গুরুমহারাজ :– না-না, কোনো একটা নির্দিষ্ট ‘ভাবে’ আমি কখনোই সীমায়িত থাকিনি। এখনও তোমরা যখন আমাকে দ্যাখো, আমার সাথে মেলামেশা করো—তখন আমাকে কি তোমাদের একঘেয়ে মনে হয় ?
দ্যাখো, প্রতিদিনই আমরা সাধারণভাবে দেখি __সূর্য পূর্বদিকে ওঠে এবং পশ্চিমদিকে অস্ত যায়। কিন্তু প্রতিদিনের সূর্য ওঠাকে বা প্রত্যেক সকালকে কি তোমাদের একঘেয়ে মনে হয় ?–কখনোই তা মনে হয় না। কারণ তোমরা জানো যে, প্রতিটি সকালই এক নতুন সকাল। আগের সকালের সঙ্গে পরের সকালের কোনো একঘেয়ে সাদৃশ্য থাকতে পারে না! ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি ?
আমার ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়, আমি নিত্য বর্তমানে থাকি ! স্থান-কাল-পাত্রভেদে যখন যে ‘ভাব’ অবলম্বন করলে তোমাদের ভালো হবে অর্থাৎ সকলের মঙ্গল হবে-কল্যান হবে, আমার সেই ‘ভাব’ থাকে। একটাই ‘ভাবে’ আমি যদি থাকতাম__ তাহলে তোমরা আমার সাথে মিশতেই পারতে না। আমার প্রকৃত ‘ভাব’ কি জানো তো—”আকাশবৎ”। সেখানে কোনোকিছুই নাই। এই যে আশ্রম, তৃষাণ-মুরারী—এদের সঙ্গে আমার কতো সম্পর্ক, ওদের সাথে কতো আলোচনা এবং তোমাদের সকলের সঙ্গেও ভালবাসার সম্পর্ক— এসব কিছুই সেখানে স্থান পায় না। যাই হোক _এখন এসব কথা থাক্, তোমার জিজ্ঞাসার উত্তরে ফিরে যাই।
ছোটবেলায় যখন আমার বয়স ৫ বছর, তখন আমি মোট ৫ জনকে দীক্ষা দিয়েছিলাম। এরমধ্যে তিনজন বৃদ্ধা ও দুজন বৃদ্ধ ছিল । এদের মধ্যে একজনের বয়স প্রায় আটের ঘরে ছিল। আর একজনের নাম ছিল ‘রামকৃষ্ণের মাসি’। ওর অন্যকিছু নাম নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু ওর যখন বয়স খুবই কম তখন ওর স্বামী মারা যায় অর্থাৎ উনি বাল্যবিধবা ছিলেন। তখনকার দিনের বাল্যবিধবারা বাকি জীবনটা ধর্মকর্ম নিয়েই কাটিয়ে দিতো। তখন কালনার ভগবানদাস বাবাজীর খুব নামডাক ! ফলে ঐ অঞ্চলের বহু মানুষ ওনার আখড়ায় যাওয়া-আসা করতো। ঐ সময় একবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব কালনায় ভগবানদাসজীর আখড়ায় এসেছিলেন, ফলে ওই মেয়েটি ঠাকুরকে স্বচক্ষে দেখেছিলো। তখন ওর খুবই ছোটো বয়স ছিল । ফলে শ্রীরামকৃষ্ণদেব সম্বন্ধে তার অতোকিছু জানাও ছিল না, আর ঐ বয়সে তা সম্ভবও ছিল না।
কিন্তু পরবর্তীকালে সবাই যখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব সম্বন্ধে আলোচনা করতো, তাঁর ছবি ঘরে ঘরে পূজিত হতে লাগলো__ তখন ঐ বৃদ্ধা সবাইকে হেঁকে ডেকে বলতো, ”তোদের ‘রামকেষ্ট ঠাকুর’-কে আমি নিজের চোখে দেখেছি”। কিন্তু কেউই তার কথা বিশ্বাস করতো না__ তারা বলতো ‘’তা তুমি আবার দেখবে না, তুমি ‘রামকেষ্টর মাসি’ ছিলে যে !” ও গালাগালি দিয়ে বলতো — ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি তাই-ই!” কিন্তু এই নিয়ে ওর মনে খুব দুঃখ ছিল। ও সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভাবতো—সত্যই কি ও ভুল কিছু দেখেছে ! মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতো যেন আবার ঠাকুরের সঙ্গে তার দেখা হয়।
যাইহোক্, আমার মায়ের সঙ্গে ওই মহিলার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, তাই ও প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতো। আর আসার পরই আমার সাথে অধিকক্ষণ সময় কাটাতে চাইতো। জানো, ওর কাছে সবসময় একটা ঝিনুকের খোলা থাকতো, গরমকালে ওর গায়ে খুব ঘামাচি হোতো আর আমাদের বাড়ির ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদেরকে বলতো _ঝিনুকের খোলা দিয়ে ওর গায়ের ঘামাচি মেরে দিতে ! ওর আঁচলে বাঁধা নাড়ু থাকতো, ও বলতো _ ওর ঘামাচি মারলে ও আমাদেরকে নাড়ু খাওয়াবে।নাড়ু খাওয়ার লোভে আমরা তাই করতাম। ঐ মহিলা আমার জন্য প্রায়ই কিছু না কিছু খাবার লুকিয়ে নিয়ে আসতো, আর আমাকে ওর ছোটোবলার ‘রামকৃষ্ণ দেখা’-র গল্প বলতো ! আমি বলতাম ”হ্যাঁ মাসী, তুমি ঠিকই তাঁকে দেখেছো”। একথা শুনে ও মনে শান্তি পেতো ।
এরমধ্যেই ঐ মহিলার ধ্যানজপ করার সময় একদিন কিছু একটা দর্শন হয়েছিল। পরদিন সকালেই কাঁদতে কাঁদতে ও আমাদের বাড়িতে চলে এলো এবং এসেই আমাকে ধরে বললো, ‘আমি তোমার মধ্যেই আমার ইষ্টকে দেখেছি। কিন্তু আমার তো আর বেশি সময় নাই_ যে তোমার জন্য কিছু করি ! তাই আমায় এমন একটা কিছু দাও_ যাতে আবার তোমার কাছে আসতে পারি, তোমার সেবা করতে পারি’।
ওর কথা শুনেই আমার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল ! অন্তর থেকে প্রেরণা আসতে লাগলো, ‘ওকে দীক্ষা দাও’। তারপর ঐ ঘরেই নির্জন দুপুরে ওর মাথাটাকে বাঁ হাতে টেনে আমার মুখের কাছে নিয়ে এসে ওর কানে মন্ত্র দিলাম! দেখেছিলাম ওর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো দরদর করে ! আর আমি এক ছুটে ছেলের দলের সঙ্গে খেলা করতে শুরু করে দিলাম। এর কিছুদিন পরেই ওই মহিলা মারা গিয়েছিল।……. (ক্রমশঃ)
