে করে আমার বাক্ বন্ধ হয়ে গেল, আমার হাত-পা সব জমে যাবার মতো হোলো। আমি সব বুঝতে পারছিলাম, চিৎকার করতে চাইছিলাম, দৌড়ে পালাতে চাইছিলাম কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না! তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, অত্যন্ত ভয় পেলে মানুষের কি সাংঘাতিক অবস্থা হয় এবং এই অবস্থায় অনেক মানুষ হার্টফেল করে কেন মারা যায়!
তবে সেদিন আমার ক্ষেত্রে যা ঘটলো __আমি দেখলাম আমার কুলকুণ্ডলিনী থেকে ঊর্ধ্বমুখী(বিপরীত) একটা উষ্ণপ্রবাহ ঐ নিম্নমুখী শীতলতাকে resist (প্রতিরোধ) করতে করতে ওকে over come (অতিক্রম) করে ফেললো। এর ফলে আমার শরীরের সাড় ফিরে এলো —আমার বাগেন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক সবই ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। ঠিক তখনই আমি এক লাফে কালভার্ট থেকে নেমে দে দৌড়। এক দৌড়ে একেবারে ঘরে ঢুকেই বাবার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বাবা ঘুম থেকে ধড়মড় করে উঠেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—”কিরে কি হয়েছে?” আমি তখনো প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিলাম। একটু সুস্থ হয়ে বাবাকে সব কথা খুলে বলতেই বাবা বললেন, ”আর কখনও ওখানে যেয়ো না। বহুকাল থেকেই ওখানে অনেকজন লাইনে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ও ট্রেনে কাটা পড়েছে। তাই ‘খ্যানে- অখ্যানে’ ওখানে নানারকম অশরীরী—প্রেতাত্মা দেখতে পাওয়া যায়, অনেকেই দ্যাখে। আমিও কয়েকবার দেখেছি।”
এই ঘটনার পর বাবা আমাকে একটা শিবের কবজ তৈরি করে দিয়েছিলেন, যাতে আমার কোনো রকম বিপদ-আপদ না হয়। অনেকদিন পর্যন্ত সেই কবজটা হাতে ছিল। তারপর বাবার মৃত্যুর পর ওটা কোথায় খুলে পড়ে গেছিলো।
আমার তৃতীয় ভয় পাওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল হিমালয়ে গোমুখ যাবার পথে। একদল যাত্রীর সাথেই যাচ্ছিলাম। মাঝরাস্তায় বৃষ্টি হয়ে গেল, বরফাকীর্ণ পাহাড়ি পথ, আমার বয়সও তখন খুব বেশী নয়, ১১/১২ বছর হবে, কাজেই একটু পিছিয়ে পড়ছিলাম। সঙ্গীরা আগে কোথায় ডেরা নেবে_ তা জানিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে গেল। এবার সন্ধ্যার মধ্যে সেখানে পৌঁছাতে হবে__ নাহলে পথে ভালুকের ভয়! কাজেই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি আমি এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম। আমার হাতে একটা গাছের ডাল ছিল_যেটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করা যেতো। চড়াই-উতরাই ভেঙে এগিয়ে চলছিলাম। ঠিক সন্ধ্যার প্রাক্কালে পথের একটা মোড় ঘুরতেই দেখি একেবারে আমার সামনে হিমালয়ান বিয়ার – মস্ত বড়ো এক ভল্লুক ! হঠাৎ করে তাকে দেখেই আমার মনের মধ্যে সেই ‘ভয়’ ক্রিয়াশীল হোলো। ঐ অবস্থায় আমার পিছুবার উপায় ছিল না, কারণ নিচে ঢাল — বেসামাল হোলেই কয়েকশো ফুট নিচে ! আবার উপরে উঠে পালাবারও উপায় নাই_কারণ সামনে ঐ ভল্লুক ! তাছাড়া পিছন দিকে পালাবার তেমন আমার শরীরের ক্ষমতাও ছিল না কারণ কয়েকদিন ধরে পাহাড়ি পথ হাঁটায় শরীরটা খুবই ক্লান্ত ছিল।
এক পাশে খাদ আর এক পাশে খাড়া পাহাড় । এই অবস্থায় ভল্লুকের হাতে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কি উপায় থাকতে পারে ! আমি তখনও কিছু উপায় মাথায় আনতে পারছিলাম না। এদিকে ভয় আমাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল, ফলে সেবারও ঐ একই রকমভাবে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল সমগ্র শরীরে এবং একই রকমভাবে কুলকুণ্ডলিনী থেকে উষ্ণ শক্তি সঞ্চারিত হয়ে শরীরকে সাম্যতা দান করলো।
কিন্তু আমি ঐ যে অতোক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম_ ভল্লুকটাও চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। তারপর আমি লাঠিটাকে দু’হাতে আড়াআড়ি ধরে ভল্লুকটার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম, ভল্লুকটাও কয়েক পা এগিয়ে এসে লাঠিটাকে দু’হাতে ধরে ফেললো। আমি ওটাকে একটু পিছনে ঠেলার চেষ্টা করলাম, ও-ও আমাকে পিছনে ঠেলার চেষ্টা করলো। এই ভাবে একটু ঠেলাঠেলি করতে করতেই আমি ওর দু-পায়ের ফাঁক গলে সোজা দৌড়ে উপরে উঠে চলে এলাম। অনেকটা উঠে এসে দেখছি ও তখনও দু’হাতে লাঠিটা ধরে কারোকে যেন ঠেলছে ! আমি আর সময় নষ্ট না করে উপরে উঠতে লাগলাম এবং আমাদের যেখানে রাত্রে থাকার কথা সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম।।
