গৃহ যবে হল মোর বৈকুণ্ঠ ধাম – ন’কাকা
কবিশেখর কালিদাস রায় লিখেছিলেন :–“রূপ-সনাতন রহেন দু’জন সাধন-ভজন রত,কে আসে কে যায় ব্ৰজে তার খোঁজ রাখেন না অতশত।পাণ্ডিত্যের খ্যাতি তাঁহাদের রটিয়াছে সারা দেশে,বিচারমল্ল তাই শুনে আজ অভিযান করে শেষে।দুইভাই ব্ৰজে প্রেমাবেশে মজে বিভাের আছেন সুখে,যুদ্ধং দেহি হাঁকিয়া দাঁড়াল সে তাঁদের সম্মুখে।পরমাগ্রহে মৃদু হাসি দোঁহে বসাইয়া সমাদরে,বিজয়পত্র লিখিয়া দিলেন জয়-ভিখারির করে।৷”পণ্ডিত বল্লভভট্ট এসেছেন বৃন্দাবনে। শুনেছেন রূপ-সনাতনের পাণ্ডিত্যের কথা। তাই মনে একটু অহঙ্কার যে, তাঁদেরকে তর্কযুদ্ধে পরাস্ত করে...
“প্রত্যক্ষ তাঁহার তপ্তকাঞ্চনের দ্যুতি।যাঁহার ছটায় নাশে অজ্ঞান-তমস্ততি৷৷জীবের কল্মষ-তমাে নাশ করিবারে।অঙ্গ-উপাঙ্গ-নাম নানা অস্ত্র ধরে।৷ভক্তির বিরােধী কর্ম-ধর্ম বা অধর্ম।তাহার ‘কল্মষ’ নাম, সেই মহাতম।৷বাহু তুলি ‘হরি বলি’ প্রেমদৃষ্ট্যে চায়।করিয়া কল্মষ নাশ প্রেমেতে ভাসায়।৷” – শ্রীল কৃষ্ণদাস—ভগবৎ লীলা, গৌরলীলা ভক্ত ছাড়া কে প্রকাশ করতে পারে ! ভক্তের কাছে ভগবান সরল থেকে সরলতর বা সরলতম হয়ে থাকেন। যিনি এই সমগ্র বিশ্বচরাচরকে আকর্ষণ করেন, তিনিই আবার ভক্তের দ্বারা আকৃষ্ট হন লীলাবিলাসের নিমিত্ত।...
‘'বন্দেহনন্তাদ্ভুতৈশ্বৰ্য্যং শ্রীনিত্যানন্দমীশ্বর।যস্যেচ্ছয়া তৎস্বরূপমজ্ঞেনাপি নিরূপ্যতে।৷"(চৈঃ চঃ আদিলীলা)–যাঁর ইচ্ছায় মূঢ় ব্যক্তিও তাঁর স্বরূপ নির্ণয় করতে পারে, সেই অনন্ত অদ্ভুতৈশ্বৰ্য্যবান ঈশ্বর নিত্যানন্দ প্রভুকে বন্দনা করি।কথিত আছে রাধাকে না ধরলে কৃষ্ণদরশন হয় না আর নিত্যানন্দের কৃপালাভ না করলে গৌরাঙ্গের কৃপালাভ হয় না। তাই নিত্যানন্দ বন্দনা করে আজকের প্রবন্ধ শুরু করতে প্রবৃত্ত হয়েছি। আমরা আগের সংখ্যায় জেনেছিলাম যে, সনাতন ও অনুচর ঈশান নদী পার হতে গিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েছেন। সেখানকার...
“ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ।অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।” –(চৈঃ চরিঃ)–সচ্চিদানন্দ শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর। তিনি সকলের আদি ; কিন্তু তাঁর আদি কেউ নেই, তিনি গােবিন্দ এবং সর্ব কারণের কারণ।এ হেন কৃষ্ণ-গুণগান বা হরি-গুণগান করা জীবের সাধ্য নয়। আর ভগবান নিজেই বলেছেন, ‘‘ভক্ত, ভাগবত আর ভগবান এক।" তাই ভক্ত গুনগানও সেই ভগবানেরই মহিমা কীর্তন। তাই ভগবানের ভক্তশ্রেষ্ঠ এই রূপ-সনাতন-শ্রীজীব আদি ছয় গোঁসাই-এর মহিমা কীর্তনের প্রয়াস। সনাতনের কাশীযাত্রা এবং মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাতের কথা আমরা আগে...
শ্রবণং কীৰ্ত্তনং বিষ্ণোস্মরণং পাদসেবন। অৰ্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদন। ইতি পুংসার্পিতা বিষ্ণৗে ভক্তিশ্চেন্নবলক্ষণ।৷ (শ্রীমদ্ভাগবত ৭৫।১৮) –বিষ্ণুর নাম শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, পাদসেবা, অর্চনা, বন্দনা, দাস্য, সখ্য ও আত্মনিবেদন--ভগবান বিষ্ণু-ভক্তের তাে এই নবলক্ষণী ভক্তি দরকার। প্রভু শােনাচ্ছেন সনাতনকে এইসব তত্ত্ব কথা। ভাগবত অমৃতকথা উৎসারিত হচ্ছে ভগবানের শ্রীমুখ থেকে। তুষারধবল পর্বতনিঃসৃত ঝরনার ধারা যেমন স্বতঃই ঝর ঝর করে উৎসারিত হয়, তেমনি গৌরহরির শ্রীকণ্ঠ থেকে কৃষ্ণকথা, কৃষ্ণ গুণগান,...
চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী মহাশয় মধ্যলীলায় এক শ্লোকে লিখেছেন _"ধর্মচারী মধ্যে বহুৎ কর্মনিষ্ঠ, কোটি কর্মনিষ্ঠ মধ্যে এক জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ/ কোটি জ্ঞানী মধ্যে হয় একজন মুক্ত, কোটি মুক্ত মধ্যে দুর্লভ এক কৃষ্ণভক্ত।" সেই দেবদুর্লভ কৃষ্ণভক্তের আলেখ্য এখানে পরিবেশিত করার প্রয়াস __বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার প্রচেষ্টা মাত্র। তবু এই চেষ্টায় সহৃদয় ভক্ত পাঠকগনের কিছুটা হোলেও যদি অন্তরের চাহিদা পূরণ হয় _তাহলেই এই লেখার সার্থকতা। আমরা বৈষ্ণব শিরোমণি সনাতন গোস্বামীর সাথে মহাপ্রভুর...
২০১২/২ শ্রী্শ্রী চৈতন্যচরিতামৃতকার শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর অমূল্য গ্রন্থের মধ্যলীলায় সনাতনপৃরভূর রোগমুক্তির ঘটনা নিয়ে লিখেছেন__ " প্রভু স্পর্শে প্রেমাবিষ্ট হইল সনাতন/ মোরে না ছুঁইহ কহে গদগদ বচন।। দুইজনে গলাগলি রোদন অপার / দেখি চন্দ্রশেখরের হইল চমৎকার ।। তবে প্রভু তাঁর হাতে ধরি লইয়া গেলা/ পিন্ডার উপর আপন পাশে বসাইলা।। শ্রীহস্তে করেন তার অঙ্গ সমার্জন / তেঁহো কহে মোরে প্রভু না করো স্পর্শন ।। প্রভু কহে তোমা স্পর্শি আত্মপবিত্রিতে/ ভক্তিবলে পারো তুমি ব্রহ্মাণ্ড শোধিতে।।" __এহেন সনাতনের ভক্তি...
২০১২/৩ ।।ভাগবত-কথা।। "বন্দে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যং কৃষ্ণভাবামৃতং হি যঃ।আস্বাদ্যাস্বাদয়ন্ ভক্তান্ প্রেমদীক্ষামশিক্ষয়ৎ।।"__যিনি স্বয়ং কৃষ্ণভাবসুধা আস্বাদনপূর্বক ভক্তবৃন্দকে আস্বাদন করাইয়া, তাহাদিগকে প্রেমদীক্ষা উপদেশ করিয়াছিলেন, আমি সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে বন্দনা করি।। জয় জয় শ্রীচৈতন্য জয় নিত্যানন্দ / জয়াদ্বৈতচন্দ্র জয় গৌরভক্তবৃন্দ ।। __ত্যাগ-তিতিক্ষা -বৈরাগ্য সাধনে ও কৃষ্ণপ্রেমের পরানুভূতির সাথে সনাতনের জীবনে আরও মিলিত হয়েছিল অসাধারণ প্রতিভা, অগাধ শাস্ত্রজ্ঞান ও শ্রমের প্রতি নিষ্ঠা । বিগ্রহ...
২০১২/৪ ।।ভাগবত-কথা।। "অন্তঃকৃষ্ণং বহির্গৌরং দর্শিতাঙ্গাদিবৈভবম্। কলৌ সংকীর্ত্তনাদ্যৈঃ স্মঃ কৃষ্ণচৈতন্যমাশ্রিতাঃ।।"__যিনি অন্তরে কৃষ্ণ ও বাহিরে গৌর, যাঁর মহিমা অন্তরঙ্গ ভক্তবৃন্দে সুপ্রকাশিত, সেই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে কলিযুগে সংকীর্তনাদির দ্বারা ভজনা করি। আমরা পরম প্রেমময় ঠাকুর শ্রীচৈতন্য গোঁসাইয়ের পার্ষদদের প্রসঙ্গ বর্ণনা করতে করতে ছয় গোঁসাইকে পরপর আনার চেষ্টা করছি । কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর অমূল্য গ্রন্থ, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজের আকরগ্রন্থ বললেও অত্যুক্তি হয়না _সেই গ্রন্থের ভনিতায় ছত্রে ছত্রে...
২০১৩/১ ।।ভাগবত-কথা।। "বন্দে গুরুনীশ ভক্তানীশমীশাবতারকান্। তৎ প্রকাশংশ্চ তচ্ছক্তিঃ কৃষ্ণচৈতন্যসংজ্ঞকম্।।"__কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে সকল গুরুদের, ভগবৎ ভক্তদের, অবতার সকলের এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে বন্দনা করে তাঁর গ্রন্থ শুরু করেছিলেন । তিনি লিখেছিলেন _"মন্ত্রগুরু আর যত শিক্ষাগুরুগণ / তা সবার আগে করি চরণ বন্দন।/ শ্রীরূপ, সনাতন, ভট্র রঘুনাথ/ শ্রীজীব, গোপাল ভট্র, দাস রঘুনাথ । /এই ছয় গুরু শিক্ষাগুরু যে আমার/ ইহা সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।। গুরুর মহিমা বোঝাতে কবিরাজ মহাশয়...
২০১৩/২ ।। ভাগবত-কথা।। " শ্রীগৌরাঙ্গের দুটি পদ, যার প্রেমসম্পদ,সে জানে ভকতি রস সার / শ্রী গৌরাঙ্গের মধুর লীলা, তার কর্ণে প্রবেশিলা, হৃদয় নির্মল ভেদ তার।।" মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ বৈষ্ণব গোঁসাই-এর মহিমা বর্ণনের প্রয়াসে এবার আমাদের আলোচ্য বিষয় মহাজন "শ্রীজীব গোস্বামী"-র লীলা কাহিনী! রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামীর ভাতুষ্পুত্র শ্রীজীব প্রেমভক্তির পরম পরাকাষ্ঠা ছিলেন । এই তিনজন মহাজনের ভক্তিভাবকে ফুটিয়ে তুলতেই হয়তো শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধুসুন্দর মধুর পদ রচনা করেছিলেন _"হা রাধাগোবিন্দ বলে কবে...
২০১৩/৩/৪ ।।ভাগবত-কথা।। "কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্র-পার্ষদম্। যজ্ঞৈঃ সংকীর্তন-প্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ।।"__যাঁর মুখে কৃষ্ণনাম, বর্ণ যার গৌর এবং অঙ্গ-উপাঙ্গরূপ অস্ত্র ও পার্ষদ নিয়তই যাঁর বর্তমান, তাঁকেই সুমেধাগণ নামসংকীর্তনরূপ যজ্ঞ দ্বারা উপাসনা করে থাকেন । শ্রীমদ্ভাগবতের 11/ 5 /29_ শ্লোকে যেন চৈতন্যপ্রভুর মহিমার কথাই বর্ণনা রয়েছে__ অন্তত কৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাশয় সেইরূপই _এর ব্যাখ্যা করেছেন । তিনি লিখেছেন __"কৃষ্ণ এই দুই বর্ণ সদা যাঁর মুখে / অথবা কৃষ্ণকে তিঁহো বর্ণে নিজ...
।। ভাগবত-কথা।।২০১৪/১ (পূর্ব প্রকাশিতের পর) "অগত্যেকগতিং নত্বা হীনার্থাধিকসাধকম্। শ্রীচৈতন্যং লিখাম্যস্য মাধুর্য্যৈশ্বর্যশীকরম্।।"__"গতিহীন ব্যক্তিগণের একমাত্র গতি, নিঃসম্বলগণের উপায় স্বরূপ চৈতন্যদেবকে নমস্কার করিয়া তদীয় মাধুর্যময় ঐশ্বর্যকণা লেখা হইতেছে।"__চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যলীলা একবিংশ পরিচ্ছেদে কৃষ্ণদাস কবিরাজ একথা উল্লেখ করেছেন। "অগতির গতি"_ স্বয়ং ভগবান ছাড়া আর কেই বা হোতে পারে! তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা সহচর জীব গোস্বামীর জীবনালেখ্য আলোচনাকালে আমরাও সেই "অগতির গতি"- কে...
২০১৪/২ ।। ভগবৎ তত্ত্বকথা।। (পূর্ব প্রকাশিতের পর) "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্যং মামেকং শরণং ব্রজ। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।"__শ্রীমদ্ভাগবত গীতা ১৮/৬৬ । ___ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন _সর্বধর্ম পরিত্যাগ পূর্বক একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো, আমি তোমাকে সর্বপাপ হতে মুক্ত কোরবো, তুমি শোক করো না। সুতরাং সেই শ্রী হরির শরণ-ই জীবের ভরসা ও আশ্রয়স্থল জেনে তাঁকে স্মরণ করেই এই লেখার প্রয়াস ! পূর্বে শ্রীজীব গোস্বামীর লীলাকাহিনীর অনেকাংশই পরিবেশিত হয়েছে, এই সংখ্যায় অন্তিম অংশ পরিবেশিত...
।। ভগবৎ তত্ত্বকথা।। ২০১৪/৪ (পূর্ব প্রকাশিতের পর) শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলেছেন_" মন্ত্রগুরু আর যত শিক্ষাগুরুগণ, তা সবার চরণ আগে করিয়ে বন্দন । শ্রীরূপ, সনাতন, ভট্র রঘুনাথ, শ্রীজীব, গোপাল ভট্র, দাস রঘুনাথ । এই ছয় গুরু, শিক্ষাগুরু যে আমার _ইহা সবার পাদপদ্মে কোটি নমস্কার।"__ছয় গোঁসাইকে ছয় গুরু বলে বর্ণনা করেছেন চৈতন্যচরিতামৃতকার। আর ছত্রে-ছত্রে এঁদের প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা ভক্তি নিবেদন করেছেন। বৈষ্ণবের মে দীনতা, নম্রতা, নত হওয়ার যে ভাব __তা পরিপূর্ণভাবে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনায় দেখতে...
"অনন্ত চৈতন্যলীলা না যায় লিখন/ দিঙ্মাত্র দেখাইয়া করিয়া সূচন_শ্রীরূপ রঘুনাথ পদে যার আশ/ শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত কহে কৃষ্ণদাস।।"__(চৈ.চ.অন্তলীলা।১৫-পরিঃ) ___শ্রীচৈতন্যের লীলা বর্ণনা করা যায় না। আর রঘুনাথ বা অন্য গুরুদের প্রতি বারবার নমন কোরে কৃষ্ণদাস গোস্বামী পদ রচনা করেছিলেন। এই অপরিসীম শ্রদ্ধা ও বিনয়ই হোল বৈষ্ণবের ভূষণ! চৈতন্য বন্দনায় তিনি বলেছেন_" বন্দে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যং কৃষ্ণভাবনামৃতংহি যঃ। আস্বাদ্যস্বাদয়ন্ ভক্তান্ প্রেমদীক্ষামশিক্ষায়ৎ।।"__'যিনি স্বয়ং কৃষ্ণ ভাবসুধা আস্বাদনপূর্বক...
__মহাপ্রভুর এই সর্বত্যাগী বাউল ভাবকে আশ্রয় করে পরবর্তীতে যে কয়জন মহাজন ভক্তপ্রবর মহাপ্রভুর লীলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন_ তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন মহাসাধক উদ্ধারন দত্ত ঠাকুর। হুগলি জেলার গঙ্গার তীরবর্তী তীর্থস্থান ত্রিবেনীর অনতিদূরে সপ্তগ্রাম । এই সপ্তগ্রাম ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান । কারণ এটি বহু পূর্বে বাংলার নামকরা বন্দর ছিল, আর সেই সুবাদে বহুকাল থেকেই এখানে বণিককুলের বাস ! শ্রীকর দত্ত নামে সুবর্ণবণিক কুলে জাত একজন বণিক এখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করতেন, যাকে সবাই একডাকে চিনতো!...
২০১৭/১ ।।ভাগবত-কথা।। নবদ্বীপ লীলায় নিত্যানন্দ প্রভুর অবস্থা বর্ণনায় মহাজন লিখেছিলেন_" অক্রোধ পরমানন্দ নিত্যানন্দ রায় / অভিমানশুন্য নিতাই নগরে বেড়ায় । যে না লয়, তারে বলে দন্তে তৃণ ধরি/ আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি।।" আমরা গত সংখ্যায় নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপাধন্য উদ্ধারণ দত্তের কিছু কথা-কাহিনীর আলোচনা শুরু করেছিলাম --এবার তার পরবর্তী অংশ । সপ্তগ্রামের দিবাকর দত্ত নিত্যানন্দের কৃপায় উদ্ধারণ দত্ত নামে পরিচিত হলেন ভক্ত সমাজে। বণিকশ্রেষ্ঠ দিবাকর এখন ভক্তশ্রেষ্ঠ উদ্ধারণ ! দলে দলে ভক্তকুল হাজির হতে...
" নদীয়া উদয়গিরি, পূর্ণচন্দ্র গৌরহরি / কৃপা করি হইল উদয় ।/ পাপতমো হইল নাশ, ত্রিজগতের উল্লাস_/ জগভরি হরি ধ্বনি হয় ।"_আদিলীলা 13 পরিচ্ছেদ।। "রাধা কৃষ্ণ এক আত্মা _দুই দেহ ধরি/ অনন্য বিলাসে রস আস্বাদন করি।।/ সেই দুই এক এবে চৈতন্য গোঁসাই/ ভাব আস্বাদিতে দোঁহে হইলা এক ঠাঁই।/ সচ্চিদানন্দ-পূর্ণ কৃষ্ণের স্বরূপ / একই চিচ্ছক্তি তাঁর ধরে তিন রূপ । / আনন্দাংশে হ্লাদিনী,সৎ অংশে সন্ধিনী / চিৎ অংশে সম্বিত, যারে জ্ঞান করি মানি।।" "অন্তঃকৃষ্ণ বহিঃরাধা"_ গৌরহরি মর্তধামে লীলা করেছিলেন আজ থেকে মাত্র কমবেশি সাড়ে...
চৈতন্য চরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ উদ্ধারণ দত্ত সম্বন্ধে লিখেছেন __"মহাভাগবতশ্রেষ্ঠ দত্ত উদ্ধারণ / সর্বভাবে সেবে নিত্যানন্দের চরণ /"! গদাধর দাস তাঁর "জগন্নাথ মন্ডল" গ্রন্থে লিখেছেন __"ভক্ত উদ্ধারণ দত্ত পরম শাস্ত্রতে জ্ঞাত,/ সদা গোবিন্দের গুনগান।।/ আকর গ্রন্থ চৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবন দাস লিখেছেন __" উদ্ধারণ দত্ত মহাবৈষ্ণব উদার,/ নিত্যানন্দের সেবায় যাহার অধিকার ।/ কতদিন থাকি নিত্যানন্দ খড়দহে,/ সপ্তগ্রাম আইলেন সর্বজন কহে।/ উদ্ধারণ দত্ত ভাগ্যবন্তের মন্দিরে,/ রহিলেন প্রভুবর ত্রিবেনীর তীরে!"...
"বন্দে গুরুনীশভক্তানীশমীশাবতারকান্। তৎপ্রকাশাংশ্চ তচ্ছক্তীঃ কৃষ্ণচৈতন্যসংজ্ঞকম্।।"__আমি দীক্ষাগুরু- শিক্ষাগুরু প্রভৃতিকে, শ্রীবাসাদি ঈশ্বর ভক্তবৃন্দকে, অদ্বৈত প্রভুর প্রভৃতি ঈশাবতারদিগকে, ঈশ্বরের প্রকাশমূর্তি নিত্যানন্দ প্রভুকে, গদাধরাদি ঈশ্বরের শক্তিসমূহকে এবং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যাখ্য ভগবানকে বন্দনা করি।" গৌরপ্রেমে প্রেমিক বাসুদেব ঘোষ গোবিন্দ ঘোষ ও মাধব ঘোষ এই তিন ভাই সদাসর্বদা বিভোর হয়ে থাকেন। এই তিন ভাইয়ের সকলেই সুগায়ক পদকর্তা ও প্রেমিক । এদের মধ্যে বাসুদেব ঘোষের চৈতন্য বিষয়ক প্রচুর পদ...
মহাপ্রভু চলেছেন বৃন্দাবনের পথে ! কোনো কোনো পদকর্তা বলেছেন, _রামকেলি যাওয়ার পথে নবদ্বীপ থেকে সোজা গৌড়বঙ্গের ভিতর দিয়ে দ্বারবঙ্গ (বর্তমান দ্বারভাঙ্গা) হয়ে পশ্চিমাভিমুখে ছিল তৎকালীন যাত্রাপথ। যাইহোক, নবদ্বীপ থেকে প্রথমে শান্তিপুর, মহাপ্রভু যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই লোকজনের ভিড়, মহোৎসব! সেদিন মধ্যাহ্নের আহারের পর প্রভু গোবিন্দকে বললেন_" গোবিন্দ ! মুখশুদ্ধি আছে?" গোবিন্দ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো _"এই আনছি প্রভু !" বলেই গোবিন্দ জনে জনে প্রভুর জন্য প্রয়োজনীয় মুখশুদ্ধি, কারো কাছে রয়েছে কিনা...
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। বিভিন্ন বৈষ্ণব শাস্ত্রের বা গ্রন্থে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে । কবি বিজয়রাম লিখেছেন_" চা-পান করিয়া তাহা চলিল ত্বরিত। অগ্রদ্বীপে আসি নৌকা হইল উপস্থিত । / সেই স্থানে গোপীনাথ ঠাকুরের ঘর । অপূর্ব নির্মাণ বাটি দেখিতে সুন্দর ।।/" ____মহাপ্রভু স্বয়ং গোপীনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, গোবিন্দের তৈরি করা মাটির গৃহে।পাকাপোক্ত মন্দির তৈরি হয়েছিল আরও অনেক পরে । কথিত আছে গোপীনাথের প্রথম দেখার মত বড় মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র...
(বাসুদেব ঘোষ।) "চৈতন্য সর্বমন্ত্রস্য চৈতন্য সর্বমঙ্গলম্। চৈতন্য সর্বসুখদং চৈতন্য সর্বসিদ্ধয়ঃ।।"(বাসুদেব সার্বভৌম)__চৈতন্য হোলেন সর্ব মন্ত্রের সার, সর্বমঙ্গলেরও সার! তিনি সর্বসুখের আধার, আবার সর্বসিদ্ধিরও কারক । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদদের জীবনকাহিনী বর্ণনায় আজকের আলোচনা হবে বাসুদেব ঘোষকে নিয়ে ! আগের সংখ্যায় যে গোবিন্দ ঘোষের আলোচনা করা হয়েছিল, বাসুদেব ঘোষ তারই অনুজ । গোবিন্দ,বাসুর পিতা বল্লভ ঘোষের তিনটি স্ত্রী ছিল। প্রথমা স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান গোবিন্দ, মাধব ও বাসু। দ্বিতীয়া স্ত্রীর...
(চৈঃ চ. অন্ত্যলীলা—১৪ পরি.) –শ্রীমন্মহাপ্রভুর, বাউলরূপের বর্ণনা করেছেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ ! “দশেন্দ্রিয় শিষ্য করি–মহাবাউল নাম ধরি, শিষ্য লইয়া করিল গমন।” মহাপ্রভু যেখানেই যেতেন শিষ্যগণ সঙ্গে যেতেন – পরবর্তীতে উনি কাজের বিভাজন করে দেওয়ায় সবাই তাঁর সঙ্গে যেতে পারতেন না, কিন্তু আমাদের আলােচ্য মহাজন শ্রীল বাসুদেব ঘােষ প্রায়শই মহাপ্রভুর সঙ্গে সঙ্গে থাকার সুযােগ পেতেন। আর সেই সুদুর্লভ সুযােগ পেয়েছিলেন বলেই বাসুদেব মহাপ্রভুর বিভিন্ন বয়সের লীলার কথা সুন্দরভাবে সুললিত ছন্দে লিখে রেখে যেতে পেরেছিলেন।...
