শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের আরাত্রিক বন্দনাগীতির কথাগুলির মর্মার্থ জানার চেষ্টা করা হচ্ছিলো ৷ আমরা ছিলাম ওই বন্দনাগীতির দ্বিতীয় stanza-র কথায় ৷ এর প্রথম লাইনেই রয়েছে ‘সচ্চিদানন্দম্’-কথাটি ৷ স্বামী পরমানন্দকে এখানে ‘সচ্চিদানন্দ স্বরূপ’ হিসাবেই বর্ণনা করা হয়েছে ৷ অবশ্য এই কথাগুলি একটু আগেই বলা হয়েছিল, কিন্তু একবার বলা হোলেও আরো অনেক কথা বলা বাকি থেকে যায়_তাই না!পরম করুণাময় ভগবান পরমানন্দের স্তবগীতি তৈরি করতে গেলে, তাঁর মহিমা বর্ণনা করতে গেলে কথার শেষ হয় না – কথা কোথা থেকে চলে আসে ! কথার পৃষ্ঠে কথা আপনা-আপনি এসে বসে যায় ৷
যাইহোক, গুরুমহারাজকে এখানে সচ্চিদানন্দ বলা হয়েছে - তাই সচ্চিদানন্দ কথাটির ব্যাখ্যা আমরা গুরুমহারাজের কাছে যা শুনেছিলাম - সেই কথায় ফিরে যাই ! সৎ, চিৎ ও আনন্দ -এই তিনটি শব্দের সংযোগে 'সচ্চিদানন্দ' কথাটি সিদ্ধ হয়েছে ৷ তার মানে হচ্ছে যা (যিনি নয় - কারণ, তাহলে একেবারে ব্যক্তিবাচক পদ হয়ে যায় - গুরুমহারাজ সংস্কৃত 'সঃ' শব্দের ইংরাজী করতে বলেছিলেন 'that' - 'he ' নয় ৷) একাধারে সৎ-স্বরূপ, চিৎ-স্বরূপ এবং এক আনন্দ স্বরূপও বটে ! একেই বেদাদি শাস্ত্রে বলা হয়েছে - " অস্তি-ভাতি-প্রিয়"! 'অস্তি' - অর্থে 'যা আছে', 'ভাতি' - অর্থে 'যা প্রকাশমান' এবং 'প্রিয়' - অর্থে 'আনন্দ' - যা প্রেমস্বরূপ হয়ে এই সমগ্র বিশ্বসংসার পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে ৷
এরপরে যে কথাটি রয়েছে, তা হোলো - "কেবল বোধস্বরূপম্-- কেবল বোধস্বরূপম্ বন্দে যোগীশম্" - অর্থাৎ গুরুমহারাজ ছিলেন সাক্ষাৎ 'বোধস্বরূপ', আবার সংস্কৃতে 'কেবল' শব্দের অন্য একটি অর্থ হোলো 'জ্ঞান'৷ তাহলে কথাগুলির মানেটা হোচ্ছে - যে কোনো সাধারণ মার্গ অবলম্বন করে আগাতে থাকলে - চূড়ান্ত অবস্থায় আসে 'বোধ'__ পরমজ্ঞানের বোধ, পরম প্রেমের বোধ, জগৎ-জীবন-ঈশ্বরের বোধ ! গুরুমহারাজ বা যেকোনো অবতার পুরুষেরা (যাঁরা প্রকৃত অর্থে 'ভগবান' পদবাচ্য) সকল সাধনার - সকল সাধকের চূড়ান্ত স্থিতির অবস্থায় থেকে জগতের জন্য কাজ করেন। এইজন্যেই বলা হয়েছে তিনি 'সাক্ষাৎ বোধস্বরূপ' ! এছাড়া আরো বলা হয়েছে "ভগবানের লীলা কখনোই সাধারণের বোধগম্য নয়, তা একান্তই বোধের ব্যাপার !" সুতরাং, বোধি ব্যক্তিরাই একমাত্র ভগবানের লীলার কথা জানতে পারেন ৷ কিন্তু তাঁদের সবাই আবার ভগবানের লীলা আস্বাদন করতে পারেন না - লীলাপ্রবিষ্ট হোতে পারেন না ! কারণ লীলা আস্বাদনের স্থিতিতে পৌঁছাতে গেলে 'গোপী' হোতে হয় ! কিন্তু সেসব আলাদা তত্ত্ব, আলাদা প্রসঙ্গ --তাই আমরা এখন আবার পূর্বের প্রসঙ্গেই ফিরে যাবো।
গুরুমহারাজ বোধিব্যক্তিদের বোধের জগতে সাক্ষাৎ বোধস্বরূপ__এটা বোঝা গেল। এরপরে ওনাকে বলা হয়েছে - "বন্দে যোগীশম্" অর্থাৎ আমরা সেই 'যোগীশ' কে বন্দনা করি ৷ যোগীশ অর্থাৎ 'যোগী+ঈশ্' বা যোগীগণের যিনি ঈশ্বর, যিনি যোগীশ্রেষ্ঠ, যিনি কৈলাসশিখর স্থিত ধ্যানমগ্ন সাক্ষাৎ মহাদেব শিবস্বরূপ - সেই যোগীশ্রেষ্ঠকে আমরা বন্দনা করি ৷ এই প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে __শিবপুর(হাওড়া)-এর বিখ্যাত পন্ডিত এনাঙ্কশেখর বাগচী (১৯৮৩--১৯৯৫/৯৬ সময়কালে ঐ ভদ্রলোক গুরুজীর সংস্পর্শে এসেছিলেন।)--গুরুমহারাজকে "যোগীরাজ" বলেই সম্বোধন করতেন।।
এর পরের লাইনে রয়েছে - "সংযম শান্তং শৌর্য্যবন্তম্ বীর্যবলদৃপ্তম্ জয় বীর্যবলদৃপ্তম্" - ! প্রিয় পাঠক - দেখুন কি অসাধারণ বিন্যাস ! সংযম শান্তং কিন্তু শৌর্য্যবন্তুম্ এবং বীর্যবলদৃপ্তম্ - একই ছত্রে ! এটা যেন আপাতবিরোধী শব্দসমূহের সমাহার ! কিন্তু এই শব্দবিন্যাসকে অসাধারণ বলা হোলো কেন - সেটাই আলোচনা হোক ৷ এই পৃথিবীগ্রহের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ জানেই না যে, 'সংযম' এবং 'প্রকৃত শান্ততা' (ধ্যানের অন্তর্লীন অবস্থা)-ই মানুষকে শৌর্য্যবন্ত করে এবং বীর্যবলদৃপ্ত করে গড়ে তোলে ৷ গুরুমহারাজ বলেছিলেন - " বহু উন্নত প্রতিভা শুধুমাত্র তাদের জীবনে সংযমের অভাবে অকালে হারিয়ে গেছে ৷" উনি প্রতিভার চাইতেও বিবেকীদের অনেক আগিয়ে রাখতেন, বলেছিলেন - " কত প্রতিভাধর উচ্চশিক্ষিত চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, সাহিত্যিক ইত্যাদি) রাস্তার ধারে ড্রেনে পরে থেকেছে এবং একজন বিবেকী মানুষ (হয়তো তথাকথিত শিক্ষিত নয়, নামী-দামী নয়) তাকে ড্রেন থেকে তুলে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে ৷"
যাইহোক, আমরা ফিরে যাই পরমানন্দ বন্দনাগীতির কথায়, যেখানে বলা হয়েছে - সংযমী এবং শান্ত (প্রকৃত অর্থে শান্ত) ব্যক্তির মধ্যেই প্রকৃত শৌর্য্যের প্রকাশ দেখা যায় ৷ বাংলায় বলা হয় 'শূরবীর' অর্থাৎ যে বীরের মধ্যে শৌর্য্য রয়েছে ৷ যে বীর শুধুই অস্ত্রবলে বলীয়ান নয় - বিবেক বলে বলীয়ান ৷ যিনি আত্মরক্ষার সাথে সাথে স্বদেশভূমি রক্ষায়, নারী ও দুর্বলের প্রাণ-মান রক্ষার জন্যেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যিনি সদাসর্বদা সাধারণ মানুষের মঙ্গল কামনা করেন ৷
আর গুরুমহারাজের 'বীর্য্যবলদৃপ্ত' - ভঙ্গিমার কথা আর কি বলবো ! তাঁকে যারা চোখে দেখেছে - তারাই তাঁর দৃপ্ত বলা, দৃপ্ত চলা, দীপ্ত ভঙ্গিমা ইত্যাদিগুলি স্বচক্ষে দেখেছে ৷ উনি যখন একা একা হাঁটতেন তখন মনে হতো তাঁর পদভরে বুঝি মেদিনী প্রকম্পিত হবে ৷ যখন কোনো জিজ্ঞাসাকারীর জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেন - তখন এমন দৃপ্তভঙ্গিতে তা দিতেন যে, সিটিং-এ উপস্থিত শত শত ব্যক্তির মধ্যে কারোরই সাহস হতো না তাঁকে অযথা আজে-বাজে জিজ্ঞাসা করে বিরক্ত করে ! আর কেউ যদি সে চেষ্টা করতো - তার যে কি দশা হোতো !! আমরা _যারা গুরু মহারাজের কথা বেশি বেশি করে শুনতে চাইতাম, তারা অবশ্য ঐ ধরণের বিরক্ত করা লোকগুলিকে খুবই পছন্দ করতাম !!
যাইহোক, শৌর্যবন্ত, 'বীর্য-বলদৃপ্ত' গুরুমহারাজকে আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে প্রণাম জানাই🙏 ৷
জয়গুরু ৷৷
