জিজ্ঞাসু :— সাধনা করার পর আবার পতন হবে কেন ?
গুরুমহারাজ :— আমি ‘পতন’ বলি না তো, বলি বিশ্রাম। ধরো, কিছু পথিক একসাথে যাত্রা করলো একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। কিছুদূর চলার পর হয়তো কেউ একটু বিশ্রাম করছে, সঙ্গের সাথীরা এগিয়ে গেল, সেই বিশ্রামকারী ব্যক্তিটি নাহয় পরবর্তী দলের সাথে একটু পরেই যাবে ! নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে তো যাবে সে! তাহলে পতন কেন বলো ? এটা যেন বিশ্রাম—তাই নয় কি !
তাছাড়া পতন কোথা থেকে কোথায় হবে ? সবকিছুই তো ঈশ্বরময় ! শাশ্ত্রে বলা হয়েছে ব্রহ্মের এক কলায় এই জগৎ প্রকাশিত। গীতাতেও রয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘মম একাংশেন স্থিতো জগৎ’ । তাহলে কে কোথায় পড়বে আর কোথা থেকেই বা পড়বে !! উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে বলা যায় যে, সমুদ্রে শত-সহস্র বুদবুদ সৃষ্টি হয় কিন্তু দ্যাখো সেগুলি তো সমুদ্রেরই বুদবুদ এবং ফেটে গেলে তারা সব সমুদ্রতেই অবস্থান করে । আবার দ্যাখো _জল,তরঙ্গ,বুদবুদ এগুলি পৃথক পৃথক মনে হোলেও সামগ্রিকভাবে আমরা এটাকে সমুদ্রই বলে থাকি–তাই না !
ঠিক তেমনি সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মকে ভারতীয় শাশ্ত্রে ‘সচ্চিদানন্দ সাগর’ বলা হয়েছে! আর তাতেই এই জড়-জগৎ, জীব- জগৎ, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রাদি সবই বিধৃত রয়েছে। সাধারণ মানুষ নিজেকে সবকিছু থেকে পৃথক করে জগতের বস্তুসমূহকে পৃথক ভাবছে এইমাত্র ! দুটি কথা রয়েছে ‘ব্যক্তি অহং’ আর ‘বিশ্ব অহং’ অর্থাৎ Individual ego আর Universal ego ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব ভক্তদের গঙ্গার ধারে নিয়ে গিয়ে একটা খড় দিয়ে খানিকটা জলকে আলাদা করে দিতেন, দিয়ে বলতেন খড় দ্বারা আবৃত জলটা যেন ‘জীবাত্মা'(Individual ego), আর গঙ্গার বাকী জল যেন পরমাত্মা(Universal ego)। যদি অভিমান-অহংকাররূপ খড়টা তুলে নেওয়া হয়, তাহলেই ‘বিশ্ব-অহং’-এর সাথে একাকার। একেই মহাজনগণ “একে-একে একাকার” বলেছেন। তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারলে “পতন” কথাটা কেন বলা উচিত হবে না !
জিজ্ঞাসু :— যে কোনো মানুষকে কি সাধনা(যোগসাধনা,তন্ত্রসাধনা ইত্যাদি) করতেই হবে—অন্য কোনো উপায় নাই ?
গুরুমহারাজ :— দ্যাখো, ধর্মজগতের কোনো Back-door নেই! এখানে যা কিছু করতে হয়– সব সোজাসুজি। দু’ভাবে কার্যসিদ্ধি করতে হয়—একটা ‘বীরভাব’ আর একটা ‘ধীরভাব’। একটা দৈবাশ্রিত হয়ে পুরুষকারের সহায়তায়, অন্যটা শুধু শরণাগতি। তবে আবার পুরুষকার মানে ‘অহংকার’ ভেবো না! সাধারণত মানুষ যেটা পুরুষকার বলে মনে করে_ ওটা কিন্তু অহংকার। ‘পুরুষকার’ দিয়ে কৃতকার্য হবার উদাহরণ হোচ্ছে মহাভারতের অর্জুন। বিশেষতঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যতক্ষণ তাঁদের সাথে ছিল উনি যে সমস্ত কাজ করতেন সেগুলি সবই শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবর্তমানে অর্জুনের জীবনেই অন্যরকম ঘটনাও ঘটেছিল যখন আভীর দস্যুরা কৃষ্ণমহিষীদের হরণ করতে এলো, তখন অর্জুন গাণ্ডীব তুলতে পারলেন না ! কারণ ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অর্জুন এ কাজ করতে গিয়েছিলেন। এই কথাগুলি ঠিক ঠিক বুঝতে হবে, নাহলে সব গোলমাল হয়ে যায়।
জানো, শরীরধারণ করলেই মানুষের জীবনধারায় অনেক ঋণ যুক্ত হয়ে যায়। কথাটা বুঝতে পারলে না তো আচ্ছা তোমাদেরকে বুঝিয়ে বলছি শোনো। যে কোনো মানুষ, তা সে নারী বা পুরুষ যেই হোক সে যখন মানবশরীর নিচ্ছে তখন তারজন্য কিছু criteria থাকে ! সেইগুলো যেখান থেকে বা যার কাছ থেকে আসছে–সেই হিসাব অনুযায়ীই তো সবকিছু শোধ দিতে হবে ! কিন্তু সেই ‘শোধ’-টা হোচ্ছে না বলেই তো কামনা-বাসনা সাথে নিয়ে আবার ফিরে ফিরে আসা !
যে ঋণগুলির কথা বলা হয়েছে সেগুলি হোলো পিতৃঋণ, মাতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ, মাতৃভূমির প্রতি ঋণ ইত্যাদি—এগুলো তো অস্বীকার করতে পারবে না তুমি ! কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের এসব ‘ঋণ’ মেটানোর তাগিদ নাই জীবনে– ফলে ঋণের বোঝা জন্ম- জন্মান্তরে বেড়ে বেড়ে যাচ্ছে। তারপর যখন কোনো একটা জীবনে মানুষের ঐ সকল ‘ঋণ’ শোধ করার ভাবনা জাগ্রত হোচ্ছে অর্থাৎ কোনো ‘জাগ্রত বিবেক'(মহাপুরুষ)-এর সংস্পর্শে জীবের বিবেক জাগছে তখন তার সাধনজীবন শুরু হয়।
আর সাধনার দ্বারা সে বুঝতে পারে ‘সাধারণ মানুষ কেন এতো ভোগান্তিতে রয়েছে ! সাধক যত এইসব জীবন-রহস্য জানতে পারছে ততোই তার চেতনার উত্তরণ ঘটেছে, সে আধ্যাত্মিকতার সোপান বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ! এই অবস্থায় ঐ সাধকের শরীর ঘিরে নানান শক্তির খেলা চলায়– সাধক সাধনার বেগ বাড়াতে থাকে।
সাধক আধ্যাত্মিকভাবে যতো উন্নত হয়, ততো তার ঋণের বোঝা কমতে থাকে। এইভাবে চলতে চলতে (আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম সীমায় পৌঁছে) একদিন সমস্ত ঋণ শোধ করে সেই সাধক ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো বাঁধা-বাঁধনহীন নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকে ! জানো তো— ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা ঐ অবস্থাতেই ঠিক ঠিক প্রযোজ্য। দেশ স্বাধীন, জাতি স্বাধীন—এ সব অর্থ গৌণ, কারণ তোমরা স্বাধীনদেশে বাস করেও কতটা স্বাধীন, সে তো নিজেরাই দেখছো! কাজেই দেখা গিয়েছে _নির্বিকল্প সমাধির পরেই মানুষ প্রকৃত স্বাধীন হয়।
সে যাইহোক্, আমি দেখেছি এই পৃথিবীতে শরীরধারণের জন্য যতগুলি ঋণ ক্রিয়াশীল রয়েছে, মানুষ পারে সেগুলি একে একে শোধ করে দিতে ! তবে হ্যাঁ, –কেবল একটা ঋণ শোধ করা যায় না—সেটা হচ্ছে মাতৃঋণ!! আমি ছোটবেলায় ১০ মাস যাবৎ একটা আড়াই কেজি ওজনের ইঁট পেটে বেঁধে ঘুরছিলাম _মায়ের গর্ভকালীন শিশুকে বয়ে বেড়ানোর কষ্ট কতোটা –তা অনুভব করার জন্য। মায়ের মমতা নিয়ে কতো মুমূর্ষুকে সেবা করেছি কিন্তু অনেক কিছু করে শেষে এটাই বুঝেছিলাম যে, মায়ের মহিমা এই সমস্তকিছুরও ঊর্ধ্বে ! ঐ সব বিচারে না গিয়ে এইজন্যেই শাস্ত্র বলেছে– ‘যদি কোনো পুত্র বা কন্যা সাধনার শীর্ষে পৌঁছায় অর্থাৎ নির্বিকল্প সমাধি অবস্থা প্রাপ্ত হয় বা পূর্ণত্বলাভ করে তবেই মাতৃঋণ শোধ হয়! কারণ তখন ঐ পুত্র বা কন্যার দ্বারা মাতা উদ্ধার(জীবচেতনা থেকে শিবচেতনায় উত্তরণ)হ’ন। আর শুধু মাতা একা কেন– মাতৃকুল এবং পিতৃকুলের ৭ পুরুষ করে মোট ১৪ পুরুষ উদ্ধার হ’ন। বাংলায় দেখবে প্রবাদ আছে ‘চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে দেবো’–এই কথার তাৎপর্য এটাই। তাই কোনো কুলে যদি এইরূপ মহাপুরুষ বা মহামানব জন্মগ্রহণ করেন, তাহলেই মাতার মাতৃজীবনের সার্থকতা—“কুল পবিত্রং জননী কৃতার্থা।”
