(পূর্ববর্তী আলোচনায় গুরু মহারাজ তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে কথা বলছিলেন। আজ তার পরবর্তী অংশ….)

…….. ভ্রমণকালে আমি দেখেছি – বেশিরভাগ মঠ-মিশনে শুধু বিধিনিষেধ, আর নিয়মের নিগড়! মূল লক্ষ্য হ‌ওয়া উচিত ছিল ছিল ঈশ্বরলাভ বা আত্মসাক্ষাৎকার, সেইসব ধুয়ে-মুছে দিয়ে শুধুই বাঁধাধরা কিছু নিয়ম-পালন ঠিকমতো হোচ্ছে কিনা —এইটার উপরেই সব জোরটা দেওয়া হয়। ছোটোবেলায় আমি যখন উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরছিলাম, তখন হরিদ্বারের এক আশ্রমের মহারাজ আমাকে বলেছিলেন _’যদি এখানে থাকতে চাও– তাহলে ভোর সাড়ে তিনটেয় উঠতে হবে, চারটেয় স্নান করতে হবে, ছটা পর্যন্ত ধ্যান করতে হবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি! ঐ কথার উত্তরে আমি তাঁকে বলেছিলাম, “আপনার অতসব নিয়ম আমি মানতে পারবো না। রাত্রিতে আমার ক্লান্তি এলে আমি বিশ্রাম করি, ক্লান্তি কেটে গেলেই উঠে পড়ি এবং তারপর প্রাতঃকৃত্য ও স্নানাদি সারি। অকারণ বিশ্রাম নেওয়া বা আলস্য করে শুয়ে থাকা—এগুলো আমার অভ্যাসে নাই।’ তিনি আমার কথাগুলো বুঝতেই পারছিলেন না ! তখন আমি তাঁকে আমার বাউণ্ডুলে জীবনের কথা বলতে লাগলাম –কোথায় কখন রাত্রি কাটে তার ঠিক নেই, হয়তো সারারাত বর্ষণ হোচ্ছে—আর গাছতলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার রাত্রি কেটে যাচ্ছে ! বর্ষণের শেষে হয়তো ঐ গাছতলাতেই একটু বিশ্রাম নেওয়া হোলো ! আমার ছিল _’চলা পা আর বলা মুখ’ ! চলতে চলতে হয়তো কয়েকদিন ক্রমাগত অনাহারে কেটে যেতো, তারপরে হয়তো কোনোদিন একটু আহার জুটলো। ঐ অবস্থায় চরম ক্ষুধায় অনেক সময় ফেলে দেওয়া কলার খোসা, শসার খোসা খেয়েও আমাকে দিন কাটাতে হয়েছে !

তাহলে এই যার জীবন, সেই জীবনে প্রচলিত নিয়ম বা শৃঙ্খলা কি করে আসবে ? আমার কাছে এইসব কথা শুনে ঐ সাধুটি একদম চুপ করে গেলেন ! কোনো কথাই বলেছিলেন না ! এবার আমিই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা এতো নিয়মের কড়াকড়ি করে কি লাভ হয় ?’ উনি বললেন, ‘নিয়ম- পালন মানে অভ্যাসযোগ, এতে ইন্দ্রিয় সংযম হয়’ ! আমি বললাম, ‘আমি অসংযমী নই, এসব না মেনেও তো আমার কোনো অসুবিধা কখনও হয়নি ! তাহলে আমি এসব মানতে যাবো কেন ?

দ্যাখো, অভ্যাসযোগ বা যোগাভ্যাস সবই ভাল, এগুলো অনেকরকম বন্ধন কাটাতে সাহায্য করে কিন্তু পরে অভ্যাসটাই একটা নতুন বন্ধন সৃষ্টি করে ! তাহলে আমি আবার আট্‌কাতে যাবো কেন ? এমনিতেই আমি মুক্ত আছি—সেটাই ভাল নয়কি ?’ সাধুজী আর কিছু না বলে চুপচাপ উঠে গেলেন।
এখানে এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, সাধারণতঃ মানুষ যেভাবে ভবিষ্যৎ ভাবনা করে –ছোটোবেলা থেকেই আমি সে ভাবে কখনও ভাবি নি। রুরাল ইলেকট্রিফিকেসনে কাজ করাকালীন কিছু সহকর্মী বন্ধু ছিল, যারা আমাকে প্রায় বলতো ‘রবীনদা কিছু টাকা সঞ্চয় করো—ভবিষ্যতে কাজে লাগবে! Fixed Deposit Scheme-এ টাকা রাখো, তাহলে পাঁচ বছরে Double , দশ বছরে চারগুণ(তখন ব্যাঙ্কে, পোষ্ট অফিসে ফিক্সড ডিপোজিট 5 বছরে ডআবল্ হোতো) হবে’ ইত্যাদি। আমি ওদের একজনকে বললাম, ‘তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখো, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

পরবর্তীকালে ছেলেটি ধান-চালের ব্যবসা করতে লাগলো। একদিন দেখা হোতেই একথা-ওকথায় জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার ব্যবসা করতে কত টাকা খরচা হলো ?’ ও আমাকে মুখে মুখে প্রায় বেশ কয়েক লক্ষ টাকার হিসাব দিল। আমি বললাম, ‘তোমার তো Deposit ইত্যাদি তে সঞ্চয় ছিল কয়েক হাজার টাকা Fixed , ওটা তো এখন কাজে লাগলো!’ ও উত্তর দিলো ‘ঐ টাকাতে আর কি হবে? কয়েক কাঠা জায়গার দামও হবে না ! জানো তো আজকাল জায়গার যা দাম !’ আমি ওকে বললাম, ‘তাহলে দ্যাখো, তুমি একসময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে ছিলে এবং কিছু সঞ্চয়ও করেছিলে কিন্তু আজ যখন সেই ভবিষ্যৎ বর্তমান হয়েছে, তখন আর তোমার পূর্বের কোনো হিসেব সেখানে কার্যকর হোচ্ছে না’ ।

এমনটাই হয় জানোতো __তবু মানুষ বর্তমানে থেকেও পুনরায় ভবিষ্যতের জন্যে ভাবনা ভাবছে –ভবিষ্যতের জন্যে সঞ্চয় করছে, কিছু না কিছু কাজ সে করেই যাবে।
তবে এখানে একটা কথা রয়েছে__কাজ সবাই করছে কিন্তু কাজের কাজ আর হয়ে ওঠে কোথায় ?!!! এইজন্যেই মানুষকে বারবার কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে ফিরে আসতে হোচ্ছে।

আমি এসব রহস্য ছোটো থেকেই জ্ঞাত ছিলাম। আমার .ভবিষ্যতকে তাই সবসময়ই মায়ের হাতে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে সদা- সর্বদাই আমি নিত্য বর্তমানে থাকি। যেখানে অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই—শুধুই বর্তমান আর বর্তমান! তবে ছোটবেলায় আমার নানারকম ভাব হোতো, সে সময় আমি ভাবের ঘোরে অনেক কথা বলতাম । এখানকার কথা, আশ্রম জীবনের কথা, তৃষাণ-সম্বিত-দেবেন্দ্রনাথ-বনগ্রাম—এইসব নাম বেরোতো আমার মুখ দিয়ে! পরে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘হ্যাঁরে তুই যেসব নাম বলছিলি, তারা সব কারা ?’ আমি বলতাম—তোমার সাথে এদের সবার দেখা হবে— দেখা হয়েছিলোও ৷৷