জিজ্ঞাসু :— এই যে বনগ্রামের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই আশ্রম গড়ে উঠেছে __ এই আশ্রমটি এখানেই হবে, অনাথ শিশুরা এখানে পড়াশুনা করবে, বহু মানুষের কল্যাণ হবে __এইগুলি কি ছোটবেলা থেকেই আপনি জানতেন বা এই লক্ষ্য নিয়েই কি আপনি সাধন-ভজন করতেন ?

গুরুমহারাজ :— আমি তো তোমাদের আগেই বলেছি যে, আমি সদা জাগ্ৰত । আমাকে কি করতে হবে, কেন আমার আসা– এইগুলি সম্বন্ধে সব সময়ই আমি সজাগ। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখবে __’কাল বহুৎ বলবান!’ এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের সবকিছুই কালের অধীনে ! ফলে কাল পূর্ণ না হোলে কোনো কিছুরই প্রকাশ হয় না। যে ব্যক্তি ভাবে, ‘আমি এখনই এটা করবো’ অথবা ‘ওটা করবো’ —সেই ব্যক্তি মূর্খ ছাড়া আর কিছুই নয়। জ্ঞানীগণ ঐজন্য প্রথমেই কালের অধিষ্ঠাত্রী দেবী “কালী”-কে প্রসন্ন করেন এবং তাঁর কাছে জেনে নেন __’কালের গহ্বরে কি সত্য নিহিত আছে’? কাল প্রসব করেন কালী, তাই তো কালীকে ‘মা’ বলা হয়ে থাকে। কালী সবার মা, মাকে প্রসন্ন করলে মা জানিয়ে দেন কালের গর্ভে কি কি ঘটনা ঘটতে চলেছে__ আর সেখানে তোমার ভূমিকাটাই বা কি_তাও দেখিয়ে দেন।”

আমার ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছিল, ✓রী মা আমাকে আগে থাকতে সবকিছুই দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কারণে কোনো লক্ষ্য নিয়ে চলা বা কোনো plan করে চলার কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার জীবনে ছিল না ! হ্যাঁ, লক্ষ্য একটাই ছিল সেটা হোচ্ছে__ “সত্যলাভ”। ✓রী মায়ের এই জগতের অন্তর্নিহিত সত্যটি কি তা জানার জন্যই আমি ছোটবেলা থেকে ছুটে বেড়িয়েছি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, পরিভ্রমণ করেছি মাঠ-ঘাট-পাহাড়-পর্বত -জঙ্গল, পার হয়েছি জলাভূমি- পার্বত্যভূমি-মরুভূমি!!

এই জগৎ-সংসার থেকে কি গ্রহণ করতে হবে আর কি ত্যাগ করতে হবে তা আমি খুব ছোটোবয়েস থেকেই জেনে গিয়েছিলাম । আমি এটাই জেনেছিলাম যে__’যা মানবতাবিরোধী তা পরিত্যজ্য আর যা মানুষকে অন্তর্মূখী করে তা গ্রহণঈয়।। এইজন্যই আমি বলি, আধ্যাত্মিকতা হোচ্ছে __Art of Life এবং Art of Living। আমি তোমাদের এমন কথাও বলছি—যদি বেদ-বেদান্তের মধ্যে অথবা কোনো মহাপুরুষের বাণীতে বা তাঁদের শিক্ষায় মানবতা বিরোধী-জীবনবিরোধী কোনো কথা ‌থাকে_তাহলে তা পরিত্যজ্য! যদিও ভারতীয় প্রাচীন শাশ্ত্রগুলিতে(বেদ-বেদান্ত) জীবনবিরোধী শিক্ষা থাকতেই পারে না কারণ জ্ঞানের এবং প্রেমের চরমভূমি থেকে শাশ্ত্রগুলি উদ্‌গীত হয়েছ। তবু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্ৰক্ষিপ্ত অনেক শ্লোক ভারতীয় শাশ্ত্রাদিতে ঢুকে পড়ে, আসলের সাথে জায়গা করে নেয় । আর সেগুলি কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছে ধরা পড়ে যায়। কারণ প্রকৃত আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জীবনধারা বা জীবনবোধের সঙ্গে ঐগুলি মেলেনা _ তাই ধরা পড়ে যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ এমনই যে , তারা প্রচলিত ধ্যান-ধারণা থেকে সরতেই চায় না।মহাপুরুষগণের যুগোপযোগী সংশোধন– তারা মানতে চায় না, বলে, ‘ভুল থাকলেও আগেরটাই ঠিক, কারণ ওটা আমাদের মহান Heritage। আমরা ঐটাই মেনে চলবো–অন্য কিছু মানবো না !’ আর এই নিয়েই নতুনপন্থীদের সাথে পুরাতনপন্থীদের মধ্যে বিবাদ হয়ে থাকে! এইজন্যেই যুগে যুগে বর্তমানের মহাপুরুষেরা পুরাতনপন্থী গোঁড়াদের হাতে নিগৃহীত হ’ন, এমনকি মারাও পড়েন!

এইটাই মানবসভ্যতার ইতিহাস, ধর্মজগতের বিবর্তনের ইতিহাস! বারবার যার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে, আর এটা এখনো চলবেও বেশ কিছুকাল!
কৈলাস আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী বিদ্যানন্দ গিরি আমার সন্ন্যাস সংস্কার করেছিলেন। উনি আমাকে সংস্কার করার পর বিভিন্ন বিধি- নিষেধের কথা এবং ‘বিধি- নিষেধ মেনে চলা’ সহ ‘পরম্পরা রক্ষার জন্য সবকিছু মানারও প্রয়োজন আছে ‘—এইসব কথা বলেছিলেন। আমি ওনাকে বলেছিলাম, ‘ম্যায় পরম্পরাকা গুলাম নেহী হুঁ’, এই বলে চলে এসেছিলাম।

আমি ওনাকে যেটা বলেছিলাম _ওটা বলাটা একটা সাংঘাতিক ব্যাপার ! কিন্তু আমার ঐকথা বলতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কারণ আমি কোনো লৌকিক পরম্পরার গুরু নই, আমি লোকোত্তর পরম্পরার গুরু।

স্বামী বিবেকানন্দও দক্ষিণ-ভারত ঘোরার সময় আচার্য শংকরের নানান বিধি-নিষেধ, নারী ও শুদ্রদের সম্পর্কে সঙ্কীর্ণ মতামত __এইসব শুনে বলেছিলেন, “সত্যিই যদি আচার্য শংকর এসব বলে থাকেন, তাহলে তাকে আমি একটা দক্ষিণী ভট্টচার্য ছাড়া আর কিছু মনে করি না”। দেখেছো তো কেমন বীর বাণী !

শংকরাচার্যেরই প্রতিষ্ঠিত দশনামী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেও প্রতিষ্ঠাতার কোনো জীবনবিরোধী বক্তব্যকে কিভাবে ঘা মেরেছেন স্বামীজী !! …. (ক্রমশঃ)