জিজ্ঞাসু :– আপনি ধর্মবতী মাকে রান্না করে খাইয়েছিলেন–বিশ্বাসই হোচ্ছে না?
গুরুমহারাজ :— এই দ্যাখো! আমি রান্না করতে পারি না নাকি !! এই তো এখানে(সিটিং-এ)-ই অনেকে রয়েছে, যাদের আমি রান্না করে খাইয়েছি। বনগ্রাম আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর একেবারে প্রথম দিকে যখন কয়েকজন ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারীনীরা থাকতে লাগলো _তখন থেকে আশ্রমেই রান্না করা শুরু হয়েছিল(তার আগে ন’কাকাদের বাড়িতেই সকলের খাবার ব্যবস্থা হোতো)। তখন কতদিন আমি রান্না করেছি। তখন স্বরূপানন্দ, কৃষ্ণানন্দ, আত্মানন্দ, মুরারী প্রমূখরা সবাই পালা করে রান্নাঘরের দায়িত্ব সামলাতো।
আর উত্তরকাশীতে থাকাকালীন আমি আমার গুরুদেব রামানন্দজীকেও রান্না করে খাওয়াতাম। একদিন একটু লঙ্কা দিয়ে শাকের ঝোল রান্না করে ওনাকে দিয়েছিলাম। সেদিন কি দেখেছিলাম জানো__খেতে বসে উনি(অবধূতজী)খাওয়া বন্ধ রেখে চুপ করে বসে আছেন, আর ওনার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল। এইটা দেখে আমি ভাবলাম রান্নার বোধহয় কোনো ত্রুটি হয়েছে ! তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “গুরুদেব কি হয়েছে, আমার রান্না কি কিছু খারাপ হয়েছে ?”
দ্যাখো, গুরুর সেবা করা তো নয়, পদে পদে ভয় থাকে সেবা-অপরাধ হবার— সেইজন্যই বুদ্ধ-শিষ্য আনন্দ ভগবান বুদ্ধের সেবা করার অধিকার পেয়েও কতকগুলি শর্ত আরোপ করে নিয়েছিলেন। বুদ্ধ সেইসব শর্তে রাজী হবার পর, তবেই আনন্দ সেবার কাজ শুরু করেছিলেন।তবে এখানে একটা কথা রয়েছে __সদগুরু তাঁর শিষ্যদেরকে সন্তানরূপে দেখেন, তাই শিষ্যরা ছোটোখাটো অন্যায়-অপরাধ করলেও তাদের সেবা-অপরাধ হয় না।
যাইহোক, আমার ক্ষেত্রেও সেবা অপরাধ হবার সম্ভাবনা কমই ছিল। কারণ আমার দ্বারা এইরূপ কোনো অপরাধ হয় নি _ সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। আসলে আমি যে কোনো কাজ ১০০ ভাগ মনোযোগ সহকারে করে থাকি। আগেও আমি অনেকের সেবা করেছি _কারও সেবা করার সময় আমি কখনো ঐ কাজকে ‘খেদমদ খাটা’ ভাবিনি। পরিভ্রমণ কালে আমি কুষ্ঠাশ্রমে গিয়ে কুষ্ঠরোগীদের সেবাও করেছিলাম এবং সেখানেও আমার ১০০ ভাগ মনোযোগই থাকতো! আর এই রকমটাই থাকতো আমার গুরুদেবের সেবার সময়েও ! তবু গুরুদেবের চোখে জল দেখে স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞাসাটা মনে এসেছিল। গুরুদেব আমার দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “তোমার এই রান্না খেয়ে আমার বহুকাল পূর্বের স্মৃতি জাগ্রত হোলো। আমার মা ছোটবেলায় ঠিক এমনই ঝোল রাঁধতেন আর তার Taste ছিল ঠিক এমনি! তুমি আমার মায়ের মমতাকে মনে করিয়ে দিলে বাবা!” একজন জ্ঞানীর চোখে জল দেখে আমি বুঝলাম, “প্রেমের স্পর্শে জ্ঞানের কাঠিন্যও তরলে পরিণত হয়।
আর একদিন দুপুরে উনি (রামানন্দ অবধূতজী) একটু বেশী খেয়ে ফেলেছিলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম, উনি ওনার হাতে থাকা একটা ছোট লাঠি কাঁধে আড়াআড়ি ফেলে তার উপরে দুদিক থেকে দুটো হাত চাপিয়ে শিরদাঁড়া খাড়া করে পায়চারি করছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এটা কি করছেন ?’ উনি উত্তর দিলেন, ‘বেশী খাওয়া হয়েছে, তাই হজম যাতে তাড়াতাড়ি হয়, তার ব্যবস্থা করছি’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটা কি কোনো মুদ্রা বা যোগাসন?’ উনি বললেন, ‘জঙ্গলে বানর বা এই জাতীয় প্রাণীর কাছ থেকে পাওয়া এই বিদ্যা । ওদের কোনো কারণে বেশী খাওয়া হয়ে গেলে ওরা ঠিক এইভাবে পায়চারি করে এবং তাতে খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যায়। ‘
কি রকম কাণ্ড দ্যাখো, প্রচলিত যোগব্যায়ামের বইতে এইসব আসন বা মুদ্রা পাওয়া যাবে না ! আমি পরে দেখেছি বেশী খাওয়া হয়ে গেলে বা হজমের গণ্ডগোল হোলে__ বাম ও ডান হাতদুটি আনুভূমিকভাবে মুড়ে, হাতের মধ্যমা ও তর্জনী এই আঙুল দুটি যথাক্রমে বাম ও ডান কাঁধে touch করিয়ে রেখে_ শিরদাঁড়া সোজা করে ৫/৭ মিনিট পায়চারি করতে পারলেই সাংঘাতিক ফল পাওয়া যায়। তোমরা মিলিয়ে দেখো—ভাল ফল পাবে ৷৷
