(অন্য কিছু না করে শুধুমাত্র ঈশ্বরের নাম করলেই সব হয় কিএই জিজ্ঞাসার পরবর্তী অংশ) …….আচ্ছা বলো তো শুধু ‘নাম’ উচ্চারণ করলে কি হবে ? হাজার বছর ধরে ‘চিনি’ ‘চিনি’ বললে কি মুখ মিষ্টি হবে ? ভাগবতে আছে ‘নাম স্মরণম’ অর্থাৎ নাম স্মরণ, নাম-নামী অভেদ জ্ঞানে নাম করা বা জপ করা। বীজমন্ত্রেও ইষ্ট রয়েছে—তার জপ রয়েছে। অর্থাৎ বাচিক, মানসিক বা উপাংশু যে কোনো প্রকার জপের ক্ষেত্রেই—’নাম’-এর সঙ্গে নামীকে যেন স্মরণ হয়। তোমার ছেলের নাম উচ্চারণের সঙ্গে যেমন তোমার ছেলের স্মরণ হয় তেমনি জপ করতে করতেই ভগবৎ স্মরণ হয়ে যাবে । আর স্মরণের গভীরতায় বৈখরীর নাম বন্ধ হয়ে গিয়ে তখন অন্তর্জগতে আপনা-আপনিই নাম চলতে থাকে। এই অবস্থাকেই শাশ্ত্রে অর্ধবাহ্যদশা বলা হয়েছে। বাহ্যদশা, অর্ধবাহ্যদশা আর অন্তর্দশা—মহাপ্রভু এই তিন ভাবেই থাকতেন, একেই বলা হয়েছে __বহিরঙ্গা, তটস্থা আর অন্তরঙ্গা। ‘বহিরঙ্গ সঙ্গ করে নাম সংকীর্তন, অন্তরঙ্গ সঙ্গে করে প্রেম আলাপন’–ফলে বহিরঙ্গটা শুরু আর প্রেমে শেষ। প্রেমই পরম পুরুষার্থ। কিন্তু নাম-কারীদের এই লক্ষ্য কি থাকছে?

মুখে ‘নাম’ আর অন্তরে কুচিন্তা – কি লাভ হবে বলো দেখি ? ‘’যাদৃশী ভাবনা যস্য সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী’’ ——যার যেমন ভাব তার তেমন লাভ–ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একথা বলতেন। ভাবগ্রাহী জনার্দন ভাব দেখেন,ভাব গ্রহণ করেন_ কে কি উচ্চারণ করলো তা দেখেন না। কতো সাধক আছে যারা ইষ্টকে গালি-গালাজ করে, খিস্তি দেয়_ কই ঈশ্বর তো কখনও তাদের উপর বিরূপ হ’ন না ! বামাখ্যাপা তাঁর ইষ্টদেবীকে কত গালি-গালাজ করতেন কিন্তু তাতেও তাঁর সদাসর্বদা ইষ্ট-সাক্ষাৎকার হোতো।

  অধ্যাত্মবিজ্ঞানী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন__ 'ঊনপঞ্চাশ বর্ণরূপিণী মা তোমাকে প্রণাম। ঐ বর্ণ দিয়েই বেদ-বেদান্ত আবার ঐ বর্ণ দিয়েই খিস্তি-খেউড়ে'। ঠাকুর কি সুন্দরভাবে সমগ্র ব্যাপারটা বোঝালেন। সুতরাং বর্ণ বা শব্দ বড় কথা নয়, ওটা তো একটা মাধ্যম ! ভাষা হোচ্ছে ভাবপ্রকাশের মাধ্যম মাত্র। সুতরাং মুখের ভাষা বা মুখে উচ্চারণ করে কিছু বলা __এগুলো বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে সাধকের 'ভাব'। ভাবনায় ভগবান থাকলেই ভগবৎ সাক্ষাৎকার হয়, নাহলে হাজার চিৎকার করলে বা খোল-খঞ্জনি বাজিয়ে লম্ফ-ঝম্প করলেও কোনো কিছুই লাভ হবে না ।

    তাহলে নিশ্চয় নামের রহস্য বোঝা গেল ! এবার কথা হোচ্ছে, যেসব গুরুরা শিষ্যদের প্রকৃত রহস্য না বুঝিয়ে শুধু ‘নাম করো’ ‘নাম করো' বলে থাকে__জেনে রাখবে এতে কিন্তু তাদের অপরাধ হয় !! কারণ এদের দ্বারা হাজার হাজার মানুষ শুধুমাত্র প্রভাবিত‌ হোচ্ছে এমনটাই নয়—এরা প্রত্যেকে প্রতারিত‌ও হোচ্ছে। আর এই অপরাধের জন্য তাদের শাস্তিও গ্রহণ করতে হয়। বাবা_ আধ্যাত্মিক জগতের বিচিত্র বিধান !! অবশ্য সেই বিচারসভা যেখানে বসে_ সেটা সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরে ! 

যাইহোক্‌ এসব জেনে তোমাদের কাজ নেই। তোমরা শুধু এটা মনে রাখবে যে, জগতে যতো মানুষ আছে, এদের সবাই কলিহত জীব নয়। মানবজাতির মধ্যে সবসময়ই তুরীয় স্বভাবের মানুষ থাকেন, তাঁরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কোনো শাসন-বারণের মধ্যে তাঁরা পড়েন না। বরং তাঁরাই নতুন নতুন যুগোপযোগী পরম্পরা সৃষ্টি করেন। সাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষ আছে, যারা জ্ঞানযোগ অবলম্বন করেও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারে। রাজসিক প্রকৃতির মানুষ রয়েছে, যারা রাজযোগ অবলম্বন করে আধ্যাত্মিক উন্নতি করতে পারে। এ ছাড়াও সাত্ত্বিক বা রাজসিক ব্যক্তিরা 'বহুজন হিতায়' ও ‘বহুজন সুখায়' কর্ম করে অর্থাৎ লোকহিতকর কর্মে আত্মনিয়োগ করেও চেতনার উত্তরণ ঘটাতে পারে। কিন্তু তামসিক ব্যক্তি বা কলিহত জীব যদি আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কোনো সদগুরুর কাছে যায়, তাহলে তিনি তাকে কেঁদে কেঁদে ‘নাম' করার বিধান দেন। সুতরাং ওটা কখনই ভেবো না যে, সকলকে এক ক্ষুরে মাথা কামাতে হবে বা সকলকে এক ছাঁচে ফেলে একই রকম বানাতে হবে। বৈচিত্র্যই প্রকৃতির ধর্ম, এখানে সবার জন্য এক নিয়ম—এই কথাটাই অর্থহীন। তাই যদি কেউ এটা বলে যে, 'নাম ছাড়া গতি নেই'- জানবে সে হয় ভ্রান্ত অথবা আহাম্মক ছাড়া আর কিছু নয়।

   আমি ছোটবেলা থেকেই অনেক অষ্টম প্রহর ---চব্বিশ প্রহর ইত্যাদি হরিবাসর দেখেছি ! কারণ আমার পূর্বাশ্রম ছিল কালনা-নবদ্বীপ সন্নিকটস্থ স্থানে। ফলে ওখানে অষ্ট প্রহর, চব্বিশ প্রহর ইত্যাদি নানা হরিবাসরের অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো এখনও হয়তো বা আছে। সেখানে দেখেছি__অংশগ্রহণকারীদের বেশীর ভাগেরই শুধু হৈ হৈ আর লম্ফঝম্প ! আবার অনেককে দেখতাম যে, ঐসব করতে করতেই ভাবাবেগসম্পন্ন হয়ে পড়ে_হাঁসে,কাঁদে,উল্টে পড়ে যায়। কেউ কেউ আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে __ওরা স্নায়বিকভাবে দুর্বল। কিন্তু প্রকৃত ভগবদভাব নার্ভকে দুর্বল করে না-শক্তিশালী করে। অধ্যাত্মজগতে প্রথম অবস্থায় emotion দরকার আছে কিন্তু emotion with sincerity (আন্তরিক আবেগ) -কেই "শ্রদ্ধা" বলে, যা জ্ঞানলাভে সহায়তা করে। এইজন্যই বলা হয় ‘শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম্'। আর emotion without sincerity (আন্তরিকতাবিহীন ভাবাবেগ) হলেই সর্বনাশ । কারণ অতিরিক্ত excitement বা উত্তেজনায় মানুষ তার শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং পাগলের ন্যায় আচরণ করে ও মুর্ছা যায়। সবাই ভাবে—ভাব হয়েছে বা লোকটি আধ্যাত্মিক। কিন্তু তা নয়, ও যদি ঐ ভাবাবেগ সম্বরণ করতে না পারে, তাহলে পরে তার স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সে কঠিন ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।    

   সেইজন্যই বলছিলাম emotion without sincerity-- বিকার সৃষ্টি করে। এটা একদম ভালো নয়। আবার দেখ Intelligence (বুদ্ধি) ভালো, কিন্তু তা যদি বিবেকযুক্ত হয় অর্থাৎ Intelligence with  conscience তাহলে আরও ভালো। বিবেকযুক্ত বুদ্ধির দ্বারাই জ্ঞানলাভ সম্ভব। অন্যথায় Intelligence without conscience  হোলে তা nonsense হয়ে যাবে।

 তাই মস্তিষ্ক, হৃদয় ও পেশীশক্তির পূর্ণ বিকাশেই পূর্ণতা আসে । আর তখনই মানবজীবনের সার্থকতা আসে।।