গুরুমহারাজের সাথে আমাদের বাউল মেলা (জয়দেব) _য় সাক্ষাৎ এর কথা হচ্ছিল।
বোলপুরে রবীন ঠাকুরের(রবীন্দ্রনাথ) স্থান ঘুরে বিকেলের দিকে আমরা আবার বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম । ওখান থেকে টানা বাস ধরে একেবারে জয়দেব মেলা । বাস থেকে নামতে নামতেই প্রায় সন্ধ্যা ! চারিদিকে লোকে লোকারণ্য ! প্রথমবার জয়দেব মেলায় গিয়ে আমাদের মনে হয়েছিল ওখানে যদি ১লক্ষ লোক থাকে তাহলে ১০ হাজার সঙ্গীতশিল্পী (কীর্ত্তনীয়া এবং বাউল) , ১o হাজার পুলিশকর্মী আর বাকীরা দর্শক বা শ্রোতা। মেলায় ঢুকতেই সার সার খাবারের দোকান ! গরম গরম জিলিপির চূড়া হয়ে আছে ! সারাদিনের পর ওই গরম জিলিপির গন্ধে পেটের ক্ষিদেটা চনমনিয়ে উঠল । ধীরুভাই থাকতে না পেরে বলেই ফেলল – ‘তাহলে একটু হালকা করে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক্’ । কিন্তু গুরু মহারাজের কাছে আমার শোনা ছিল যে কোন তীর্থস্থানে গেলে সেখানে গিয়ে আগে সেই স্থানের অধিপতি দেবী বা দেবদর্শন করতে হয় – তারপর অন্যকিছু ! দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল মদনমোহনের(!) মন্দিরের চূড়া (জয়দেবের পূজিত ঠাকুর) ৷ সেইদিকে হেঁটে যাচ্ছি জনস্রোতে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়ে ! পৌঁছেও গেলাম সেখানে – কাছে যাবার তো উপায় নাই , তাই দূর হতেই প্রণাম করলাম দেবোদ্দেশ্যে!
এবার মেলা দেখতে যাবার পালা । তার আগে গরম গরম জিলিপি ও কিছু অন্যান্য খাবার খেয়ে নেওয়া ৷ এবার আবার জনস্রোতে নিজেদেরকে মিশিয়ে দেওয়া ! কোনদিকে চলেছি জানি না – চারিদিক থেকে অজস্র মাইকের আওয়াজ — কীর্ত্তন আর বাউলের আওয়াজ । প্রচুর প্যান্ডেল , যেখানে বসেছে কীর্ত্তন বা বাউলগানের আসর । কিন্তু সব জায়গাতেই উপচে পড়া ভিড় ৷ হঠাৎ এক জায়গায় দেখি বাঁদিকে লেখা আছে “কদম্বখন্ডির ঘাট”। আমার পিছনে ধীরুভাই , তার পিছনে মুকুল – আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ধীরুভাইকে বললাম – “এই দ্যাখ ! এখানেই জয়দেবের কৃষ্ণ দরশন হয়েছিল।” এ কথাটা বলে ঘাড় ঘুরিয়েছি — আর দেখি একজনের পেটের সাথে আমার পেটটা লেগে আটকে গেছে ! কপালে কপাল ঠেকে গেছে ! ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই দেখি আমাদের পরমারাধ্য গুরুদেব , আমাদের ইষ্ট , আমাদের ইহকাল পরকালের ত্রাতা – স্বামী পরমানন্দ !!
হঠাৎ এইরকমভাবে ঐ ভয়ঙ্কর ভিড়ের মাঝে ওনাকে দেখতে পেয়ে সত্যি সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে উনি গুরুদেব স্বামী পরমানন্দ ! কিন্তু বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার শিকদাঁড়া বরাবর একটা আনন্দের স্রোত নিচ থেকে ক্রমাগত উপর দিকে উঠে যাচ্ছিল ৷ ঐ প্রবল জনস্রোতের মাঝে কিভাবে যে আমরা ২/১ মিনিট Static হয়ে গিয়েছিলাম এটাও একটা আশ্চর্য্যের ব্যাপার ! অবশ্য ওনার(গুরুমহারাজের) সব কিছুই আশ্চর্য্য — সবটাই অতিলৌকিক ! যাইহোক আমার মনে হচ্ছিল হয়তো এটা সত্যি নয় ! আবার যখন মনে হোল – এটা সত্যি তখন মনে হচ্ছিল ওনাকে জড়িয়ে জাপটে ধরি ! ধরতেই যাচ্ছিলাম – কিন্তু দেখি পেছনেই তপিমা , তার পেছনে মিহির মহারাজ এবং তার পিছনে কাজল ডাক্তার (নবদ্বীপের কাজল ডাক্তার, বনগ্রাম আশ্রমের ব্রহ্মচারী ও ডাক্তার – এখন শিলং-এ রামকৃষ্ণ মিশনের শাখায় ডাক্তারী করে)। ফলে গুরু মহারাজকে জড়িয়ে ধরা আর হোল না ৷ উনিই আমার নাকটা টিপে ধরে একটু আদর করে দিয়ে বললেন – “কি রে ! তোরা ?” বললাম – “হ্যাঁ গুরু মহারাজ ! আমরা !” উনি বললেন – “কোথায় উঠেছিস ?” বললাম – “কোথাও উঠিনি !” উনি বললেন – “আমরাও কোথাও উঠিনি — চল্ তাহলে , মেলা ঘোরা যাক্ !” আমরাও মুখ ঘুরিয়ে ওনার পিছু ধরলাম ৷
এর ফাঁকে ঐ ভিড়ের মধ্যেই ধীরুভাই বা মুকুল গুরু মহারাজকে প্রণাম করতে পেরেছিল কিনা বা সেই চেষ্টা করেছিল কিনা – সেটা আর মনে নেই । তবে এবার শুরু হয়েছিল মহাবাউলের সাথে বাউল মেলা ভ্রমণ ! সেই ভ্রমণে কিন্তু আমি সুযোগ ছাড়িনি (অবশ্যই উনি সেই সুযোগ দিয়েছিলেন) । কিন্তু এটা আমি বুঝে ফেলেছিলাম যে ভগবান সহজ ! আমরাই অসহজ ! অসহজতা হেতু আমরা ভগবানের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরী করে নিই । এর জন্য আমরাই দায়ী — আমাদের অসহজতাই দায়ী ৷ তাই সেই রাত্রে আমি কোন কারণেই ভগবানের দেওয়া সুযোগ গ্রহণ করতে কসুর করিনি ! একদম ভগবানের কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে ঘুরেছি_ অবশ্যই যেখানেই সুযোগ পেয়েছি ! ভিড়ের জন্য সবসময় পাশে হাঁটা সম্ভব ছিল না – তাই সবসময় সুযোগটা পাইনি ৷ কিন্তু যখনই সুযোগ পেয়েছি একেবারে পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে হেঁটেছি, আর হাঁটতে হাঁটতেই অনেক কথা বলেছি ৷ প্রচুর জিজ্ঞাসা করেছিলাম সেদিন , উনি করুনাপরবশ হয়ে সব কথার উত্তর দিয়েছিলেন ৷
