গুরুমহারাজ :— যিনি দেন তাঁকেই দেবতা বলা হয়। হিন্দিতে বলে, ‘যো দেতা হ্যায়, ওহি দেবতা হ্যায়’। কে দেন ? – পিতা শরীর দেন, মাতা জন্ম দেন—পালন করেন, গুরু বা আচার্য শিক্ষা দেন– তাই না ! এইজন্য ভারতীয় শাশ্ত্রাদিতে বলা হয়েছে_ “আচার্যদেবো ভবঃ”। –”পিতৃদেবো ভবঃ”, “মাতৃদেবো ভবঃ”!

এছাড়া সূর্য, অগ্নি, বরুণ,ইন্দ্র,মিত্র ইত্যাদিদেরকেও ‘দেবতা’ বলা হয়েছে। কারণ এঁরা জীবজগতের কল্যানের জন্য কিছু না কিছু দেন– তাই এঁরা সকলেই ‘দেবতা’। এইভাবে আমাদের দেহের দশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চভূত, ত্রিশরীর(স্থুল, সূক্ষ্ণ,কারণ)-সৃষ্টিকারী পঞ্চকোষ, চিত্তে অবস্থিত মন-বুদ্ধি ও অহংকার ইত্যাদি এইসব নিয়ে দেহকে কেন্দ্র করেই রয়েছে তেত্রিশ দেবতা। এইটাকেই অন্যত্র তেত্রিশ কোটি দেব-দেবী হিসাবে চালানো হয়েছে [কোনো কোনো পন্ডিত ব্যক্তি দ্বাদশ আদিত্য,একাদশ রুদ্র,অষ্টবসুও অশ্বিনীকুমারদ্বয়–এইভাবে তেত্রিশ করেছেন। কিন্তু গুরু মহারাজ সবকিছুকেই ‘ভান্ডে ব্রহ্মান্ড তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখা করতেন] !

এইভাবে যিনি কিছু দেন__তাকেই ‘দেবতা’ বলে উপাসনা করে ভারতীয়রা—এটা বৈদিক আর্য পরম্পরা। কিন্তু এই নিয়ে বহু পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী মানুষেরা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে গেছেন। কেউ বেদকে বলেছেন, ‘চাষাদের গান’, কেউ বলেছেন, প্রকৃতির যে সমস্ত শক্তিকে মানুষ বুঝতে পারেনি তাদেরকে ভয়ে পূজা করেছে—ইত্যাদি নানা মুনির নানা মত।

কিন্তু আমি তোমাদের প্রকৃত রহস্য বলছি শোনো– প্রাচীন ভারতের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরাই সকল জীবসহ মানবজাতির কল্যাণের উদ্দেশ্যে ঋকাদি বেদের মন্ত্র সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেছিলেন ! সুতরাং তাঁদেরকে ‘অশিক্ষিত চাষা’ বলাটাই নির্বুদ্ধিতা __তাই নয় কি !! ওই সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা সুতীব্র সাধনার দ্বারা প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করে তার মূল সুরটি ধরতে পেরেছিলেন এবং সেই কৌশল তাঁরা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন জনগণের কল্যাণে!
এই যে ত্যাগের মহিমা__এইটাকে মর্যাদা দিতেই সমাজে যাঁর কাছ থেকে কিছু পাওয়া যায় অর্থাৎ নিঃস্বার্থভাবে যদি কেউ কিছু দেন, তাঁকে ‘দেব’ বা ‘দেবতা’ বলে মর্যাদা দান করা হয়।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও দেখবে__ কোনো মানুষ যদি শ্রদ্ধাপরায়ণ ও বিবেকবান হ’ন, তাহলে তিনি মানুষের মঙ্গলের জন্য অনেককিছু কাজ করে যান ! এর ফলে বহু মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়। এইভাবে কোনো পুরুষ বা নারী যদি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ না ক’রে সম্পূর্ণরূপে অপরের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন অর্থাৎ মানুষের বা সমাজের নিঃস্বার্থ সেবা করতে পারেন_ তাহলে আজও সবাই বলে, “উনি মানুষ নন, দেবতা” কিংবা নারী হোলে বলে__ “উনি সাক্ষাৎ দেবী” তাই নয় কি !

এইবার মহাপুরুষেরা যখন শরীর ধারণ করেন, তখন তাঁদের শরীরধারণটাই তো “বহুজন হিতায় বহুজন সুখায় চ”(কারণ_তাঁদের তো আর এই পৃথিবী গ্রহ থেকে নেবার আর কিছুই নাই। তাঁরা শুধু মানবকে তথা সমগ্র জীবজগতকে কিছু দেবার জন্য শরীর ধারণ করেন)। ফলে যতদিন তাঁরা শরীরে থাকেন, ততদিন তাঁরা শুধুই দিয়ে যান__ কারও কাছে কিছুই প্রত্যাশা করেন না! প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসা দিতে দিতে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দিয়ে চলে যান তাঁরা! তাই পরবর্তীকালের মানুষ তাঁদের নামের শেষে ‘দেব’ শব্দটা জুড়ে দেয়। যেমন বুদ্ধদেব, চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব আবার স্ত্রী শরীর হোলে বলে— সারদামাতা অথবা সারদাদেবী ! ব্যাপারটা এইরকম আর কি_আশা করি, তুমি আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছো।।