[গুরুজীর জীবনে ঘটা অলৌকিক (তথাকথিত) ঘটনা নিয়ে গতদিনের আলোচনার শেষ অংশ। ]
….. আবার বর্ধমানে নার্সিংহোমে টগরের বাবার তখন শেষ অবস্থা। ঠিক ঐ দশটা দশ মিনিটেই আমি(গুরুজীর তৃতীয় শরীর) সাত্তার সাহেবের শেষ শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ওনার সাথে কথা বলেছি, টগরের মা এবং টগরসহ বাকীদের মনে জোর আনার জন্য সাহস দিয়েছি । আর এও বলেছি যে, তৃষাণ আসবে চিন্তার কোনো কারণ নেই—ও সব ব্যবস্থা করে দেবে। তারপর টগরকে পাশের হোটেলে নিয়ে গিয়ে ভালো করে খাইয়েছি, কারণ বাবা মারা গেলে হয়তো আর খেতে পাবে না। তারপর ওর হাতে কিছু টাকা দিয়ে, ‘ভীষণ কাজের চাপ, অতএব শনিবার দেখা হবে’ এইকথা জানিয়ে চলে গিয়েছি।
আমার আর একটা শরীর(চতুর্থ শরীর) ঠিক ঐ সময়েই অর্থাৎ দশটা দশ মিনিটেই কৃষ্ণদেবপুরে আমার মায়ের কাছে প্রকট হয়েছিল। সেই শরীরটা মাকে প্রণাম করে মাকে প্রতি মাসের প্রদেয় অর্থ দিয়েছে, মায়ের কাছে বসে জলখাবার খেয়েছে, তারপর ভীষণ ব্যস্ত অতএব শনি/রবিবার আবার আসবে বলে বিদায় নিয়েছে। অর্থাৎ সেই মুহূর্তে মূল শরীরসহ আমার চারটে শরীর একই সময়ে চার জায়গায় প্রকাশমান ছিল।
আমার মূল শরীরটা তো মাঠে আমগাছতলায় বসে বিশ্রামরত অবস্থায় ছিল। এদিকে যে এতো কাণ্ড ঘটে গেছে তাতো আমি কিছুই জানি না, আমি যেন বেশ কিছুটা সময় ঘোরের মধ্যে ছিলাম ! কিন্তু যখন আমার ঐ অবস্থাটা কাটলো তখন যেন আমার মনে হোলো যে, আমার শরীর অনেকটা fresh হয়ে গেছে এবং আমার মনের মধ্যে যে চাপ এবং দুশ্চিন্তা ছিল, সেগুলোও আর একদম ছিল না। যাইহোক, শুক্রবার পর্যন্ত অর্থাৎ আরও ২/৩ দিন পর্যন্ত কাজটা চলেছিল। তারপর যথারীতি শনিবার সকালেই তৃষাণ আমার কাছে গিয়ে হাজির হোলো। ও গিয়ে খবর দিল যে, টগরের বাবার মৃত্যু হয়েছে। শুনেই আমি বললাম, ‘চলো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি, একবার টগরদের বাড়ী যাওয়া দরকার।' ও তখনও আমাকে ঘটনাগুলো বলেনি। তৃষাণ তো ঐ ঘটনার দিন আমার কাছে টগরের বাবার অন্তিম অবস্থার কথা শুনেই বর্ধমানে নার্সিংহোমে চলে গিয়েছিল। ওখানে টগররা বলেছে যে, ‘রবীনদা কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত ওদের সঙ্গেই কাটিয়েছে।' একথা শুনে তৃষাণ প্রথমটায় মৃদু প্রতিবাদ করেছিল। তারপর যখন টগরের মাও ব্যাপারটার সত্যতার কথা বলেছিলেন, তখন তৃষাণ কিছু একটা রহস্যের গন্ধ পেয়ে চুপ করে যায়। এদিকে তো টগরের বাবা মারা যাওয়ায় সেদিকেই সবাই ব্যস্ত, এই ব্যাপারটায় আর কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। তৃষাণ বুদ্ধিমান ছেলে, ওর মনে কিন্তু একটা ধন্দ রয়েই গিয়েছিল যে, এর মধ্যে রহস্য কিছু একটা আছে ! এবার ও যখন শনিবার ক্যাম্পে এলো এবং আমি যখন বললাম যে, ‘টগরের বাবা মারা গেল – দ্যাখো দেখি ওনার মৃত্যুকালে আমার থাকার কথা ছিল, তা আর রাখা হোলো না__ তখনও তৃষাণ চুপ ছিল, আমাকে কিছুই বলেনি। তারপর চক্ষণজাদী পৌঁছে প্রাথমিক শোকপর্ব সামাল দেবার পর সেদিনের ঘটনার কথা উঠলো। বর্ধমানে আমার উপস্থিতির কথা তুলে টগরের মা বলতে লাগলেন, _"বাপী, তোর উপস্থিতির জন্যই টগরের বাবা মৃত্যুকালেও আনন্দ করেছিল আর আমরাও মনে জোর পেয়েছিলাম এবং তুই ভাগ্যিস্ তৃষাণকে পাঠিয়েছিলি – নাহলে কি যে হোতো'—ইত্যাদি সব কথা।
আমি এসব শুনে অবাক হয়ে তৃষাণের দিকে তাকাতেই তৃষাণ হেসে আমাকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বললো। পরে ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা কৃষ্ণদেবপুরের দিকে রওনা হোলাম। পথে যেতে যেতে তৃষাণ আমাকে ঘটনাগুলো বললো। এর পর কৃষ্ণদেবপুরে পৌঁছে আর এক বিস্ময়! মাকে প্রণাম করে টাকা দিতেই মা বলে উঠলো, ‘কিসের টাকা রে ! এইতো ৩/৪ দিন আগে এসে টাকা দিয়ে গেলি !”
যাইহোক, এইরকম ঘটনা পরেও ঘটেছে, এখন আমি বুঝতে পারি যে, মা জগদম্বা বর্তমানে এই পরমানন্দরূপ শরীরটাকে নিয়ে নানান খেলা খেলছেন। তবু ঐ যে ঘটনা দুটোর কথা উল্লেখ করলাম, ওগুলোর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত পাইনি। পরবর্তীকালে আমার সন্ন্যাসের পর ব্রহ্মজ্ঞপুরুষ গুরুদেব স্বামী রামানন্দ অবধূতজীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এইসব ঘটনাগুলি ঘটার পিছনে কারণ কি ?’ উনি উত্তর দিয়েছিলেন, ”ব্রহ্ম কা অনন্ত মহিমা হোতি হ্যায় বেটা ! ইয়েভী এক মহিমা থী। লেকিন ইয়ে সব ঘটনাহী মায়া হ্যায়, কেবল ব্রহ্মহী সত্য।” (ব্রহ্মের অনন্ত মহিমা বেটা ! এটাও তাঁর একটা মহিমা। কিন্তু জানবে সমস্ত ঘটনাটাই মায়া—কেবল ব্ৰহ্মই সত্য।)
আবার জানো তো ঐ ঘটনাগুলোর কারণ সম্পর্কে কোনো ভগবৎ ভক্তের কাছে জানতে চাইলে, তিনি উত্তরে বলবেন— ‘ওগুলি ভগবানের লীলা।’ আর কোনো যোগীর কাছে ঐ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি হয়তো বলবেন, ‘ওগুলি পরমেশ্বরের যোগ-বিভূতি।’ ঐ ঘটনার ব্যাখায় অনেকে ঐ সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলতে পারেন, কিন্তু আমি এই নিয়ে অনেক চিন্তা করেও—ঐ ঘটনাগুলোর আজ পর্যন্ত স্বাভাবিক কোনো ব্যাখ্যা পাই নি !
