জিজ্ঞাসু :— গুরুমহারাজ ! আপনি একটু আগে বলছিলেন যে, দু’জন নাঙ্গা সন্ন্যাসী আপনার সাথে ছিলেন ! কিন্তু ঐ গুহাবাসী সাধুর সাথে দেখা করতে গিয়ে আপনি তাঁদের সঙ্গছাড়া হয়ে গিয়েছিলেন। পরে কি আবার তাঁদের দেখা পেয়েছিলেন ?

গুরুমহারাজ :— হ্যাঁ, পেয়েছিলাম। ঐ সাধু(নির্জন গুহাবাসী)-টি আমার সাথে দেখা হ‌ওয়া এবং তাঁর হাজার বছরের তপস্যালব্ধ ধন আমার মধ্যে transfer করে দেবার পরে ঐখানেই তৎক্ষণাৎ শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি ওনার দেহটিকে গুহার বাইরে নিয়ে এসে কাঠ-পাতা যোগাড় করে সৎকারের ব্যবস্থা করেছিলাম।

এই সমস্ত কাজ সারার পর উঁচুতে অবস্থিত গুহাটি থেকে নীচে নেমে আসতেই দেখি নাঙ্গা দু’জন যেন আমারই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন ! গুহার সাধুটির আমার সামনেই ঐভাবে হঠাৎ করে শরীর ছেড়ে দেওয়ায় তাৎক্ষণিক ভাবে আমি খুবই বিষন্ন হয়েছিলাম কিন্তু ওঁদেরকে(নাঙ্গা সাধু দুজনকে)দেখে দুঃখ অনেকটাই কমে গিয়ে মনে বেশ খানিকটা আনন্দ হোলো।

যাই হোক, এবার আবার শুরু হোলো পথচলা। আমরা হিমালয়ের যে অংশে ছিলাম_সেখান থেকে তিনমাসের হাঁটাপথে কৈলাস বা মানস সরোবরে যাওয়া আসা করা যায়, কিন্তু ঐ নাঙ্গারা আমাকে গোপন পথ ধরে মাত্র ৭ দিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়া ওনারা আমাকে তিব্বত ঘুরিয়ে ফের কাশ্মীর হয়ে আফগানিস্থান এবং সেখান থেকে কাফিরীস্থান নিয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে তাকলামাকান মরুভূমি পার হয়ে ইরান-ইরাক, এমনকি প্রায় গ্রীস অবধি ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন।

যাই হোক ,ওনাদের কথা অন্য কোনো সময় আরো বিস্তারিত বলা যাবে, তবে ঐ সময় হিমালয়ে ঘোরার সময় আমার কতকগুলো উল্লেখযোগ্য ঘটনার কিছু কথা তোমাদের বলছি, শোনো।

তোমরা যারা উত্তরকাশীর কৈলাস আশ্রমে গেছো তারা জানবে —ওখান থেকে একটু উপরে যে বিমলেশ্বর মন্দির রয়েছে, সেখান থেকে সামনে যে সুন্দর নিসর্গ সম্বলিত পর্বতচূড়াটি দেখা যায়— ওটার নাম হরিপর্বত, ওটাকে হরিপাহাড়ও বলে। বহু সাধুদের মুখে শুনেছিলাম ‘ওখানে নাকি সুন্দর সরোবর রয়েছে আর ওখানকার প্রকৃতির শোভা নাকি স্বর্গের নন্দনকাননকেও হার মানায়! তাই পূর্ণিমার সময় স্বর্গের দেব-দেবী ও অপ্সরারা নাকি ওখানে স্নান করে বা বেড়াতে আসে।’ একথা শোনার পর থেকে আমি নানা সাধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তিনি ঐ স্থানে কখনও গেছিলেন কিনা ? কিন্তু যাঁকেই জিজ্ঞাসা করতাম তিনিই বলতেন যে, না তিনি যাননি। প্রবীণ সাধুরা বলতেন যে, তাঁরা নিজেরা যাননি ঠিকই তবে সাধুদের মুখে শুনেছেন ‘সে পথ ভীষণ দুর্গম, আর তাছাড়া ঐ স্থান কেউ দর্শন করলে সে আর ফেরে না।’ আমার ওসব শুনে মনে হয়েছিল _ ‘বেশ! তাহলে আমিই যাবো, ওখানে গিয়ে দেখবো ব্যাপারটা কি! আর যদি না ফিরতে পারি তো ফিরবো না তবু তো একটা রহস্যের কিনারা হবে !’ এই ভেবে পূর্ণিমা তিথির ঠিক আগে আমি একাই একদিন ভোরে বেরিয়ে পড়লাম হরিপাহাড়ের উদ্দেশ্যে।

যে চূড়াটাকে দেখে মনে হোতো – ঐ তো কাছেই, হাঁটতে গিয়ে দেখি তা বহুদূরে অবস্থিত ! তার উপর ঘন জঙ্গলে রাস্তা করে নিয়ে এগোতে হচ্ছিলো, তাছাড়া চড়াই- উৎরাই ভেঙে ভেঙে যাওয়া ! প্রতি মুহূর্তে প্রাণ হাতে করে এগোনো ! প্রায় পুরো রাস্তাটাই ঘন হরীতকীর জঙ্গলে ভর্তি। কি বিশাল বিশাল বৃক্ষ—কত হাজার বছরের তা কে জানে ! অজস্র পাকা পাকা হরীতকী পড়ে রয়েছে আর দেখলাম বিশাল বিশাল অন্যান্য গাছও রয়েছে।

যাইহোক, ভোরে বেরিয়ে হরিপাহাড়ে পৌঁছোতে আমার প্রায় বিকাল হয়ে গেছিলো। আর পর্বতের গা বেয়ে বেয়ে যখন চূড়ায় পৌঁছালাম তখন সূর্য ডুবে গেছে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত দেহটা টেনে টেনে নিয়ে একেবারে চূড়ায় পৌঁছে কিন্তু মনে হোলো সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম যেন কিছুই নেই ! এরজন্য এর থেকেও আরও অনেক বেশী পরিশ্রম করা যায়! কি অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য!! চূড়ার উপরটা অনেকটা প্রশস্ত এবং সমতল, আর তার ঠিক মাঝখানে বরফগলা জলে পুষ্ট একটি স্বচ্ছ সরোবর। এত পরিষ্কার জল যে, অনেকটা গভীর হওয়া সত্ত্বেও তলার সমস্তটাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো, এমনকি একটা ছোটো নুড়ি পাথরও স্পষ্ট দেখা হচ্ছিলো। আর পূর্ণচন্দ্রের আলোয় উদ্ভাসিত হরিপাহাড়ের চূড়া থেকে হিমালয়ের বিভিন্ন অংশের দৃশ্য এমন মনোরম দেখতে লাগছিল যে, আনন্দে আমার নৃত্য করতে মন হচ্ছিলো। সত্যিই জানো তো—হিমালয়ের মতো সৌন্দর্য পৃথিবীতে আর কোথাও নাই ! আমি পৃথিবীর বেশীর ভাগ অংশই ঘুরে এসেছি, কিন্তু হিমালয়ের সৌন্দর্যের কাছে সব সৌন্দর্যই ম্লান। তবে যদি ঠিক ঠিক Point থেকে দেখতে পারো তবেই আমার কথার সত্যতা বুঝতে পারবে, অন্যথায় আর কি বুঝবে ! ওখান থেকে কৈলাসের দিকে তাকালে দেখা যায় Natural ওঁকার। পরপর বিভিন্ন পর্বতের চূড়াগুলি সাজিয়ে যেন কয়েকশ’ মাইল জুড়ে এক বিরাট ‘ওঁ’ সবসময় আঁকা রয়েছে। মা জগদম্বার কি অদ্ভুত এবং অপূর্ব সৃষ্টি এই পৃথিবী! …….. [ ক্রমশঃ]