যাইহোক এইসব সুন্দর দৃশ্যাদি দেখতে দেখতে বিহ্বল হয়ে যাচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু আমার মনে রয়েছে যে পূর্ণিমার রাত্রে এখানে স্বর্গের দেবীদেবীরা স্নান করতে আসবে, এমনকি দেবী দুর্গাও সপরিবারে আসতে পারেন– এইসব ভেবে চুপ করে বসে বসে অপেক্ষা করছিলাম। রাত্রি বাড়ার সাথে-সাথেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করলো—দেখছিলাম সরোবরের জল ধীরে ধীরে বরফে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। ঐ অবস্থায় চুপচাপ অপেক্ষায় বসে থাকা যে কি কষ্টকর তা তোমরাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো! এইভাবে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপতে কাঁপতে প্রায় ৩/৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেল__এদিকে কোনো দেবদেবীর পাত্তাই নাই ! তাহলে কি তাঁরা জানতে পেরেছেন যে, ‘একজন মানুষ এখানে এসে হাজির হয়েছে, অতএব বোধ হয় আজ আর কেউ আসবেন না’ ! এইসব ভাবতে-ভাবতেই দেখলাম যেন দূর হোতে কিছু একটা আসছে ! উজ্জ্বল দুটো আলোর বিন্দু—যেন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। তার পিছনে আরও একজোড়া, আরও পিছনে আরও আরও আগুনের মতো গোল গোল আলোক বিন্দু— সবগুলোই আমার দিকেই এগিয়ে আসছিল। আমার তখন শরীরে টান টান উত্তেজনা, তাহলে সত্যি-সত্যিই দেব-দেবীগণের বা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের দেখা পেতে চলেছি ! আলোর রূপে এসে ওঁরা নিশ্চয় দেব বা দেবী শরীরে প্রকট হবেন! কিন্তু ওগুলো কাছে আসতেই একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে এসে লাগলো, আর গর্ গর্ আওয়াজ শুনেই আমার কল্পনাবিলাস দ্রুত বাস্তবে ফিরে এল—–‘আরে এ যে বাঘ !’ “শেরেবালী নেহি আয়ি, উনোনে শের ভেজ দিয়া!’

ভালো করে চেয়ে দেখি কি_ সামনের বড় পুরুষ বাঘটা মাটিতে লেজ আচড়াচ্ছে আর মুখে গর্ গর্ করে আওয়াজ করছে —যেটা শিকার ধরার পূর্ব মুহূর্তের প্রস্তুতি। আমি আর দেরি না করে ‘জয় মা’ বলেই সরোবরের বরফগলা জলে এক লাফ ! তারপর সেখানেই গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকলাম সারা রাত। আর ওই ৮/১০টা বাঘ মিলে অর্থাৎ পুরো ব্যাঘ্র পরিবারটাই আমাকে আগলে রইলো। রাত্রি গভীর হবার সঙ্গে সঙ্গে জলের উপরের অংশ দ্রুত বরফে পরিণত হোতে লাগলো, আর এদিকে তার মধ্যে ডোবানো আমার শরীর—ভাবো অবস্থাটা ! যখনই আমি জলে লাফ মেরেছিলাম ঠিক তার সাথে সাথেই আমার সারা শরীর অবশ হোতে শুরু করেছিল। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিলো যে, যেন শরীরের সমস্ত রক্ত জমাট বেঁধে যাবে, আর শরীরটা ফেটে যাবে। কিন্তু তা হোলো না _ আমার শরীরটা ঠিকই রক্ষা পেয়ে গেল ! কিভাবে রক্ষা পেল __সেটাই বলছি শোনো!

বহিঃপ্রকৃতিতে যেমন গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এসব ঋতু রয়েছে, জলতত্ত্ব, অগ্নিতত্ত্ব এসব রয়েছে ঠিক তেমনি দেহভাণ্ডের অন্তঃপ্রকৃতিতেও ঐসকল একই তত্ত্ব রয়েছে। তত্ত্বজ্ঞানীরাই এই ভাণ্ডে ব্রহ্মাণ্ড তত্ত্বের রহস্য জানেন। আমি দেখলাম আমার শরীরে হঠাৎ করে অগ্নিতত্ত্ব ক্রিয়াশীল হোতে শুরু করলো আর মনে হোতে লাগলো যেন গ্রীষ্ম ঋতুর আবির্ভাব হয়েছে। ফলে সারা রাত শীতল বরফগলা জলে থাকতে আর আমার কোনোরূপ অসুবিধাই হোলো না। মা জগদম্বা ছোটবেলা থেকেই এই শরীরটাকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন—যা তোমাদের আগে হয়তো কোনো কোনো সময় কিছু কিছু বলেছি।

গোমুখ যাবার পথে কয়েক টন পাথরের একটা চাঁই আমার উপর পড়েছিল। তপি ও দিল্লীর ভক্তরা সব সাথে ছিল, কিন্তু আমার শরীরের কিছু হয় নি। এইরকম অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। যাইহোক এক্ষেত্রেও ✓রী মা-ই আমার শরীর রক্ষা করেছিলেন। পরদিন সকাল পর্যন্ত অর্থাৎ সূর্যোদয় হবার পর পর্যন্ত বাঘেরা ওখানেই বসে থাকলো। এমন হাতের কাছে খাবার পেয়ে আর কে তাকে ফেলে যেতে চায় ! কিন্তু দেখলাম রোদ উঠতেই ওরা চলে গেল। আমিও জল থেকে বরফের চাই সরাতে সরাতে উঠে এলাম।

তারপর দেখলাম যেদিক থেকে আমি পর্বতটায় উঠেছিলাম ঐ দিকটাই খাড়া, কিন্তু তার উল্টোদিকটা ঢালু হয়ে নীচে অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং তা গভীর জঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সন্ধ্যা হবার পর শুধু বাঘই নয়, নানান পশুরা ঐ সরোবরে সেই পথে জল খেতে আসে ।

এইবার দিনের আলোয় আরও ভালো করে আমি হরিপাহাড়ের উপর থেকে বহুদূর পর্যন্ত দৃশ্যাবলী দেখে নিলাম, রাত্রে দেখেছিলাম চাঁদের আলোয়। ফলে তার শোভা একরকম ছিল এখন যেন আবার অন্যরকম। একই স্থান এবং এক‌ই পাত্র, শুধু কাল বদলে যেতেই সৌন্দর্যের কত পরিবর্তন হোতে পারে_ তা ঐ সমস্ত স্থানে না গেলে বোঝা যায় না। পাশাপাশি সমস্ত পর্বতের চূড়ায় গত বিকালে যে সীমা পর্যন্ত বরফ ছিল , সারারাত কেটে যাবার পর সেইসব চুড়ার বরফের Level আরও অনেক নীচে নেমে গিয়েছিল । এর ফলে চূড়াগুলোকে যেন ধ্যানমগ্ন শ্বেত-শুভ্র বৃদ্ধ ঋষি মনে হচ্ছিলো। এইসব দেখতে দেখতেই ফেরার কথা মনে হোলো। আর হরিপাহাড়ের সব রহস্য ভেদ করা হয়ে গেল বলে_ আনন্দও হোলো খুব। বুঝলাম যাঁরা এই স্থানটিকে দেব-দেবীদেরও মনোমুগ্ধকর স্থান হিসাবে অথবা স্বর্গের সঙ্গে এটির তুলনা করেছেন তাঁরাও ঠিক, আবার যাঁরা বলেছিলেন, ‘ঐ স্থানটি একবার যে দর্শন করে সে আর ফেরে না__ তাঁরাও ঠিক ! কারণ ওখানে রাত্রি কাটানো মানেই হয় সে ঠাণ্ডায় মারা যাবে অথবা হিংস্র জন্তুর খাবার হয়। এছাড়া আরও বুঝতে পারলাম যে, এইভাবেই মানুষ যে সমস্ত বিষয় সম্বন্ধে সঠিক জানে না বা ধারণা করতে পারে না, তার সম্বন্ধে নানান কল্প-কাহিনী তৈরি করে বসে। নানান আজগুবী ঘটনা বা কল্পকাহিনীর সৃষ্টির রহস্য এটাই।

এরপর আমি কৈলাস আশ্রমে ফিরে এসে সবাইকে হরিপাহাড়ের রহস্য-উদ্ঘাটনের কাহিনী বর্ণনা করলাম__ সবাই শুনে তো একেবারে অবাক। প্রবীণ সাধুরা বললেন, ‘তোমার তো খুব সাহস, আমরা সারাজীবন এখানে থেকেও ওখানে যেতে সাহস করিনি, আর তুমি ঘুরে চলে এলে !’

আমার গুরুদেব রামানন্দজীকে যখন হরিপাহাড়ের চূড়ার রাত্রি কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলাম, তখন উনি কোনো কথার উত্তর না দিয়ে, আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু আপনমনে হাসছিলেন।।