।।মাধবানন্দ মহারাজের স্মৃতিচারণ।।
__ ব্রহ্মচারিনী মন্জু মা।।
কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরে গুরুজীর গলায় যে অনেক রজনীগন্ধা ফুলের মালা পড়া ছবিটা রয়েছে, ওইটা যেদিন তোলা হয়েছিল, সেই সময় (১৯৯৬/৯৭) আমি ঐখানেই উপস্থিত ছিলাম। গুরু মহারাজ যাওয়ায় তখন ওখানে প্রচুর ভক্তদের ভিড়! সকাল থেকে গুরুজীর সৎসঙ্গ চলছে, আর মানুষ অবাক বিস্ময়ে সেই কথামৃত পান করছিলেন। কিছুদিন আগেই মাধবানন্দ মহারাজকে গুরু মহারাজ ওই মন্দিরে পাঠিয়েছিলেন, ঐ শক্তিপীঠের পুনঃজাগরণের জন্য। মাধবানন্দ মহারাজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম _উনি খুবই ব্যস্ত, আগত ভক্তদের আহ্বান করা থেকে খাবার ব্যবস্থা __সমস্ত রকম খেয়াল রাখছেন ! আসলে উনি ছিলেন প্রেমিক মানুষ, তাই কারো সেবার যেন কোন ত্রুটি না হয় _সেদিকে নিপূণভাবে নজর রাখছিলেন।
সেদিন গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ এসেছেন শুনে বর্ধমান শহরের অনেক গন্যমান্য এবং জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা কঙ্কালেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিলেন। আমিও বনগ্রাম থেকে ওখানে গিয়ে গুরুজীকে প্রনাম করে সিটিং এ বসে পড়েছিলাম।
সিটিং চলার ফাঁকেই লক্ষ্য করলাম যে, দু-তিনজন লোক গুরু মহারাজের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে বা ওনার চারিপাশটায় ঘুরঘুর করছে। একজন গুরু মহারাজকে বললেন যে “এরা কোনো একটা কাগজের রিপোর্টার ! এরা ঘরের ভিতরে আলাদা করে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চায় , যাতে ওরা ওদের পত্রিকার জন্য একটা রিপোর্ট তৈরি করতে পারে।” এর উত্তরে গুরুজী তাদের মুখের উপরে একবারে “না” বলে দিলেন ! বললেন তিনি পৃথকভাবে কোনো ইন্টারভিউ দেবেন না।
বেচারা রিপোর্টাররা আর কি করে ! তারা এদিক-ওদিক তাকিয়ে ধীরে ধীরে মন্দির প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে গেল। তখন গুরু মহারাজ মাধবানন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন_" মহারাজ ! এদের কথা রাখতে পারলাম না বলে তুমি কিছু মনে করলে না তো ?" মাধবানন্দ মহারাজ খুবই বিনয়ী ছিলেন, উনি এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন গুরু মহারাজ বলতে লাগলেন যে,_" ওরা যা জানতে চাইছিল, এখানে ওরা জিজ্ঞাসার মাধ্যমেই তার উত্তর পেতে পারতো কিন্তু তা না করে এই যে উপস্থিত সকল মানুষকে বঞ্চিত করে আমাকে আলাদা করতে চাইলো __এটাতেই আমি আপত্তি করলাম। এখানে যারা এসেছে তারা তো ঈশ্বর কথা শোনার জন্যই এসেছে!"
এরপর গুরুজী যে কথাটা বলেছিলেন সেই কথাটা শুনে আমার সারা শরীরে শিহরন বয়ে গিয়েছিল ! কথাগুলি আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল এবং ওই কথা নিয়ে আমি পরবর্তীতে অনেকদিন ধ্যান করেছিলাম_ সেইটা আমি এখন আপনাদের কাছে ব্যক্ত করছি। উনি বলেছিলেন “আমি এখানে প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। আমি অধ্যাত্ম শিক্ষা দিতে এসেছি, যাতে মানুষ সেই শিক্ষা তার জীবনে যোজনা করতে পারে!”
গুরু মহারাজ ছিলেন ত্রিকালজ্ঞ মহাপুরুষ ! তাই তিনি সকল মানুষের সকল জিজ্ঞাসার জবাব মুহূর্তের মধ্যে দিতে পারতেন। কিন্তু সেদিন ঐ লোকগুলিকে ফিরিয়ে দিয়ে উনি সকলকে এই শিক্ষাই দিলেন যে, প্রচার সর্বস্বতা নয়_ওনার ন্যায় মহাজীবনের সাথে সাধারণ ব্যক্তিজীবনের সংযোগ স্থাপন করে উনি উপস্থিত জনেদেরকে অধ্যাত্মমুখী করার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছিলেন।।
।।ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।।
