[ গুরুজী ঋষিকেশ কৈলাস আশ্রমে থাকাকালীন নেপালের মহারাণীর ব্যবস্থাপনায় একটা সাধু-ভান্ডারা অনুষ্ঠানে একজন সন্ন্যাসীর অদ্ভুত নৃত্যের পরিবেশন দেখেছিলেন। সেই সম্পর্কিত আলোচনা….]

……………………………………………………………..

জিজ্ঞাসু :— সন্ন্যাসীটি নৃত্যের মাধ্যমে কি বার্তা দিতে চাইছিলেন ?

গুরুমহারাজ :— উনি( ‌‌নৃত্যরত সন্ন্যাসী) বলছিলেন, ‘এই ধরণের ধর্ম আলোচনার সমস্ত আসর‌ই হোচ্ছে ভণ্ডদের আসর। এর মাধ্যমে কখনই প্রকৃত ধর্মশিক্ষা হয় না, আর প্রকৃত ধার্মিকেরা কখনও এইরূপ আসরে বক্তব্যও রাখেন না। এই স্টেজ-এর উপরে যারা বসে আছে তারা সবাই ভণ্ড, নীচে যারা বসে রয়েছে __তাদের মধ্যে দেখছি দু-একজনের মুখ পুড়েছে।’ উনি এই ধরণের সব কথা বলে যাচ্ছিলেন নৃত্যের ভঙ্গিমায় ।

কিন্তু ওনার বক্তব্য যাই হোক, সেই নয়নভোলানো মনোমুগ্ধকর নৃত্য দেখে হাজার হাজার সাধু-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী একদম মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। আমার খুব‌ই ইচ্ছা হচ্ছিলো ওনার সাথে একটু আলাপ করার, সুযোগও খুঁজছিলাম_ ভাবলাম অনুষ্ঠানের শেষে যখন খাওয়া-দাওয়া হবে সেই সুযোগে ওনার সাথে কথা বলবো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার কি হোলো জানো__ওনার নৃত্য শেষ হোতে না হোতেই খাবার ঘণ্টা পড়ে গেল ! আর হাজার কয়েক ক্ষুধার্ত সাধু-ব্রহ্মচারীর দল হইহই করে উঠে পড়ে খাবারের জায়গার ছুট লাগালো। এদিকে আমরা যারা ষ

ঋষিকেশ কৈলাস আশ্রমের প্রতিনিধি ছিলাম তাদের সামনের সারিতে বসার জন্য আসন নির্দিষ্ট ছিল ।

তাই আমাদের অতোটা তাড়া ছিল ন,তাছাড়া আমাদের মণ্ডলেশ্বর তখনও স্টেজে বসে ছিলেন। তিনি না উঠে দাঁড়ালে আমরা উঠতে পারি না_ এটাই ঐ আশ্রমের রীতি ! ফলে আমাদের উঠতে একটু দেরি হোলো। সেই ফাঁকেই সেই অদ্ভুত সন্ন্যাসী কোথায় যে চলে গেলেন আর কেউ তাঁর খোঁজ দিতে পারলো না !

ভারতের বর্তমান সমাজের বিখ্যাত নাচিয়েদের মধ্যে আমি উদয়শঙ্কর-এর নাচ দেখেছি এবং অতি সম্প্রতি ইউরোপে ঘোরার সময় “ভারত-উৎসব প্রোগ্রাম”-এ আর একজন বিখ্যাত দক্ষিণী নৃত্যবিশারদ মহিলার নাচ দেখলাম।

দুজনেরই নাচ আমার বেশ বেশ ভালো লেগেছিল। দেখলাম, এরা নৃত্যকলায় সিদ্ধ। তবে ঐ রকম নৃত্য কলায় সিদ্ধ ব্যক্তি তো আর বেশি পাওয়া যায় না !! যারা নাচ শেখে_ এমন অনেকে এখানে(বনগ্রামে )আসে , তাদের সাথে নাচ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়। বলাগড়ের একটি মেয়ে ভালো নাচ জানে, ও বিভিন্ন নাচের মুদ্রা আমার কাছ থেকে জেনে গিয়ে সেগুলো stage Performance করে থাকে। ওই মেয়েটির খুব ইচ্ছা তাণ্ডব নৃত্যটা আমার কাছ হোতে শেখার ! আমি রাজী হ‌ই নী ! শুধু বলেছি_ ✓রীমায়ের ইচ্ছা হলে হবে।

এইতো ‘কলা’ নিয়ে অনেকগুলি কথা বলা হোলো ! প্রচলিত ললিত কলা গুলি ছাড়াও একটা রয়েছে ‘সমরকলা’ অর্থাৎ যুদ্ধবিদ্যা। এই কলায় সিদ্ধরা যে কোনো রণকৌশল দ্রুত রপ্ত করে শত্রুকে পর্যুদস্ত করতে পারে সহজেই। শিবাজী সমরকলায় সিদ্ধ ছিলেন, ওনার গুরু রামদাস সমর্থ ওনাকে এই বিদ্যা শিখিয়ে ছিলেন।

আবার দ্যাখো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন ষোলকলায় পূর্ণ। জানো __এক-একটা কলার আবার ৪টি করে ভাগ অর্থাৎ ৪×১৬=৬৪, মোট এই ৬৪ কলায় সিদ্ধ ছিলেন ভগবান বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ !! তাঁর ব্যবহৃত Martial Art-এর বিভিন্ন শিক্ষা গুরু পরম্পরায় এখনো রয়েছে। শিবাজীর গুরু রামদাস এই সমস্ত art জানতেন ! উনি সেগুলো শিবাজীকে শিখিয়েছিলেন। ফলে ইতিহাসে পাবে যে, মুঘলসৈন্য বেশ কয়েকবার শিবাজীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল, কিন্তু কোনোবারেই তারা শিবাজীকে ধরতে তো পারেই নি—অস্ত্রাঘাতও করতে পারেনি ! এক জায়গায় দাঁড়িয়ে _যে কোনো দিন দিকে ২৪/২৫ ফুট লাফাতে পারতো শিবাজী। নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে ২৪ ফুট দূরে বিপক্ষের ঘোড়সওয়ারের বুকে লাথি মেরে তাকে ফেলে তার ঘোড়া নিয়ে সৈন্যব্যুহ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারতো। আবার যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো চারিদিক থেকে ওর উপর বর্শা পড়ছে—কিংবা শয়ে শয়ে তীর আসছে _ তখন ঘোড়ার পিঠ থেকে খাড়া উঁচুতে ৮/১০ ফুট লাফিয়ে উঠে তীর গুলিকে এড়িয়ে আবার নেমে বসে পড়তো ঘোড়ার পিঠে!

দ্যাখো না__ ঔরঙ্গজেব ওকে কৌশলে বন্দীও করলো কিন্তু সেখান থেকেও শিবাজী পালিয়েঢ় গেল। এ যেন বাঘের গুহায় ঢুকে বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসার থেকেও কঠিন কাজ !!

তবে ওই যে ঔরঙ্গজেবের কাছে স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব মেনে নেওয়া__ এর পিছনেও গুরু রামদাসের শিক্ষা ও নির্দেশ ছিল ! ওর উপর গুরুর নির্দেশ ছিল—যেমন করে কংসের রাজদরবারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একা Martial Art প্রয়োগ করে কংসকে হত্যা করেছিলেন, ঠিক তেমনি ঔরঙ্গজেবকে হত্যা করাই ছিল শিবাজীর মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু ঔরঙ্গজেবের কাছে গুপ্তচরদের report ছিল যে, শিবাজী সামনের দিকে ২৪/২৫ ফুট লাফাতে পারে ! ধূর্ত বাদশা সর্বদাই নিজের সম্বন্ধে সচেতন থাকতো এবং সে কাউকে বিশ্বাস করতো না। জানো তো _ঔরঙ্গজেব দু’চারদিন অন্তর দেহরক্ষী বদল করতো।

যাইহোক, যদিও উভয়পক্ষের (জয়সিংহ,যশোবন্তসিংহ প্রমুখদের সাথে ঔরঙ্গজেবের) মধ্যে শর্ত হয়েছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য ওকে সভায় আনা হবে কিন্তু ঔরঙ্গজেব সে শর্ত রাখেনি _রাজসভায় শিবাজীকে শৃঙ্খলিত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল । জয়সিংহ, যশোবন্তসিংহ প্রভৃতি হিন্দু সভাসদগণ ঔরঙ্গজেবের কথায় বিশ্বাস করে শিবাজীকে তার কাছে রাজসভায় নিয়ে এসে ছিল। তারা যখন শৃঙ্খলিত শিবাজীকে রাজসভায় আসতে দেখলো, তখন এই ঘটনায় তারা খুব দুঃখিত হয়েছিল কিন্তু তাদের তখন আর করার কোনো উপায় ছিল না ! শিবাজী যখন দেখলো যে, তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গেল _তখন সে কৌশলে পালিয়ে গিয়েছিল।

এইসব ইতিহাস সঠিকভাবে ভাবে লেখা হয়নি—তা যদি হোতো তাহলে শিবাজীর মতো বীরদের গৌরবে ভারতবাসীর গর্বে বুক ভরে থাকতো। স্বামী বিবেকানন্দের একজন মারাঠী শিষ্য ছিল, ছেলেটি সুশিক্ষিত এবং পরে তাঁর কাছে সন্ন্যাসও নিয়েছিল। প্রথম পরিচয়েই স্বামীজী তাঁকে সমগ্র মারাঠাজাতির গৌরব ‘শিবাজী’র কথা বলতে শুরু করলেন। কিন্তু ছেলেটি শিবাজীর ভালো দিকগুলোর কথা জানতোই না, তাই শিবাজী সম্বন্ধে সে বিরূপ মন্তব্য করছিল। এতে স্বামীজী খুব বিরক্ত বোধ করেছিলেন। তারপর তিনি যখন শিবাজীর জীবনের প্রকৃত বীরত্বব্যন্জক ঘটনাগুলো বলতে থাকলেন_ তখন ছেলেটি অবাক! সে বলছিল—”স্বামীজী! আমি নিজে মারাঠী হয়ে এত কথা জানি না। আর আপনি এসব কি করে জানলেন!” এরপর থেকে সেই ছেলেটির মধ্যে শিবাজী সম্বন্ধে ভুল ধারণা ভেঙে গিয়েছিল।।